মহাসড়কে বিপজ্জনক গর্ত

আপডেট : ২৪ জুন ২০১৪, ২১:২৮
বর্ষাকালে কখনও একটানা কখনও বিরতি দিয়া বৃষ্টি ঝরিবে—ইহা আমাদের প্রকৃতির স্বাভাবিক খেয়াল। কিন্তু জীবন ও যাতায়াত তো সেই কারণে থামিয়া থাকিতে পারে না। গত কয়েকদিন মৌসুমী নিম্নচাপের কারণে দেশ জুড়িয়া বৃষ্টি নামিয়াছে। সেই নিরন্তর বৃষ্টির প্রকোপের সহিত পাল্লা দিয়া মানুষের ভোগান্তিও বাড়িয়াছে। চট্টগ্রামে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখা দিয়াছে, ঢাকা মহানগরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার হতশ্রী-রূপ স্বমহিমায় প্রকাশ পাইয়াছে, দেশের নদনদীর পানি বাড়িয়া চলিয়াছে। প্রকৃতির স্বাভাবিক বর্ষণের এই চিত্র ফি-বত্সর প্রায় একই ধরনের বলা যায়, যাহা আভাস দিয়াই আমাদের মাঝে আবির্ভাব ঘটে। তাহার জন্য আমাদের ন্যূনতম প্রস্তুতি থাকিবে, ইহাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রকৃতির ক্রিয়াকলাপ ‘স্বাভাবিক’ হইলেও আমাদের ন্যূনতম প্রস্তুতির চিত্রটি ‘স্বাভাবিক’ নহে। অন্যসব বিষয় বাদ দিয়া মহাসড়কের দুর্ভোগের কথাই ধরা যাক। গত তিনদিনের টানা প্রবল বর্ষণে ঢাকা-বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব মহাসড়কের মির্জাপুর অবধি প্রায় ৬৭ কিলোমিটার রাস্তায় বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হইয়াছে। তত্সঙ্গে মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে সৃষ্টি হইয়াছে খানাখন্দের। গত সোমবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই প্রতিবেদন হইতে আরও জানা গিয়াছে, বঙ্গবন্ধু সেতুপূর্ব হইতে এলেঙ্গা পর্যন্ত ১৭ কিলোমিটার রাস্তায় মাস তিনেক পূর্বে সংস্কারের কাজ করে বঙ্গবন্ধু সেতুতে নিয়োজিত একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সংস্কার করা ওই মহাসড়কেই তৈরি হইয়াছে বিশাল বিশাল জলমগ্ন গর্ত। তাহার সহিত ওই ১৭ কিলোমিটারের রাস্তার বিভিন্ন অংশে সৃষ্টি হইয়াছে অসংখ্য খানাখন্দেরও। কর্তৃপক্ষ বলিয়াছেন, বৃষ্টি শেষ হইলেই শুরু করা হইবে সংস্কার কাজ। এই বত্সর জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সড়ক সংস্কারের ১০০ দিনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। তাহার ৩০ দিনের মাথায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মহোদয় পরিদর্শনে গিয়া নিজেই আক্ষেপ করিয়াছেন যশোর হইতে নওয়াপাড়া রোডের মাত্র তিন কিলোমিটার নষ্ট রাস্তা মেরামত হইতে না দেখিয়া। তিনি সেই সময় এই হুশিয়ারিও উচ্চারণ করেন যে, বাকি ৭০ দিনের মধ্যে যাহারা রাস্তার গর্ত ভরাটে ব্যর্থ হইবেন—সেইসব প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশ বাতিল ও কালো তালিকাভুক্ত করা হইবে। নষ্ট রাস্তা মেরামত হইবার পরও তাহা কয়েকদিনের টানা বর্ষণে বহুলাংশে যে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়া যায়, তাহা নিশ্চয়ই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অজানা নহে। মহাসড়কে বিপজ্জনক খানাখন্দের কারণে সৃষ্ট যানজট বা অন্যান্য দুর্ভোগে দৃশ্যত যাহা দেখা যায়, তাহার বাহিরে অর্থনৈতিক ক্ষতিটাও কম নহে। যেই সমস্ত যানবাহন খাদের ফাঁদে পড়িয়া নানাবিধ যান্ত্রিক গোলযোগে আক্রান্ত হয়, তাহা মেরামত ও যন্ত্রাংশ পরিবর্তনের ক্ষতিও নেহায়েত কম নহে। ওই সকল গর্ত মেরামতের ব্যয় অপেক্ষা সেই ক্ষতির মূল্য অনেক ক্ষেত্রেই অধিক হইয়া থাকে। অনেক সময় মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে গর্তে পড়িয়া দুর্ঘটনা কবলিত গাড়িগুলি তিন-চার দিনেও উদ্ধার সম্ভব হয় না। তাহাতে রাস্তা সংকুচিত হইয়া সৃষ্টি হয় যানজট। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়া প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার যানবাহন চলাচল করে। ইহার মধ্যে রহিয়াছে ৮ হাজার ট্রাক ও লরি। পত্রিকান্তরে জানা যায়, চলমান যানবাহনগুলোর পেছনের দুই চাকার সর্বোচ্চ ২০ টন ওজন পরিবহনের ধারণক্ষমতা হিসাবে ডিজাইন করা হইলেও এখন সিঙ্গেল এঙ্গেলের ট্রাক বা লরি পণ্য বহন করিতেছে প্রায় ৩৫ টন। ইহাছাড়া বিভিন্ন সড়ক মেরামতকালে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কাজের মান লইয়াও প্রশ্ন রহিয়াছে। নিম্নমানের বিটুমিন ও পাথর ব্যবহার করিবার কারণে মাত্র এক মাসের মাথায় সংস্কার করা সড়কটি আবারো আগের চেহারায় ফিরে যায়—এইরূপ অভিযোগের খবর আমরা প্রায়শই প্রকাশ হইতে দেখি। সুতরাং সার্বিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিতেই হইবে। নইলে এই চিত্রের ব্যত্যয় ঘটিবে না সহসা।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন