জলাধার সংরক্ষণ

আপডেট : ২৪ জুন ২০১৪, ২১:২৯
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলিতেছে-বিগত ৫৪ বত্সরের সকল রেকর্ড অতিক্রম করিয়াছে এইবারের তাপমাত্রা। পরিবেশ বিশেষজ্ঞগণ অনুমান করিতেছেন, আগামী বত্সরগুলিতে গড় তাপমাত্রা আরও বাড়িয়া যাইবে। ইহার কারণ হিসাবে অনেককিছু দেখানো হইলেও পানির অপ্রতুলতা ও জলবায়ুতে আর্দ্রতা হ্রাসই হইল মুখ্য। সুদীর্ঘকাল ধরিয়া এদেশের মানুষ নদী-নালা, ডোবা, পুকুরসহ নানা উত্স হইতে পানি সংগ্রহ করিত। কালের আবর্তে গভীর নলকূপের ব্যবহার ঐ সকল উেসর উপর নির্ভরশীলতা কমাইয়া দিয়াছে। কিন্তু গভীর নলকূপ ব্যবহার শুরুর ওই সময়ে ইহার পরবর্তী বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে খুব কমই গবেষণা পাওয়া যায়। অন্তত গ্রামাঞ্চলে সনাতনী পানি উেসর ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করা সম্ভব হইলে এখন যে পানির অভাব, তাহা হয়ত অনেকাংশেই অনুপস্থিত থাকিত। দিন দিন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর যেই হারে নামিয়া যাইতেছে তাহাতে বিশেষজ্ঞদের এই আশংকাকে সত্য বলিয়াই ধরিয়া লওয়া যাইতে পারে যে, আগামীতে আন্তঃদেশীয় ও অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের মূলে পানি একটি বড় নিয়ামক হইয়া দাঁড়াইবে। গত প্রায় পঞ্চাশ বত্সরে উজান হইতে যেই হারে পানির স্রোত হ্রাস পাইয়াছে তাহাতে পানির সনাতনী উেসর দিকে পুনর্বার দৃষ্টি দেওয়ার প্রয়োজন রহিয়াছে। পানির এই উত্সগুলি হয় বর্ষায় না হয় অধিক বৃষ্টিপাত হইলে ভরাট হইয়া ওঠে এবং বত্সরের পরবর্তী সময়ের চাহিদা মিটাইয়া থাকে। এই পানি অত্যন্ত স্বাস্থ্যসম্মত। এই পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ০.২ মিলিগ্রাম যেইখানে মানুষের শরীরে সহনীয় মাত্রা হইলো প্রতি লিটারে ০.৫ মিলিগ্রাম। অন্যদিকে নলকূপের পানিতে ইহার মাত্রা প্রতি লিটারে প্রায় ১.৫ মিলিগ্রাম। শুধু ফুটাইয়া পান করিলেই এই পানির দ্বারা কোনো রোগ সৃষ্টির কারণ নাই বলিয়াই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ মত দিয়াছেন। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হইলো, দেশে যেই হারে জলাধার কমিয়া যাইতেছে তাহাতে অদূর ভবিষ্যতে পানি সংকট আরও ঘনীভূত হইবার আশঙ্কা দেখা দিয়াছে। গত ৩০ বত্সরে দেশের গ্রামাঞ্চলের এই সকল প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট জলাধারের পরিমাণ কমিয়া গিয়াছে প্রায় ৫৫ শতাংশ। অতিরিক্ত জনসংখ্যা, প্রকৃতির প্রতি ক্রমবর্ধমান উদাসীনতা ও প্রাকৃতিক পরিবর্তনের কারণেই জলাধারের মাটি ভরাট হইয়া যাইতেছে। সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলি এই বিষয়ে বারংবার নানা উদ্যোগ নিলেও ইহা হয় ত্রুটিপূর্ণ অথবা মাঝপথে থামিয়া গিয়াছে। জলাধার ব্যক্তি মালিকানাধীন বা খাস, প্রাচীন বা অপ্রাচীন যাহাই হউক, যেকোনো উদ্দেশ্যে মাটি ভরাট করিবার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা রহিয়াছে। ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে বলা হইয়াছে যে ব্যক্তি মালিকানাধীন হইলেও কোন জলাধার ভরাট করা যাইবে না। কেননা প্রকৃতিকে স্বাভাবিক থাকিতে দেওয়াই আমাদের পরিবেশের জন্য মঙ্গলজনক। তবে এই বিষয়ে শুধু সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগই শেষ কথা নহে, পরিবেশকে আপন রূপ লইয়া সুরক্ষা দেওয়ার জন্য প্রয়োজন ব্যাপকভিত্তিক সামাজিক প্রচেষ্টা। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে বিদ্যমান জলাধারগুলির রক্ষণাবেক্ষণে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। পরিবেশ রক্ষা বিষয়ক অন্যান্য পদক্ষেপের অংশ হিসাবে এই কার্যক্রমকে একটি আন্দোলনে রূপ দিতে হইবে। সরকারি উদ্যোগ যতই লওয়া হউক ইহাকে বাস্তব রূপ দিতে হইলে প্রয়োজন জন অংশগ্রহণ ও বাধ্যতামূলক আইনি কাঠামো। আগামী প্রজন্মের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা আমাদের অবশ্য কর্তব্য।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন