বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে এনজিও তথা বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনের এক বিশাল ভূমিকা রয়েছে। নির্ির্দ্বধায় বলা যায়, রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর চাইতে অন্তত দেশের সাধারণ মানুষের অবস্থার উন্নয়নে এনজিওর ভূমিকা বেশ কার্যকর ও দৃশ্যমান। যদিও এ নিয়ে ব্যক্তি গোষ্ঠীর মধ্যে মতবিরোধ আছে, সংশয় আছে। থাকতেই পারে। দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা, এনজিওর কর্মপ্রক্রিয়া, কৌশল, উপস্থাপনা অর্থাত্ আচরণগত ব্যতিক্রম বা স্বাতন্ত্র্যতা এর কারণ হতে পারে। আবার কিছু এনজিও এর অসত্ উদ্দেশ্য, লক্ষ্য, কর্মপদ্ধতি অনেকের ভেতর সংশয় এনে দেয়, পুরো বিষয়কে বিতর্কিত করে দেয়। আবার প্রশংসা করবার ইতিবাচক দিকটি হল, সামাজিক বৈষম্যের কারণে আর্থিক সংকটের শিকার সুবিধা ও অধিকার বঞ্চিত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গৌরবের শতকরা আশিভাগ দাবিদার এনজিও।
বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক যে সমৃদ্ধি, তাতে নারীর অংশগ্রহণ ও ভূমিকা একটি বিরাট অংশ জুড়ে আছে। এ জন্য অতীতে নারীকে ঘর থেকে বের হতে না দেবার ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতাকে দুর্বল করতে বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। দেখা যায়, একজন নারী, যিনি দাসীবৃত্তি বলয়ে দিনযাপন করতেন, তিনি এখন টাকার হিসেব করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। তার নিয়ন্ত্রণে পুরুষ শ্রমিক কাজ করেন। নারী সদস্য পরিবারের কোন কাজে তার পরামর্শ, সিদ্ধান্ত দেবার ক্ষমতা বা স্থান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। নারীর উপর আরোপিত সীমাবদ্ধতা, প্রতিবন্ধকতা, উদাসীনতা ইত্যাদি নেতিবাচক বাধাসমূহকে নারীই ভাঙ্গতে সক্ষম হচ্ছে বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন সহায়তায়।
লক্ষ্যণীয়, সকল ধরনের উন্নয়ন পাশাপাশি এক ধরনের ‘সংস্কৃতি’ গড়ে উঠছে বেশকিছু বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনের মাঝে, যা অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয় জনমনে। সৃষ্টি করে সংশয়। স্ববিরোধিতার প্রশ্নে কাঠগড়ায় দাঁড় করায় সংগঠনকে। তৃণমূল পর্যায়ের দরিদ্র মানুষকে নিয়ে কাজ করবার সফলতা, পরিকল্পনা ইত্যাদি বিষয়ক সেমিনার, প্রেস ব্রিফিং, কর্মশালা ইত্যাদি আয়োজিত হয় পাঁচ তারকা হোটেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। অর্থাত্ ঐ সকল বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনের কর্ণধারগণ অভিজাত পরিবেশে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। দাতা সংস্থা, মন্ত্রী, সরকারি কর্তাব্যক্তিদের পছন্দ অনুসারে নাকি তাদের এই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ। কতটা যায় এমন পরিবেশের সাথে কর্মসূচির উদ্দেশ্য, লক্ষ্য তা মিলিয়ে দেখবার প্রয়োজনীয়তা নেই যেন কোথাও। বিষয়গতভাবে স্ববিরোধী তো বটেই, তারচেয়েও বেশি বিড়ম্বনা, বিব্রতকর হলো এই সকল অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের দুরবস্থা। এ উপলব্ধির নেপথ্যে দু’টো বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছি। প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী নিয়ে কর্মরত একটি সংস্থা আয়োজিত একটি সেমিনারে অংশগ্রহণ করতে গিয়েছিলাম রূপসী বাংলা পাঁচ তারকা হোটেলে। অনুষ্ঠানের অডিয়েন্স ছিল প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী, এ জনগোষ্ঠী নিয়ে কর্মরত সংগঠন ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক।
এই সেমিনারে শহর, গ্রামগঞ্জ থেকে আসা প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী অংশগ্রহণ করেন। আরও ছিলেন মন্ত্রী, আমলা, এনজিও ব্যক্তিত্ব, দাতা সংস্থার প্রতিনিধি, সাংবাদিক। অনুষ্ঠানের প্রায়ই বক্তারা ইউরোপ, আমেরিকার দৃষ্টান্ত টানলেন। ওসব জায়গা থেকে অভিজ্ঞ, বিশেষজ্ঞদের টেনে আনবার প্রয়োজন ছুড়লেন। বক্তাদের ভাষা, ভঙ্গি পাঁচ তারকা হোটেলের সাথে একশত ভাগ মিলে যায়। যা মেলে না তাহল অডিয়েন্স। আরও কঠিন অভিজ্ঞতা হল লাঞ্চের সময়। সেমিনার কর্মসূচিতে লাঞ্চের আয়োজন ছিল। খেয়াল করলাম প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা তৃণমূল, প্রান্তিক প্রতিবন্ধী ও তাদের সাথে আসা আত্মীয় পরিজনদের লাঞ্চের সময় অসহায়ের মত এদিক, ওদিক ঘুরাঘুরি। বুফে লাঞ্চের কৌশল, নিয়ম তারা জানেন না। একটা খালি টেবিলে বসে আছেন আরও কয়েকজন। অতিথিদের জন্য বরাদ্দ খাবার প্রায় শেষ হতে চলেছে। অথচ তারা তখনও খাননি। আমি এবং আরও একজন অতিথি বিষয়টি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম। তাদের টনক নড়ল। অবশেষে এভাবে লাঞ্চ করার অনভ্যস্ততার কারণে তাদের জন্য টেবিলে খাবার দেবার ব্যবস্থা করা হল। আরও একটি ঘটনা। এটি সোনারগাঁও পাঁচ তারকা হোটেলের। এই অনুষ্ঠানেও অডিয়েন্স ছিল উন্নয়ন কাজে সম্পৃক্ত দরিদ্র নারী-পুরুষ, এনজিও প্রতিনিধি, সাংবাদিক, দাতা প্রতিনিধি, সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। মঞ্চে ছিলেন মন্ত্রী, গভর্নর, আয়োজক এনজিও ব্যক্তিত্ব ও কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব। মঞ্চ থেকে যা বলা হল তা দরিদ্র নারী-পুরুষের জন্য কতটা বোধগম্য ছিল প্রশ্ন রয়ে যায়। আমি বেশি বিস্মিত হলাম যখন দেখলাম একজন বাঙালি নারী বিশিষ্ট ব্যবসায়ী অনর্গল ইংলিশে তৃণমূল দরিদ্র নারী-পুরুষের উন্নয়ন সফলতার প্রশংসা করলেন। দরিদ্র নারীদের সক্ষমতার প্রশংসা করলেন, প্রত্যাশাও করলেন। চেয়ে দেখলাম, প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জ, শহরের বস্তি থেকে আগত দরিদ্র নারী-পুরুষ, পাঁচ তারকা হোটেলের টেবিলে নির্বাক, নিশ্চল হয়ে আছেন। ব্যবসায়ী সমিতির সভা-সেমিনার করে বক্তার যে ভাষা, কৌশল, কায়দায় বক্তব্য দেবার প্রবণতা তা থেকে তিনি বের হতে পারেননি। তবে অংশগ্রহণকারী তৃণমূল, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের মাঝে অভিব্যক্তিতে ‘বুঝার’ একটা কৃত্রিম অভিব্যক্তি পাওয়া যায়। মানিয়ে চলবার স্বার্থেই সম্ভবত। এক্ষেত্রেও এমন অভিজাত পরিবেশে অনুষ্ঠানটি আয়োজনের যৌক্তিকতার প্রশ্নটি রয়ে যায়।
ইস্ট এশিয়ার বেশ ক’টি দেশে যেমন, চীন, জাপান, কোরিয়ায় মাতৃভাষায় সবধরনের কাজ সম্পন্ন হয়ে থাকে। যোগাযোগের ক্ষেত্রে মাতৃভাষাকে অবধারিত করার উদ্দেশ্য হল, দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছানো এবং দেশ ও জাতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। দেশপ্রেম তো বটেই। পার্শ্ববর্তী দেশেও পরিবেশ, পরিস্থিতি অনুসারে ভাষার ব্যবহার, পরিবেশ নির্বাচন করার তাড়না আছে, কমিটমেন্ট আছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের নেই। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গড়ে ওঠা এ ধরনের ‘সংস্কৃতি’ উন্নয়ন ধারার স্ববিরোধিতা করে কিনা সংশ্লিষ্টদের ভেবে দেখা দরকার। এসব কর্মতত্পরতায় অনেকের ধারণা সৃষ্টি হয়েছে যে, এনজিওদের অনেক অর্থ। এনজিও কর্তাব্যক্তিদের জীবন যাপন আধুনিক, অভিজাত হওয়ায় এ ধারনা আরও পোক্ত হয়েছে।
উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে সংশয়, বিতর্ক, স্ববিরোধিতার ঊর্ধ্বে পরিচালিত হতে দেয়া জরুরি। এই দায়িত্ববোধই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নকে সম্প্রসারিত করবে এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পথটা স্বচ্ছ হবে। অকৃত্রিম হবে উন্নয়ন ভাবনা। কেননা সংশয়, সত্যকে আড়াল করে দেয়, দিতে পারে।
লেখক:কথা সাহিত্যিক ও উন্নয়নকর্মী
