[ বা জে ট ]

২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটে মধ্যবিত্ত কী পেল

আপডেট : ২৫ জুন ২০১৪, ২১:৪২
জুন মাসের ৫ তারিখে জাতীয় সংসদে নতুন সরকারের বাজেট ঘোষিত হয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটটি পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বলা যায়, বাজেট ঘোষণার কাজ শেষ হতে না হতেই এর উপর আলোচনা শুরু হয়ে যায়। এই আলোচনা আজো চলছে। আলোচনা-সমালোচনা করছেন ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা। আলোচনা-সমালোচনা করছেন অর্থনীতিবিদ, গবেষক, নীতি-নির্ধারকরা। আলোচনা-সমালোচনা করছেন প্রাক্তন আমলা-কামলারা। আলোচনা তো সান্ড্রি গবেষণা সংস্থাগুলো করছেই। সর্বশেষ আলোচনাটার খবর দেখলাম গত রবিবার। এর আয়োজন করেছিল নতুন একটা হাইব্রিড সংস্থা। আলোচনায় বিনিয়োগ সম্পর্কে, বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগ সম্পর্কে উদ্বেগ দেখলাম। দেশের স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগ দেখলাম। ‘ইস্ক্লুসিভ’ নির্বাচনের কথা শুনলাম। সুশাসনের কথাও জানলাম। কৃষির সমস্যা, শিল্পের সমস্যার কথাও আলোচিত হচ্ছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির টার্গেট উচ্চাভিলাষী, ঋণের, বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা উচ্চাভিলাষী, মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা উচ্চাভিলাষী- এসব মন্তব্যও শুনলাম। এই জাতীয় অনেক কথাই আলোচকরা করে যাচ্ছেন। ফাঁকে ফাঁকে কড়া ভাষায় ব্যাংকগুলোকে গালমন্দও করা হচ্ছে। সরকারের লোকই সরকারি ব্যাংক বিক্রির কথা বলছেন। আমি আলোচনা শুনি আর শুনি, আলোচনার খবর পড়ি আর পড়ি শান্তি পাই না। মনের কথা পাই না। ভাবি, সবার কথা বলার লোক আছে, দেশের জন্য কথা বলার লোক আছে কিন্তু যারা হাত পাততে পারে না, যারা সাহায্যের জন্য মানুষের দুয়ারে দুয়ারে যেতে পারে না, যাদের কিছুটা হলেও আত্মসম্মানবোধ আছে, যারা তিলে তিলে মরছে সেই মধ্যবিত্তের কথা বলার কোনো লোক নেই। এই পর্যন্ত কোনো আলোচককেই এদের সম্বন্ধে কিছু বলতে শুনিনি। হতে পারে আমার শোনার ভুল! দেশে মধ্যবিত্তের সংখ্যা কত? শোনা যায়, এখন মোট জনসংখ্যার ২০-২৫ শতাংশ লোক মধ্যবিত্ত। এদের দোষ-গুণ কী? একটা গুণ তো পরিষ্কার। এরা অর্থনীতির জন্য মহা-প্রয়োজনীয় ক্রয়ক্ষমতার (পার্চেজিং পাওয়ার) সরবরাহকারী। ষোল কোটি লোকের মধ্যে ৪ কোটি লোক মধ্যবিত্ত। এরাই বাজার। যে সেবা খাত এখন ৫০ শতাংশ ‘জিডিপির’ মালিক সেই সেবা খাতের স্তম্ভ মধ্যবিত্ত। শিল্প দ্রব্যের ক্রেতা এরা। কৃষিপণ্য, বিশেষ করে শাক-সবজি, মাছ-মাংস, ফলমূলের ক্রেতা এরা। ১৬ কোটির মধ্যে মাত্র ৪ কোটি লোক মধ্যবিত্ত। কিন্তু এরা অর্থনীতির নিয়ামক শক্তি। আর নিয়ামক শক্তি বিদেশে ডলার উপার্জনরত রেমিটেন্সওয়ালা-বাংলাদেশি। এরা বাংলাদেশের যে মোট ভোগ (কনজামশন) তার বিপুলাংশ করে। চালের কথা বাদ দিই, ডাল, পিঁয়াজ, রসুন, তেল, দুধ, সাবান, মসলাপাতি, চিনি ইত্যাদির ক্রেতা এরাই। ‘পিজার’ ক্রেতা এরাই। দক্ষিণ ভারতীয় খাবার ‘দোসার’ ক্রেতা এরাই। মিষ্টি, ফুল, দইয়ের ক্রেতা এরাই। এরাই আবার করদাতা— প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ। এহেন সোনার হাঁসটি মাননীয় অর্থমন্ত্রীর বাজেট থেকে কী পেল? ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট থেকে কী পেল? অতীব দুঃখের বিষয় এদের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব কেউ দিচ্ছেন না, দেন না। মাননীয় অর্থমন্ত্রী গরীবের বন্ধু, কৃষকের বন্ধু। এটা তাকে হতেই হবে। এছাড়া গতি নেই। সমাজে-অর্থনীতিতে, বাজার অর্থনীতির যে অবিচার সংঘটিত হচ্ছে, যেভাবে ধন-সম্পদ ‘নূর হোসেনদের’ কাছে কুক্ষিগত হচ্ছে তাতে ‘সোসাল সেইফটি নেটে’ টাকার বরাদ্দ তাকে প্রতিবছর বাড়াতেই হবে। শত হোক ‘ল’ এন্ড অর্ডার’ বলে একটা জিনিস আছে। মানুষকে, সাধারণ মানুষকে অভুক্ত রাখা যাবে না। তার নাকটা যাতে জলের উপর ভাসিয়ে রাখতে পারে তার জন্য কিছু খরচা করতেই হবে। এটা উগ্র বাজার অর্থনীতির ‘কাফফারা’। অর্থমন্ত্রী এটা বোঝেন। অতএব দরিদ্রের বন্ধু তাকে হতেই হবে। এতে কারো আপত্তি নেই। সবার বরং এতে সম্মতি রয়েছে। কৃষকের প্রতি বন্ধুভাবাপন্নও তাকে হতে হবে। তিনি হচ্ছেনও। তারা তাকে পুরস্কৃত করছেন। চাল আর আমদানী করতে হয় না। কৃষক-অর্থমন্ত্রী বন্ধুত্ব এটা কাম্য। এটা সকলেই বুঝি। কিন্তু যেটা বুঝি না সেটা হচ্ছে তার মধ্যবিত্তের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী। তিনি কেন এত অনুদার তাদের প্রতি? কেনই বা আমাদের সান্ড্রি গবেষক, নীতি-নির্ধারক, সাবেক আমলারা মধ্যবিত্তের প্রতি এত অনুদার? মধ্যবিত্ত শুধু ক্রয়ক্ষমতার দৃষ্টিকোণ ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। মধ্যবিত্ত, চাকরিজীবী মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত সঞ্চয়ের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি, বিনিয়োগ ছাড়া আমাদের উন্নতি হবে না। বিনিয়োগ আসবে কোত্থেকে? যদি সঞ্চয় না বাড়ে তাহলে বিনিয়োগ আসবে কোত্থেকে? আসতে পারে বিদেশ থেকে। সেটা কিন্তু বিদেশিদের সঞ্চয়। তা আসুন। কিন্তু আমাদের সঞ্চয়ের কী হবে? এটা তো গতিহীন-স্থবির ১০-১২ বছর যাবত্। এই সঞ্চয় কিন্তু করে মধ্যবিত্ত। আবার মধ্যবিত্ত করও দেয়। দেখা যাচ্ছে, এই মধ্যবিত্ত করের ক্ষেত্রেও নির্যাতিত, অবহেলিত এবং বৈষম্যের শিকার। আবার সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে তারা নিরুত্সাহিত। অথচ এসব ক্ষেত্রে আমাদের অর্থমন্ত্রণালয় বড়ই উদার ব্যবসায়ী-শিল্পপতির প্রতি। তারা না চাইতেই সব পায়। সরকার তাদের ‘জামাই আদর’ করে। তারা কয়জন দুই টাকা ট্যাক্স দেন? তাদের দাবি অনুযায়ী প্রতি বছর সরকার ট্যাক্স কমায়। এবারও তাই করা হয়েছে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি অর্থাত্ যেসব কোম্পানির শেয়ার বাজারে বিক্রি হয় না তাদের ট্যাক্স কমানো হয়েছে। ছিল ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এটা করা হয়েছে ৩৫ শতাংশ। আরো কত কী সুযোগ-সুবিধা। সবই উন্নতির নামে, ব্যবসার নামে, শিল্পায়নের নামে, রপ্তানির নামে। তারা একেক দাবি করেন আর তা সরকার মেনে নেয়। প্রশ্ন বেসরকারি খাতের প্রাইভেট কোম্পানির ট্যাক্স হার যদি কমানো যায়— তাদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার অভিযোগ সত্ত্বেও। তাহলে মধ্যবিত্ত করদাতাদের ট্যাক্সের হার কমাতে অথবা তাদেরকে কিছুটা রেয়াত দিতে সরকারের অসুবিধা কোথায়? ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা মধ্যবিত্তের জন্য অপরিবর্তিত রয়েছে। সাধারণ আয়কর দাতাদের করমুক্ত আয়সীমা দুই লক্ষ ২০ হাজার টাকা। অর্থমন্ত্রী নিজেই মূল্যস্ফীতির কথা বলেছেন। তাহলে কোন যুক্তিতে তিনি করমুক্ত আয়সীমা তাদের জন্য অপরিবর্তিত রাখলেন? যদি রাখলেনই তাহলে ব্যবসায়ীদের কর কমালেন কেন? তারা কী অভাবে আছে? সুইস ব্যাংকে টাকা, মালয়েশিয়ার সেকন্ড হোম, কানাডার বেগম নগর, দুবাইর ব্যবসার মালিক কে? এটা তো সবারই জানা। তারা ব্যক্তিগতভাবে কর দেবেন না। কোম্পানির ট্যাক্স কমিয়ে নেবেন, ভ্যাটের টাকা দেবেন না, গ্যাস-বিদ্যুতের টাকা নিয়ে নয়-ছয় করবেন, করবেন মানে বিরাট সংখ্যক ব্যবসায়ী। অথচ এরাই সব সুযোগ-সুবিধা পাবে—এটা কেমন কথা মাননীয় অর্থমন্ত্রী। করমুক্ত আয়সীমাই শুধু নয়, কোনোভাবেই মধ্যআয়ের করদাতা মধ্যবিত্তকে কোনো স্বস্তি দেয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে না। বলাবাহুল্য ভ্যাটের টাকাও ক্রেতা হিসাবে মধ্যবিত্তরাই বেশি দেয়, অন্যরাও দেয়। ভ্যাট একটা সর্বগ্রাসী ব্যবস্থা, পরোক্ষ কর। মধ্যবিত্তের বোঝাই এতে বেশি। উেস কেটে নেয়া কর। এখানেও মধ্যবিত্ত। তাদের প্রচুর টাকা এই ক্ষেত্রে অগ্রিম কর হিসাবে কেটে নেয়া হয়। এভাবে দেখা যাবে আয়করের ক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত কিছু পায় না, কোনো বছরই পায় না। বরং পরোক্ষ করের বোঝাও বেশিরভাগটা তারাই বহন করে। এটা কোন বিচার? বিপরীতে তার আয়ের ক্ষেত্রে কী ঘটছে। মধ্যবিত্তরাই সঞ্চয় করে, করার চেষ্টা করে। সারা জীবন ধরে টাকা জমানোর চেষ্টা করে। যারা চাকরি করে তারা অবসরের সময় চাকরিদাতার কাছ থেকে কিছু টাকা পায়। আজকাল বাজারে তার পরিমাণ কিছুটা বেশিই। আগে ১০-১৫-২০ লক্ষ টাকা নিয়ে মধ্যবিত্তরা অবসর নিত। এখন এর পরিমাণ ৩০-৪০-৫০ লক্ষও হয়েছে। সারা জীবনের সঞ্চয় এবং প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা, গ্র্যাচুইটির টাকা তারা সঞ্চয়পত্রে রাখে, ব্যাংকে আমানত হিসাবে রাখে। তারা চায় নিরাপদ জীবনযাপন করতে, থাকতে চায় স্বস্তিতে। ঘুমোতে চায় বিনা চিন্তায়। এহেন সঞ্চয়পত্রের অবস্থা কী? এতে সরকার ও অর্থ মন্ত্রণালয় খড়গহস্ত হয়ে বসে আছে। সুদের হার কমানো হয়েছে, ক্রয়সীমা কমানো হয়েছে। সঞ্চয়পত্রের লাভের উপর কর বসানো হয়েছে। উেস কর টাকার ব্যবস্থা হয়েছে। আবার বছর শেষে এর উপর চূড়ান্ত কর দেয়ার ব্যবস্থা আছে। আরো কত কী? দেখা যাবে, এভাবে মধ্যবিত্তের আয় কমিয়ে ফেলা হয়েছে। দেখুন ব্যাংক আমানতের কথা। এখন ৮ শতাংশও লাভ পাওয়া যায় না। অথচ মূল্যস্ফীতি এখনো এর চেয়ে বেশি। কী দোষ হত উেস কর কেটে সঞ্চয়পত্রের লাভকে চূড়ান্ত দায় পরিশোধ হিসাবে গণ্য করলে? কী মহাভারত অশুদ্ধ হয় ক্রয়সীমা ৩০ লক্ষ টাকা থেকে ৬০-৭০ লক্ষ করলে? অন্তত টাকা তো দেশেই থাকে। তাই নয় কী? দেখা যাচ্ছে, মধ্যবিত্ত ‘ট্যাক্সড’ হয়ে মার খাচ্ছে, আবার আয়ের ক্ষেত্রেও মার খাচ্ছে। তার প্রতি সরকার এত নির্দয় কেন— এটা আমি ভেবে পাই না। যখন দেখি তারাই বাজারে ক্রয়ক্ষমতা জোগায় তখন আরো অবাক হই তাদের প্রতি অবিচার দেখে। লেখক :অর্থনীতিবিদ