পত্রিকান্তরের খবরে প্রকাশ, দেশে পর্যটন শিল্পের বিকাশে সরকার ২০১৪-১৫ অর্থবত্সরে ১৫টি পরিকল্পনা গ্রহণ করিতে যাইতেছে। বর্তমান সময়ে দেশি-বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বাড়িয়াছে, সেইসঙ্গে পর্যটন-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার কার্যক্রমও বাড়িতেছে। সমগ্র দেশে ছড়াইয়া-ছিটাইয়া থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলির যথাযথ সংস্কার সাধন ও ব্যবস্থাপনা এবং সৌন্দর্যমণ্ডিত এলাকাগুলিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব হইলে পর্যাপ্ত পর্যটক আকর্ষণ করা সম্ভব হইবে বলিয়া সরকার মনে করিতেছে। অধিকন্তু, পর্যটন শিল্পে বেসরকারি উদ্যোগ এবং বিদেশি বিনিয়োগ উত্সাহিত করিতে পারিলে রাজস্ব এবং কর্মসংস্থান দুইই বাড়িবে বলিয়াও সরকার ভাবিতেছে। এই কারণেই পর্যটন শিল্পের বিকাশের জন্য যোগাযোগ ও অবকাঠামোর উন্নয়ন, পর্যটন-স্থানের ছবি ও ঠিকানা প্রচার, অন-এ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা প্রদান, সংবাদমাধ্যমে প্রচারণা, নদ-নদীর পাড়ে দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ সৃষ্টি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন ইত্যাদি উদ্যোগ নিতেছে সরকার।
পৃথিবীতে পর্যটন আজ বৃহত্তম শিল্প হিসাবে স্বীকৃত হইয়াছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলিও প্রতি বত্সর বিপুল সংখ্যক পর্যটক আকর্ষণ করিতেছে এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হইতেছে। কিন্তু, এখনও বিদেশি ভ্র্রমণপিপাসুদের নিকট বাংলাদেশ পছন্দনীয় পর্যটন গন্তব্য হইয়া উঠে নাই। স্বীকার করিতেই হইবে যে, আমাদের দেশে পর্যটন শিল্পের প্রচার ও প্রসারের জন্য এবং সর্বোপরি পর্যটন স্থানগুলিতে যাতায়াত ও অবস্থান করিবার মতো মানসম্পন্ন ব্যবস্থা গড়িয়া তুলিতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের বিপুল অভাব রহিয়াছে। অথচ তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশ স্বল্প আয়তনের দেশ হইলেও ইহার বৈচিত্র্য সহজেই পর্যটকদের আকর্ষণ করিতে পারে। বাংলাদেশে পরিচিত-অপরিচিত অনেক পর্যটক-আকর্ষক স্থান আছে। বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যুগে যুগে ভ্রমণকারীরা মুগ্ধ হইয়াছেন। ইহার মধ্যে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ঐতিহাসিক স্থান, পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত, পাহাড়, অরণ্য ইত্যাদি অন্যতম। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি এলাকা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে বিশেষায়িত। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত বাংলাদেশের কক্সবাজার কিংবা সুন্দরবনও হইতে পারে অত্যন্ত আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য। কিন্তু, বাংলাদেশের যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত অসুবিধা ছাড়াও, চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নিরাপত্তা লইয়া পর্যটকরা উদ্বিগ্ন থাকেন। বিভিন্ন পর্যটন স্পটে পর্যটকরা ছিনতাইসহ নানা রকমের হয়রানির ঝুঁকিতে ভোগেন। বিশেষত নারী ও বিদেশি পর্যটকরা বেশি সমস্যায় পড়েন। দিনের বেলায় ফেরিওয়ালাদের উত্পাত ছাড়াও পর্যটন স্পটে জিনিসপত্রের অগ্নিমূল্যের কারণেও পর্যটকেরা অনুত্সাহিত হন।
তবুও, বাংলাদেশে গত কয়েক বত্সরে অভ্যন্তরীণ বা দেশের ভিতরে পর্যটনের উল্লেখযোগ্য রকমের প্রসার ঘটিয়াছে। সাধারণ লোকজন এখন ছুটি-ছাটায় আর উত্সবের সময় দেশের বিভিন্ন জায়গায় বেড়াইতে যাইতেছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, পরিকল্পনার অভাবে এই আকর্ষণ সীমিত হইয়া আছে শুধু দুই-একটি অঞ্চলেই। অথচ সমগ্র বাংলাদেশে জালের মতো ছড়াইয়া থাকা নদী ও হাওড় কেন্দ্রিক পর্যটন শিল্প অনেক সম্ভাবনাময় হইতে পারে। বর্তমান যুগে, সরকারি প্রণোদনার মাধ্যমে সমগ্র দেশব্যাপীই পর্যটনবান্ধব পরিবেশ গড়িয়া তোলা আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্যই জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। আমরা আশা করিব, পর্যটন শিল্পের বিকাশে সরকারের উত্সাহ থিতাইয়া যাইবে না। বরং প্রচারের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে সরকার সম্ভাবনাময় পর্যটন গন্তব্যগুলিতে যাতায়াতের সুবন্দোবস্ত এবং থাকিবার মতো উন্নত অবকাঠামো গড়িয়া তুলিতে সচেষ্ট হইবে।
