চুয়াল্লিশতম জন্ম দিনে চুয়াল্লিশের খোঁচা

আপডেট : ২২ জুন ২০১৪, ২১:৩২
কি অদ্ভুত মিল! ভারতের কংগ্রেস পার্টির সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধীর বয়স এবার ৪৪ বছর পূর্ণ হলো। আর কাকতালীয়ভাবে রাহুলের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত লোকসভা নির্বাচনে এবার কংগ্রেস আসন পেল ৪৪। বিষয়টি নিয়ে রাহুলের চুয়াল্লিশতম জন্মদিনে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক ও টুইটারে হাস্যরসিকতার ঝড় বয়ে যায়। অনেকে মন্তব্য করেন, এবারের জন্মদিনটি রেকর্ড হিসেবে গিনেস বুকে ওঠানোর জন্য হয়তো রাহুল অনেক সাধনা করে চুয়াল্লিশ আসন যোগাড় করেছেন। কারণ, চুয়াল্লিশটি মোমবাতি জ্বলবে, চুয়াল্লিশ কেজি ওজনের কেক কাটা হবে, আর নেতৃত্ব দিয়ে ঠিক ৪৪টি আসন যোগাড় করতে পারলে তো ঐশ্বরিক কাজ হয়ে যাবে কংগ্রেসের ঈশ্বরের! অনেক রসিক ব্যক্তি আবার মন্তব্য করেন, সবাই চায় আস্তে আস্তে বুড়ো হতে। কিন্তু যদি ক্ষমতা থাকতো তবে রাহুল চাইতেন এবছরটাতে একটু তাড়াতাড়ি বুড়ো হতে। চুয়াল্লিশতম জন্মদিনের পরিবর্তে পঁয়তাল্লিশতম জন্মদিনটা টেনে আনতেন তিনি! কারণ ৪৪ সংখ্যাটাই যে হয়ে গেছে তার ‘আনলাকি থার্টিন’। কংগ্রেসের কট্টোর ভক্তদের কাছে রাহুল গান্ধী ‘দলের ঈশ্বর’ হিসেবে পরিচিত। এবারের লোকসভা নির্বাচনে বড় পরাজয় এসব ভক্তদের মনে বিন্দুমাত্র বিদ্বেষ আনতে পারেনি তার প্রতি। ভারতের মিডিয়ায় রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে, গত বৃহস্পতিবার রাহুলের জন্মদিনে কংগ্রেস সদর দপ্তরের সামনের ফুটপাথে তার ছবি সামনে নিয়ে বসেছিলেন কংগ্রেসের এক একনিষ্ঠ কর্মী। গলায় কংগ্রেসের প্রতীক দেয়া উত্তরীয়। সামনে রাখা ছবিতে হাসিমুখে রাহুল। ছবির উপরে লেখা, ‘আজ গড কা জন্মদিবস’। কংগ্রেসের ‘গড’-এর নজর কাড়তে না পারলেও মুহূর্তের মধ্যে চিত্র সাংবাদিক ও টিভি ক্যামেরার দৃষ্টি আকর্ষণ করে নেন কংগ্রেসের এই একনিষ্ঠ ভক্ত। ২৪ আকবর রোডে কংগ্রেস অফিসের সামনে তখন সমানে ঢোল বাজছে। আতশবাজির ছড়ায় ধরানো হয়েছে আগুন। কান ফাটানো শব্দে এদিন পোড়ানো হয় হাজার হাজার আতশবাজি আর পটকা। দলের কর্মীরা কংগ্রেসের পতাকা ও রাহুলের ছবি নিয়ে মিছিল করেন, কানফাটানো শ্লোগান দেন। সবই ছিল। শুধু ছিলেন না কংগ্রেসের ‘ঈশ্বর’। চুয়াল্লিশতম জন্মদিনে উত্সব হল ঠিকই, তবে রাহুলের অনুপস্থিতিতে। কারণ, রাহুল এখন বিদেশে। নিজের জন্মদিনে সচরাচর দেশে থাকেন না কংগ্রেসের যুবরাজ। কেন থাকেন না সেটা মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। উত্তরটা নিশ্চয় বিলিয়ন ডলারের। এবারও সেই ঐতিহ্যে অবিচল থেকেছেন তিনি। দলের হারের পর রাহুলের মধ্যে যে খুব বেশি পরিবর্তন হয়েছে তা নয়। তিনি এখনও লোকসভার পিছনের বেঞ্চে বসছেন। প্রথমার্ধ্বের পর লোকসভায় খুব বেশিক্ষণ তাকে দেখা যাচ্ছে না। দলকে ঘুরে দাঁড় করানোর জন্য তিনি যে খুব একটা উঠে পড়ে পরিকল্পনা করে পরিশ্রম শুরু করেছেন, তেমনও নয়। সামনেই মহারা, হরিয়ানায় বিধানসভা নির্বাচন। এবার তিনি ওই দুই বিধানসভার জন্য প্রস্তুতি শুরু করবেন। তবে, তার গা-ছাড়া ভাব দেখে দলের মধ্যেও যে গুঞ্জন একেবারে নেই তা নয়। তবে বৃহস্পতিবার রাহুলের জন্মদিনে সেসব তিক্ততা বা বিতর্ক কোনোভাবেই প্রকাশ্যে আসেনি। রাহুল বিদেশে থাকলেও দিল্লিতে এ দিন কংগ্রেস নেতাকর্মীদের মধ্যে তার জন্মদিন পালনের উত্সাহ পুরো মাত্রায় ছিল। ৪৪ কেজি ওজনের একটি কেক কাটা হয় এ দিন। গরিবদের মধ্যে শাড়ি বিলি করা হয়। ১০ জনপথ থেকে ২৪ আকবর রোড কার্যালয় পর্যন্ত বাজনা বাজিয়ে, পটকা ফাটিয়ে স্লোগান দিয়ে মিছিলের পর মিছিল যায়। লোকসভা নির্বাচনে জয় না মিললেও ‘ঈশ্বর’ এর প্রতি ভক্তদের ভক্তিতে এ দিন এতটুকু ফাঁক দেখা যায়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে বড় পরাজয়ের পর এবার রাহুলের উচিত ছিল কর্মী সমর্থকদের পাশে থেকে তাদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা। তাদের সাহস যোগানো। কিন্তু কর্মী-সমর্থকদের কাছে ধরা না দিয়ে ছুটি কাটাতে আগেভাগেই বিদেশ চলে গেলেন তিনি। মা সোনিয়া ছাড়া বোন প্রিয়াঙ্কাও সপরিবার গিয়েছেন তার সঙ্গে। এর আগে কংগ্রেস কিংবা ইউপিএ জোটের বিজয়ের পর সোনিয়া গান্ধীর জন্মদিন পালন করা হতো ঘটা করে। তার জন্মদিন কংগ্রেসের নেতাকর্মী ও ভক্তদের কাছে ছিল অনেকটা জাতীয় উত্সবের মতো। ২০০৪ সালে এমপি হন রাহুল। তখন থেকে ধুমধাম করে রাহুলের জন্মদিন পালন শুরু করেন কংগ্রেস নেতাকর্মীরা। তারপর থেকে জন্মদিনে রাহুল কখনও দেশে থেকেছেন, কখনও বা বিদেশে ছুটি কাটিয়েছেন। কিন্তু রাহুল ঘনিষ্ঠ নেতারা বলছেন, এবার দলের কর্মীদের এড়িয়ে যাওয়ার কৌশলই নিয়েছেন রাহুল। কারণ, তার উপস্থিতিতে কংগ্রেস কর্মীরা জন্মদিন নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে সেটা নিয়েও সমালোচনা হতে পারত। আর পরাজিত সেনার পক্ষে বিজয় উদযাপন কারো জন্য সুখকর হতে পারে না। তাই আপাতত পরাজয়ের ধাক্কাটা কিছুটা লাঘব করার জন্য দেশের বাইরে পা রেখেছেন তিনি। দলীয় সূত্র জানায়, তাছাড়া রাহুলের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক অনেক শীর্ষ নেতার ক্ষোভ আছে। লোকসভায় ভরাডুবির পর তারা সহ-সভাপতির পদ থেকে রাহুলের অপসারণ চেয়েছিলেন। কিন্তু সেটা না হওয়ায় তাদের ক্ষোভও রয়ে গেছে। জন্মদিনে রাহুলের হাসিমুখ তাই অনেকের কাছে তেতো লাগতো। রাহুল আড়ালে গিয়ে নিজেও রক্ষা পেলেন সমালোচনা ওঠার হাত থেকে দলকেও বাঁচালেন। তবে কংগ্রেসের ‘ঘরপোড়া’ নেতারা জন্মদিনের সুযোগে একটু অন্যভাবে তাদের প্রতি রাহুলের ‘বিমাতাসুলভ’ আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও জানিয়েছেন। রাহুলের বিরুদ্ধে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের অন্যতম অভিযোগ, তিনি তাদের বিকশিত হবার কিংবা ভালো অবস্থানে যাবার সুযোগ দেন না। তাই শুভেচ্ছা জানানোর সুযোগে তারা জানিয়ে দেন তাদের ক্ষোভের কথা। ব্যানারের মাধ্যমে তারা জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানায় এভাবে, ‘রাহুলকে শুভেচ্ছা। তবে তৃণমূল স্তর থেকে উঠে আসা নেতাদের এবার সংগঠনে দায়িত্ব দিক হাইকম্যান্ড।’