তালেবানে নাজেহাল পাকিস্তান

আপডেট : ২২ জুন ২০১৪, ২১:৩৩
পাকিস্তানের জন্য জঙ্গি একটি আতঙ্ক হিসেবে দেখা দিয়েছে। দেশটিতে বিদ্যুত্ সমস্যাসহ নানা সমস্যা বিরাজ করলেও অনেক সময়ই জঙ্গিদের দিকে নজর দিতে গিয়ে জনগণের মৌলিক সমস্যার দিকে নজর দিতে পারে না। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় অর্থনীতি। বিপদে পড়ে দেশটির সাধারণ মানুষ। জঙ্গি সমস্যা কেবল যে পাকিস্তানের জন্যই বড় সমস্যা সেটা কিন্তু নয়। আফগানিস্তান এবং ভারতসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটা সংকট সৃষ্টি করেছে। পাকিস্তানে প্রভাবশালী সংবাদপত্র ডন এক সম্পাদকীয়তে জানিয়েছে, জঙ্গিরা পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দু্ই দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি এসব জঙ্গিদের মোকাবিলায় গত আসিফ আলী জারদারির সরকার আফগানিস্তানের হামিদ কারজাই সরকারের সঙ্গে পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষা করতে পারেননি। যদিও সেক্ষেত্রে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের সরকার অনেক দূর এগিয়েছে। উল্লেখ্য, অভিযানের আগে নওয়াজ শরীফ জঙ্গি নির্মূলে আফগানিস্তান সরকারের প্রতি সহযোগিতার আহবান জানান। কারণ দুই দেশ সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে না পারলে ভবিষ্যত্ যে ভয়ঙ্কর হবে সেটা দুই দেশই বুঝতে পারছে। কারণ চলতি বছরের শেষ দিকে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য দেশে ফিরে গেলে পরিস্থিতি কোনো দিকে মোড় নেয় সেই চিন্তায় আছে দুই দেশ। সরকারের সঙ্গে তালেবানের সমঝোতা হবে না কি আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসবে তালেবান সেই বিষয়ের দিকেই লক্ষ্য রাখছে সবাই। বর্তমানে যে জঙ্গি সংগঠন আছে তারা সবাই তালেবানের সঙ্গে যুক্ত। তাছাড়া ইরাকে সুন্নি বিদ্রোহীরা যেভাবে একের পর এক শহর দখল করছে তাতেও ভয়ে আছে পাকিস্তান। জঙ্গি নির্মূল করতে না পারলে পাকিস্তানে যে এধরনের ঘটনা ঘটবে না তার নিশ্চয়তাই বা কে দিতে পারে? ইরাক পরিস্থিতি থেকেও শিক্ষা নিতে হচ্ছে পাকিস্তানকে। নিরাপদ আশ্রয়স্থল: পাকিস্তান আফগানিস্তান সীমান্ত সারা বিশ্বের জঙ্গিদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল। পাকিস্তানের লেখক এবং সাংবাদিক জাহিদ হোসাইন বলেন, উপজাতি অধ্যুষিত এলাকাগুলো দেশি এবং বিদেশি জঙ্গিদের জন্য একটি স্বর্গ। কেবল পাকিস্তান নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জঙ্গি হামলার উত্স এই এলাকা। গোয়েন্দা সংস্থার হিসাবমতে, এই এলাকায় প্রায় আট হাজার বিদেশি জঙ্গি রয়েছে। তাদের বেশিরভাগ উজবেকিস্তানের নাগরিক (৪৮০০)। এরা কেবল করাচি বিমান বন্দরেই হামলা করেনি। এর আগেও বান্নু কারাগার, মেহরান এবং কামরা বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে তাদের সক্ষমতা স্বাক্ষর রেখেছে। উজবেক ছাড়াও লিবিয়ান ইসলামী ফাইটার গ্রুপ চেচেন, চীনে উইঘুর এবং ইস্ট তুর্কেস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট। আরব যে সব জঙ্গিরা ছিল তাদের অধিকাংশই মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছে, কিংবা ওই এলাকা থেকে অন্যত্র চলে গেছে। পাঞ্জাবি জঙ্গিরাও এখানে গত কয়েক বছর ধরে এখানে অবস্থান করছে। সীমান্ত এলাকাগুলোতে তারা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও গড়ে তুলেছে। জঙ্গি নির্মূলে নানা বাধা: জঙ্গিদের হয়তো পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর মতো অস্ত্রশস্ত্র নেই। সদস্যও খুব বেশি নেই। তাদের বড় শক্তি তাদের আদর্শ। আর এই আদর্শকে রক্ষায় তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই মনোবলই তাদের বড় সম্বল। তাদের নিজেদের মধ্যে বিভক্তি খুব সামান্যই বলতে হবে। কিন্তু বিপরীত চিত্র পাকিস্তানে। দেশটিতে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযানে দ্বিমত আছে সাবেক ক্রিকেট খেলোয়াড় ইমরান খানের দলসহ ডানপন্থী দলগুলোর। আছে দীর্ঘদিনের সামরিক-বেসামরিক দ্বন্দ্ব। প্রথমত, এটা প্রমাণিত হয়েছে, জঙ্গিরা গোয়েন্দারের চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে। তাদের উচ্চ পর্যায়ে হাত আছে। প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা মূল বিষয়ের দিকে নজর না দিয়ে বরং গণমাধ্যমের দিকে বেশি নজর দিচ্ছে। সমপ্রতি জিও টিভি নিয়ে যা ঘটেছে তাই তারই প্রমাণ। এর ফলে গণমাধ্যমে স্বাধীনভাবে তাদের সমপ্রচার কার্যক্রম চালাতে পারছে না। অনেকে গোয়েন্দা সংস্থাটিকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টায় থাকে। এমনকি অসহায় প্রতিরক্ষামন্ত্রীও জিও টিভির বিরুদ্ধেই আছেন। কেবল করাচি বিমান বন্দরের হামলার ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থার এধরনের ব্যর্থতা লক্ষ্য করা গেছে তাই নয়। আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনের মতো নেতা পাকিস্তানে লুকিয়ে থাকলেও গোয়েন্দা সংস্থা জানতে পারেনি। ফলে পাকিস্তানের মাটিতে মার্কিন বিমান হামলা চালানো হয়েছে এবং লাদেন নিহত হয়েছে। জঙ্গিরা পাকিস্তানে সামরিক-বেসামরিক দ্বন্দ্বের সুযোগটা ভালই লুফে নেয়। কিন্তু এই হামলায় কিংবা গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতা নিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনগণের সামনে একটা কথাও বলেনি। তিনি কাউকে আশ্বস্ত পর্যন্ত করেননি। পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দুটি ভয় আছে। প্রথমত সামরিক বাহিনীকে এবং দ্বিতীয়ত জঙ্গিকে। পাকিস্তানের হিউম্যান রাইটস কমিশনের পরিচালক আই এ রেহমানের মতে, ঘরের মধ্যে শত্রু আছে। করাচি বিমান বন্দরে যারা হামলা চালিয়েছিল তারা কাছের কোনো স্থানে দু্্ই দিন কাটিয়েছে। এখান থেকে হামলার বিষয়ে রেকি করেছে। স্থানীয়ভাবে তাদের বন্ধু রয়েছে। তারা বিমানবাহিনীর ইউনিফর্ম, জুতা, খাদ্যদ্রব্য এবং ওষুধ সংগ্রহ করেছে। সরকার, রাজনৈতিক দল, আমলাতন্ত্র, বিচার বিভাগ ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যেও জঙ্গিদের প্রতি সহানুভূতিশীল কর্মকর্তা রয়েছে। সফল হবে কি পাকিস্তান: পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য এই অভিযান আগেরগুলোর চেয়ে সংকটাপন্ন বলেই মনে হয়। যদিও নিরাপত্তা বাহিনী আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। কিন্তু পর্বতময় এই এলাকায় গত দশকব্যাপী যুদ্ধে খুব একটা সফলতা দেখাতে পারেনি নিরাপত্তা বাহিনী। এবারের অভিযানও নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য বিপদসঙ্কুল। উত্তর ওয়াজিরিস্তানে জঙ্গি বিরোধী অভিযান ২০০৪ সালেও হয়েছিল। তখন জঙ্গিদের সঙ্গে সমঝোতা করে সরকার। আর এই সমঝোতা জঙ্গিদের কেবল পুনর্গঠিত করতেই সহায়তা করেনি, বরং তাদের শক্তি সামর্থ্য আরো বৃদ্ধি করতেও সহায়ক হয়েছে। সুতরাং এবার তাদের অস্ত্রহীন করাটা খুব কঠিন হবে বটে। পাকিস্তান সামরিক বাহিনী আফগান নিরাপত্তা বাহিনীকে সীমান্ত সীল করে দেয়ার আহবান জানিয়েছে। যাতে জঙ্গি বিমান হামলার সময় ওই সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে যেতে না পারে। কিন্তু তারা করেছে কিনা সেই বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। তাইতো বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের প্রথমেই উচিত আফগানিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলা। দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতাসহ জঙ্গি নির্মূলে একই কৌশল নিতে হবে। জঙ্গি নির্মূল উত্তর ওয়াজিরিস্তানে বিমান হামলা কেবল একটা উপায় মাত্র। পাকিস্তান জুড়ে জঙ্গিদের শক্ত নেটওয়ার্ক আছে। দীর্ঘমেয়াদে তাদের দমনের জন্য দীর্ঘমেয়াদী সন্ত্রাস বিরোধী কৌশল নিতে হবে। বেসমারিক নিরাপত্তা বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সব রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐকমত্য হতে হবে। আর এসব পদক্ষেপ অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মূলকথা সামরিক-বেসামরিক ঐক্য গড়ে তুলতে না পারলে কখনোই পরিপূর্ণভাবে জঙ্গি দমন কিংবা নির্মূল করা সম্ভব হবে না। জঙ্গি বিরোধী অভিযানে পাকিস্তানের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তবে সমপ্রতি এক ব্রিফিংয়ে হোয়াইট হাউজ এবং স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছেন, অভিযানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কোনো সংযোগ নেই। যদিও গোপনে পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যোগাযোগ রক্ষা করছে বলেই একটি সূত্রে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র আশাও করছে যে এই অভিযান সফল হবে। তবে আফগানিস্তান দিয়ে জঙ্গিরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হবে কিনা এবং সেই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কিছু করছে কিনা সেই বিষয়ে কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে কিছু বলেননি।