উন্মুক্ত ইন্টারনেটের পক্ষে বিশ্ব

আপডেট : ২৪ জুন ২০১৪, ২০:৫৬
ইন্টারনেটের আবির্ভাবের পর থেকেই এটি বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রযুক্তির স্থানটি দখল করে নিয়েছে। যেকোনো ধরনের প্রযুক্তির সাথে ইন্টারনেট যুক্ত হয়ে তার উপযোগিতাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে বহুগুণ। সকলের জন্য এটি উন্মুক্ত হওয়ার কারণেই এই সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। ইন্টারনেট সোসাইটির সর্বশেষ প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে এমন কথাই। ইন্টারনেট সোসাইটির প্রতিবেদনের কিছু চুম্বক অংশ অবলম্বনে লিখেছেন তরিকুর রহমান সজীব ইন্টারনেটের আবির্ভাবের মাত্র ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। তবে এর মধ্যেই বিশ্বব্যাপী প্রভাবের দিক থেকে এটি ছাড়িয়ে গেছে প্রায় সব ধরনের প্রযুক্তিকেই। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোই মূলত ইন্টারনেটের ব্যবহারে প্রথম এগিয়ে আসে। তবে সময়ের সাথে সাথে এটি ছড়িয়ে পড়েছে সারাবিশ্বেই। উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশগুলোতেও এখন যোগাযোগের অন্যতম মূল মাধ্যম হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে ইন্টারনেট। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাণিজ্যসহ জীবনের প্রতিটি খাত এখন ক্রমেই ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ইন্টারনেটের এই সুদূরপ্রসারী বিস্তার এবং প্রভাবের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ইন্টারনেটকে নিয়ন্ত্রণের জন্যও বিভিন্ন সময় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বিভিন্ন দেশের সরকার। তবে ইন্টারনেটের জনক টিম-বার্নস-লিসহ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উন্মুক্ত ইন্টারনেটের ধরণই একে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যকরী করে তুলেছে। ইন্টারনেটকে যদি বিশ্বব্যাপী সকলের জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত না রেখে এর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়, তাহলে এতদিন পর্যন্ত যেভাবে ইন্টারনেট সুফল বয়ে এনেছে, তার ধারাবাহিকতা রক্ষিত হবে না বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে ইন্টারনেট সোসাইটি সম্প্রতি প্রকাশ করেছে ইন্টারনেট বিষয়ক প্রতিবেদন ‘গ্লোবাল ইন্টারনেট রিপোর্ট ২০১৪’। এই প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেটের ব্যবহারের প্রসার, সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ প্রভৃতি বিষয় উঠে এসেছে। এই প্রতিবেদনেও মূলত উন্মুক্ত ইন্টারনেট বহাল রাখার প্রতিই আহ্বান করা হয়েছে সকলের প্রতি। ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রবণতা সময়ের সাথে সাথে ইন্টারনেটের ব্যবহারের প্রসার যেমন ঘটছে দ্রুতগতিতে, তেমনি এর ব্যবহারে ক্রমেই যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন মাত্রা। গত এক দশকে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়তে বাড়তে এখন ৩ বিলিয়ন বা তিনশ কোটির ল্যান্ডমার্কে পৌঁছানোর দোড়গোড়ায় এসেছে। জাতিসংঘের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী আসছে ২০১৫ সালেই ৩ বিলিয়ন ব্যবহারকারীতে পৌঁছে যাবে ইন্টারনেট। এদিকে এক দশক আগেও যেখানে ইন্টারনেটের মূল মাধ্যম ছিল ফিক্সড ডায়াল-আপ পদ্ধতি, সেখানে এখন বিশ্বব্যাপী ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ছড়িয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবার এক্ষেত্রে অনেক বেশি এগিয়ে আসছে মোবাইল ব্রডব্যান্ড এবং তারহীন ইন্টারনেটের অন্যান্য মাধ্যমগুলো। আবার ইন্টারনেটের কনটেন্টেও এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। টেক্সট-নির্ভর কনটেন্টের বদলে এখন অডিও-ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট অনেক বেশি রাজত্ব করছে। উন্মুক্ত ইন্টারনেটের প্রভাব শুরু থেকেই ইন্টারনেটের যে বৈশিষ্ট্য এর প্রসারে মূল ভূমিকা রেখে আসছে, তা হলো এটি সকলের জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত। এই বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করেই ইন্টারনেটকে কাজে লাগিয়ে একক উদ্যোগেও বহু মানুষের কল্যাণ সম্ভব হয়েছে। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায় উইকিমিডিয়ার কথা। উইকিপিডিয়াসহ আরও বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এতে এখন পর্যন্ত ২১৫ কোটিরও বেশি নিবন্ধ যোগ হয়েছে। যে কেউ চাইলেই এই উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হতে পারে বলেই এটি সম্ভব হয়েছে। এই সুবিধা ব্যবহার করেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিপুল অবদান রেখে যাচ্ছে ইন্টারনেট। শিক্ষায় উন্মুক্ত ইন্টারনেট গত কয়েকবছরে বিশ্বব্যাপী শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন এক ধারা তৈরি হয়েছে, যা হলো অনলাইন শিক্ষা। এর গ্রহণযোগ্যতা এখন প্রশ্নাতীত। এমআইটি, স্ট্যামফোর্ড, হার্ভার্ডসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সব বিশ্ববিদ্যালয় এখন অনলাইনে শিক্ষার সুযোগ উন্মুক্ত করেছে। আর এই সুযোগ ব্যবহার করে সারাবিশ্বের যে কেউই অর্জন করে নিতে পারে ডিগ্রি। ম্যাসিভ অনলাইন ওপেন কোর্স (এমওওসি) এখন জনপ্রিয় অনেক দেশেই। ইন্টারনেট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী এখন বিশ্বের ১ কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী এসব অনলাইন কোর্সে পড়ালেখা করছে, যার মধ্যে ৬০ ভাগেরও বেশি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের শিক্ষার্থী। ইন্টারনেট যদি সকলের জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত না থাকে, তাহলে এই সুযোগ গ্রহণ করা সম্ভব না। সরকার ব্যবস্থায় উন্মুক্ত ইন্টারনেট বিশ্বের অনেক দেশই এখন রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কাজে ইন্টারনেটকে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। নির্বাচনী প্রচারণা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় সব সেবার তথ্য এখন অনলাইনেই সম্পন্ন হচ্ছে। ই-গভর্ন্যান্সও তাই সময়ের সাথে সাথে জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে। অনলাইনে ট্যাক্স প্রদানও অনেক দেশে চালু হয়ে গেছে। ইন্টারনেটের সুবিধা নিয়েই বাংলাদেশও ই-গভর্ন্যান্সের পথে যাত্রা শুরু করেছে। ইতোমধ্যেই রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থার ওয়েবসাইট চালু হয়েছে এবং এগুলো থেকেই জনগণ বিভিন্ন সেবা পাওয়া শুরু করেছে। এর মধ্যে চলতি সপ্তাহেই বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে যাত্রা শুরু করেছে জাতীয় তথ্য বাতায়ন। সরকারি ২৫ হাজার ওয়েবসাইটের এক অনন্য সংকলন হিসেবে এই তথ্য বাতায়ন বিশ্বের বৃহত্তম সরকারি ওয়েব পোর্টাল। ব্যবসায় উন্মুক্ত ইন্টারনেট ব্যবসা ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে ইন্টারনেট। অ্যামাজন, ইবে শুরু করে বিশ্ববাণিজ্যে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ দখল করে নিয়েছে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ই-কমার্স। ভোক্তা এবং উত্পাদনকারীর মধ্যে এক অনন্য যোগসূত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে অনলাইনে বেচাকেনার সব ওয়েবসাইট। সব ধরনের পণ্যের জন্যই ই-কমার্সের সুবিধা গ্রহণ করতে পারছেন সকলেই। আমাদের দেশেও সাম্প্রতিক সময়গুলোতে অনলাইন শপগুলো জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে। সকলের জন্য উন্মুক্ত ইন্টারনেটই পারে এই প্রবণতাকে আরও বেশি ছড়িয়ে দিতে। উদ্ভাবনে উন্মুক্ত ইন্টারনেট সৃজনশীলদের উদ্ভাবনীতেও ইন্টারনেট এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। উন্মুক্ত ইন্টারনেটের দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ নেই বলে সহজেই অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে উদ্ভাবিত নতুন কোনো প্রযুক্তিও পৌঁছে যাচ্ছে বাকি দেশগুলোর কাছে। বিশ্বের অনেক দেশেই এখন তরুণরা ক্রাউডফান্ডিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের বিভিন্ন উদ্ভাবনের জন্য মূলধন সংগ্রহ করছে। অনলাইনে বিভিন্ন সাইটে বিভিন্ন প্রকল্প দিয়ে তারা আকৃষ্ট করছে ভিনদেশি বিনিয়োগকারীদেরও। বিনোদনে উন্মুক্ত ইন্টারনেট ইন্টারনেটের ভার্চুয়াল জগত এখন বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের কাছে। ফেসবুক, টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম তো রয়েছেই। এর বাইরে সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন কিংবা টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও অনলাইন সংস্করণের দিকে অনেক বেশি ঝুঁকে পড়েছে। গত এক বছরে জনপ্রিয় অনেক সংবাদপত্রই তাদের ছাপা সংস্করণ বন্ধ করে কেবল অনলাইন সংস্করণ চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর সাথে অনলাইন পোর্টালগুলোও দ্রুত জনপ্রিয়তায় এগিয়ে আসছে। তাদের সাথে পাল্লা দিতেই ছাপা সংবাদপত্রগুলোও অনলাইন সংস্করণের দিকে মনোযোগী হতে বাধ্য হচ্ছে। এ ছাড়া অডিও, ভিডিও এবং গেমিংয়ের জন্য অনলাইনই দিন দিন অধিক গ্রহণযোগ্য প্ল্যাটফর্মে পরিণত হচ্ছে। উন্মুক্ত ইন্টারনেটের চ্যালেঞ্জ ইন্টারনেটের সুবিধাকে পূর্ণাঙ্গভাবে উপভোগ করতে প্রয়োজন উন্মুক্ত ইন্টারনেট। তবে এর বেশকিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অবকাঠামোর দিক থেকে এখনও বিশ্বের অনেক দেশই রয়েছে পিছিয়ে। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ ইন্টারনেটে সংযুক্ত থাকার অর্থ এখনও প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ রয়েছে ইন্টারনেটের বাইরে। এখনও অনেক দেশেই ইন্টারনেটের খরচ হাতের নাগালের অনেক বাইরে। বিশেষ করে অনুন্নত দেশগুলোতে সাধারণ মানুষরা ইন্টারনেট ব্যবহারের কথা ভাবতেই পারে না। ফলে এদিক থেকে ডিজিটাল ডিভাইড তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন দেশে। আবার অনেক দেশেই বিভিন্ন ওয়েবসাইট বা কনটেন্টের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়ে থাকে। এমনকি ইউটিউব, ফেসবুক বা টুইটারকেও ব্লক করে রাখার উদাহরণ নতুন নয়। গোটা দেশকে ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার ঘটনাও ঘটেছে। এগুলোই উন্মুক্ত ইন্টারনেটের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ইন্টারনেট সোসাইটি তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এসব চ্যালেঞ্জকে অতিক্রম করে সারাবিশ্বের জন্য ইন্টারনেট উন্মুক্ত রাখতে পারলেই ইন্টারনেট আরও কার্যকর হয়ে উঠবে। আর তখনই কেবল তার সুফল ভোগ করতে পারবে গোটা বিশ্ব।