বিশ বছর আগে আজকের এই দিনে সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে মর্মন্তুদ খবরটি এলো- জাহানারা ইমাম আর নেই। চিকিত্সার জন্য শেষবার ঢাকা ছাড়বার আগে বলেছিলেন আমাদের, “ওদের মৃত্যুঘণ্টা বেজে গেছে। দেখিস, এবার ফিরে এলেই দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলবো আমরা। দেশ জেগে গেছে, তরুণরা হাল ধরেছে। আমার সন্তানরা একাট্টা হয়েছে ‘দানবশক্তি’র বিরুদ্ধে তাই ‘জয় আমাদের সুনিশ্চিত’।” কিন্তু দেহে বাসা বাঁধা কর্কটব্যাধি তাকে দেশব্যাপী জেগে ওঠা মুক্তিযুদ্ধের চতনাদীপ্ত মানুষদের নিয়ে দেশকে শত্রুমুক্ত করার পবিত্র কাজটি সম্পন্ন করতে দেয়নি। ব্যাধি যতই প্রকটতর হয়েছে, উদ্দেশ্য সাধনে তিনি যেন আরো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছেন। মৃত্যুশয্যায়ও তিনি ভুলেননি স্বীয় দায়িত্ব। কম্পিত হস্তে খোলা চিঠি লিখেছেন- ‘দানব-দমন’-এর দায়িত্ব অর্পণ করেছেন জনগণের ওপর। তার মৃত্যুর ১৪ বছর পর ২০০৮ সালে গণমানুষের বিপুল ভোটে জয়ী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭১ সালে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত চিহ্নিত ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের আওতায় বিচারের উদ্যোগ নেয়াতে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত গণদাবি ক্রমান্বয়ে একটি পরিণতির দিকে যাচ্ছে। কোন প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে নয়, বরং জাতীয় স্বার্থে, মানবতার স্বার্থে এই বিচার হওয়া জরুরি।
স্বাধীন বাংলাদেশে নানা অজুহাতে মুক্তিযুদ্ধ পক্ষ শক্তির বিভাজন ও ১৯৭১-এর পরাজিত হওয়া সেই অপশক্তির পুনরুত্থানের গল্পই মোটা দাগে আমাদের বিগত কয়েক দশকের ইতিহাস। যদিও ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ বিশ্ব মানচিত্রে স্থান করে নেয়া সদ্যজাত বাংলাদেশ ঘাতক বাহিনীর সকল মারণযজ্ঞের বিরুদ্ধে এক সরব প্রতিবাদ; কিন্তু বীর বাঙালির কাছে পরাভূত হবার বিষয়টি পাকিস্তানি বাহিনী ও এদেশীয় দালাল/ ঘাতকদের পক্ষে সহজ ছিল না। তাই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই বদ্বীপে পুনরায় তাদের আধিপত্য বিস্তারের অপেক্ষায় থেকেছে এই অপশক্তি। বিজয়ের মাত্র চার বছরের ব্যবধানে ১৯৭৫-এ মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর একাধিক্রমে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত মূলত সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অঙ্গুলি হেলনে দেশ পরিচালিত হয়। তরুণ মনে প্রোথিত হয় এক অদ্ভুত বিভ্রান্তিকর তথ্যের তরুমূল যা ক্রমশই শাখায় প্রশাখায় পল্লবিত হয়ে সমাজের এক বিরাট অংশকে গ্রাস করতে সমর্থ হয়েছে। ফলে আজকের তারুণ্যের এক উল্লেখযোগ্য অংশই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি, ইতিহাস ও এর সাথে সম্পৃক্ত নেতা ও ব্যক্তিবর্গকে অসম্মানের চোখে দেখে; বিভ্রান্তিক তথ্যপুষ্ট হয়ে এই তরুণ মন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী নানা উস্কানিতে সমর্থন প্রদান করে ও প্রশ্নাতীতভাবে জড়িত হতে আগ্রহী হয় এই দেশের ঘাতক শক্তি, যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে। নির্বাসিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুনরায় তারুণ্যের মনে জাগ্রত করার আন্দোলন শুরু হয় ১৯৯১-এর ডিসেম্বরে যখন রাজাকার শিরোমণি, যুদ্ধাপরাধের দায়ে এদেশের নাগরিকত্ব হারানো গোলাম আজমকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ঘোষণা করা হয়। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম নেতৃত্ব দেন সেই আন্দোলনের।
আজ ২০১৪ সালে মুক্তিযুদ্ধের ৪৩ বছর পরেও নবাগত তরুণ প্রজন্মকে জোরকণ্ঠে জানানো প্রয়োজন যে, আমাদের বাবা, মা, আপন স্বজনসহ সকল মুক্তিকামী বাঙালিদের হত্যা-নির্যাতনের বিষয়ে পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের মনোভাব ছিল উপরোক্ত অ্যাগামেমননের সংলাপের অনুরূপ। যদি সত্যি তারা সময় পেত-তাহলে মুক্তিকামী বাঙালির প্রত্যেককে তারা ঝাড়ে-বংশে শেষ করতো।
মানুষদের বিভ্রান্ত করার এজেন্ডা নিয়ে যে গোষ্ঠী আজ তত্পর, তাদের সকল অপচেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য, কারণ আজকের হিসেব মেলাতে হবে মুক্তিযুদ্ধের দর্পণের দিকে চেয়েই। মাথায় আসা হাজারো প্রশ্নের জবাব পেতে হবে সেখানেই। স্থানাভাবে আমরা আপাতত তিনটি ভাগে বিভক্ত কয়েকটি অতি সাধারণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজি:
ক. একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের মত বাংলা ভাষায় কথা বলতো এমন একটি গোষ্ঠী কি পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে হাত মিলিয়ে মুক্তিকামী মানুষদের হত্যাসহ নানা ধরনের যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত ছিলো? খ. এদেশের একজন সচেতন লেখিকা জাহানারা ইমামের সন্তান রুমিকে কি ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধা হবার অপরাধে হত্যা করা হয়েছিলো? জাহানারা ইমাম কি একজন শহীদের মা? তিনি কি বিগত নব্বই দশকের শুরুতে গোলাম আজমসহ এদেশের চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন? গ. তদানীন্তন খালেদা জিয়া সরকার কি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি উত্থাপন করার অপরাধে অন্যদের সাথে আন্দোলনের নেত্রী জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলা করেছিলো?
এদেশের সচেতন নাগরিক মাত্রেই স্বীকার করবেন যে উপরোক্ত ক, খ ও গ এর উত্তর ‘হ্যাঁ’-সূচক। পেছন ফিরে তাকিয়ে এর উত্তর পেতে হয় না। কিন্তু যুক্তির উপর ভিত্তি করে যদি আমরা ক, খ ও গ এর উত্তর খুঁজি তাহলে দেখবো ক ও খ এর উত্তর ‘হ্যাঁ-সূচক’ হলে- গ এর উত্তর কোনভাবেই ‘হ্যাঁ-সূচক’ হবার কথা নয়। কারণ যে মাতা বিচার চাইছেন সেই সকল বর্বরের যাদের অবয়ব রঞ্জিত তাঁর সন্তান ও এদেশের লক্ষ লক্ষ শহীদের রক্তে; যে মাতা কোরবানী করেছেন তাঁর সন্তানকে এই রাষ্ট্রের জন্মদান করতে- তিনি কিভাবে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ হবেন? কিন্তু এ জগত্ দেখেছে সরকারের বিচার চাইবার অপরাধে একজন শহীদ জননীর নাম সরকারের খাতায় উঠেছে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে; এবং রাষ্ট্রদ্রোহীতার অপবাদ নিয়েই সে শহীদ মাতা এই ধরা ত্যাগ করেছেন ১৯৯৪ সালে আজকের এই দিনে। বাংলাদেশের তদানীন্তন খালেদা-সরকার যুক্তি বা আবেগ নয়, অপযুক্তি, কুযুক্তি ও নিরাবেগের বশবর্তী হয়ে সজ্ঞানে শহীদ মাতাকে রাষ্ট্রদ্রোহী সাব্যস্ত করেছিল- আমাদের আজকের বাস্তবতা বুঝতে এ বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করা জরুরি। ‘আকলমন্দ কে লিয়ে ইশারাই কাফি’।
লেখক :প্রজন্ম ৭১-এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক
