জনস্বাস্থ্য ও জনস্বার্থের প্রশ্নে আপস নয়

আপডেট : ২৫ জুন ২০১৪, ২১:৪১
প্রধানমন্ত্রী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করিয়াছেন যে, খাদ্যপণ্যে ভেজাল মিশ্রণকারীদের বিরুদ্ধে সরকার যে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করিয়াছে তাহা অব্যাহত থাকিবে। গত বুধবার জাতীয় সংসদে এই লক্ষ্যে গৃহীত ব্যবস্থাদির কথা উল্লেখ করিয়া তিনি বলিয়াছেন যে, ভেজাল পণ্য ও খাদ্যসামগ্রী হইতে জনগণকে রক্ষার বিষয়টিকে তাহার সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসাবে গণ্য করিয়া আসিতেছে। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে আমরা অত্যন্ত সময়োচিত ও তাত্পর্যপূর্ণ বলিয়া মনে করি। কারণ প্রধানমন্ত্রী নিজেই দাবি করিয়াছেন যে, ভোক্তারা ইতোমধ্যেই সরকারের গৃহীত ব্যবস্থাদির সুফল পাইতে শুরু করিয়াছেন। তাঁহার এই দাবি যে অযথার্থ নহে—ভুক্তভোগী মাত্রই তাহা স্বীকার করিবেন। সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে বাজারের দৃশ্যপটই যে বহুলাংশে বদলাইয়া গিয়াছে তাহা বুঝিবার জন্য বিজ্ঞানী বা বিশেষজ্ঞ হইবার প্রয়োজন পড়ে না। প্রাণঘাতী রাসায়নিকের যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে মাছ-মাংস ও ফলের বাজার হইতে যেই মাছি উধাও হইয়া গিয়াছিল—সংখ্যায় কম হইলেও তাহারা ফিরিতে শুরু করিয়াছে। দিনের পর দিন ফেলিয়া রাখিলেও যেইসব ফল চকচক করিত এবং যাহাদের রঙ চোখ ধাঁধাইয়া দিত—এখন সেইখানে কিছুটা হইলেও স্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যাইতেছে। আতঙ্কিত ভোক্তারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিতে শুরু করিয়াছেন। ভেজাল খাদ্যের কিনারা হইতে ঘুরিয়া দাঁড়ানোর এই যে প্রয়াস তাহাকে খাটো করিয়া দেখিবার কোনো অবকাশ নাই। আমরা প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণাকে স্বাগত জানাই। প্রসঙ্গত ইহাও লক্ষণীয় যে, এমন এক সময়ে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাটি আসিয়াছে যখন সরকারের এই শুভ উদ্যোগকে ব্যর্থ ও অকার্যকর করিয়া দেওয়ার জন্য প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে চলিতেছে বহুমুখী তত্পরতা। সাধু কর্মের জন্য কোনো অজুহাতের প্রয়োজন হয় না। শুধু সদিচ্ছা ও সংকল্পই যথেষ্ট। কিন্তু অসাধু কর্মকে জায়েজ করিবার জন্য যেমন নানা অজুহাত লাগে, তেমনি বিস্তর কাঠখড়ও পোড়াইতে হয়। বাস্তবেও যেন তাহারই মহড়া চলিতেছে। আম-জাম-লিচুর মতো মৌসুমী ফলে—এমনকী দুধ-মাছ-মাংস-শুঁটকি এবং শাক-সবজিতেও যে ফরমালিন, কার্বাইড ও ডিডিটিসহ বিভিন্ন বিপজ্জনক রাসায়নিক প্রয়োগ করা হইতেছে তাহা কোনো নূতন কথা নহে। ইহার জন্য প্রথমে খুচরা বিক্রেতারা পাইকারি বিক্রেতার উপর এবং পাইকারি বিক্রেতারা উত্পাদকের উপর দায় চাপানোর চেষ্টা করিয়াছেন। পরে এমন কথাও বলার চেষ্টা হইয়াছে যে, এইসব রাসায়নিক মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর নহে। এখন ফরমালিন পরীক্ষার পদ্ধতি লইয়াই প্রশ্ন তোলা হইয়াছে। কিন্তু এই সহজ কথাটি কেহই বলিতেছেন না যে, আমরা খাদ্যে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করিব না। অন্যকেও করিতে দিব না। যদি কেহ করেন আমরাই স্বতঃপ্রণোদিতভাবে তাহাকে আইনের নিকট সোপর্দ করিব। আমরা বিশ্বাস করি যে, খাদ্যপণ্য উত্পাদন ও বিপণনের সহিত যাহারা জড়িত তাহাদের বৃহদংশই সত্। কিন্তু অল্পসংখ্যক অসাধু ব্যক্তির কারণে আজ সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছেন। সেইসাথে ক্ষুণ্ন হইতেছে তাহাদের ভাবমূর্তিও। এই কথা তো সত্য যে, এক-দেড় দশক আগেও খাদ্যে কীভাবে ফরমালিন বা বিষাক্ত রাসায়নিক মিশাইতে হয় তাহা আমরা জানিতাম না। তখনও তো উত্পাদকরা ব্যাপকভাবে আম উত্পাদন করিয়াছেন। পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা সফলভাবে তাহা সারা দেশের ভোক্তাদের নিকট পৌঁছাইয়া দিয়াছেন। তখন যাহা সম্ভব হইয়াছে এখন তাহা সম্ভব হইবে না কেন—তাহা আমরা বুঝিতে অক্ষম। ভরা ফলের মৌসুমে ফরমালিন বা রাসায়নিকের আতঙ্কের কারণে উত্পাদক ও ব্যবসায়ীদের যে বড়ো ধরনের ক্ষতি হইতেছে তাহাতে সন্দেহ নাই। তবে এখন ভাবিয়া দেখিবার সময় আসিয়াছে যে তাত্ক্ষণিক লাভের জন্য গোটা জাতিকে সজ্ঞানে আমরা ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে ঠেলিয়া দিব, নাকি সকলের সম্মিলিত নিরাপত্তার স্বার্থে তাত্ক্ষণিক ক্ষতিটুকু বরণ করিয়া লইব। বলা বাহুল্য যে, ব্যবসায়ীরাও জনগণেরই অংশ। তাহারাও নিশ্চয় স্বীকার করিবেন যে, জনস্বাস্থ্য ও জনস্বার্থের প্রশ্নে আপস চলে না। তবে কেহ যাহাতে অহেতুক হয়রানির শিকার না হয় তাহা যেমন নিশ্চিত করিতে হইবে, তেমনি ফরমালিন পরীক্ষার পদ্ধতি লইয়া সৃষ্ট সকল বিভ্রান্তি নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে অতি দ্রুত। নিশ্চিত করিতে হইবে পচনশীল খাদ্যপণ্য সংরক্ষণের নিরাপদ ব্যবস্থাও।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন