ফরমালিন ৩৭% ফরমালডিহাইডের ঝাঁঝালো গন্ধযুক্ত বিষাক্ত তরল দ্রবণ। চিকিত্সা ক্ষেত্রে, ওষুধশিল্পে ও গবেষণাগারে মূলত এর ব্যবহার। ফরমালিন দিয়ে মৃতদেহ ও এর বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দীর্ঘকাল অপচনশীল অবস্থায় সংরক্ষণ করা যায়। অন্যদিকে ফরমালডিহাইড কাঠশিল্পে, কাগজশিল্পে, পোশাকশিল্পে, কসমেটিক্স জাতীয় পণ্য শ্যাম্পু, সাবান, ক্রীম, লোশন, নেইলপলিশ, বিল্ডিং ও আসবাবপত্র প্রভৃতিতে বিভিন্নভাবে ব্যবহূত হয়ে থাকে। পণ্যকে উজ্জ্বল, মজবুত, টেকসই এবং দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণে বিভিন্ন মাত্রায় যুক্ত করা হয় এই ফরমালডিহাইড। ফরমাল্ডিহাইডের বিষাক্ততা এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বিবেচনায় উন্নত দেশগুলোতে এর ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। আর খাদ্যে ফরমালিনের কথা ভাবাই যায় না। অথচ আমাদের দেশে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ফল, শাকসবজি, মাছ প্রভৃতি ভোগ্যপণ্যে নির্বিচারে ফরমালিন ব্যবহার করে আসছে।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের(পবা) এক গবেষণা তথ্যমতে ঢাকার বিভিন্ন ফলের বাজারে ১০০% জামে, ৯৫% লিচু, ৬৬% আম, ৫৯% আপেল, ৬৯% মাল্টা এভং ৮৭% আঙ্গুরে ফরমালিন ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে। ‘পবা’ চট্টগ্রামের বিভিন্ন বাজারেও ১০০% আঙ্গুর ও ১০০% আনারসে ফরমালিনের অস্তিত্ব পেয়েছে। সবচাইতে ভয়বহ বিষয় হলো বিশেষজ্ঞদের মতে মানবদেহে ফরমালিনের সহনশীল মাত্রা ১.৫ পিপিএম ( পার্টস পার মিলিয়ন) হলেও ঢাকার বাজারে সামপ্রতিক পুলিশ অভিযানে মৌসুমী ফলে ১৫৫ পিপিএম মাত্রার ফরমালিন শনাক্ত হয়েছে। ফরমালিনের আতঙ্কে অনেকেই এখন ফল খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। অথচ রোগ প্রতিরোধ ও পুষ্টি বিবেচনায় ফল খাওয়ার গুরুত্ব অনেক। কেবলমাত্র ফলেই নয় মাছ, মাংস-দুধ ও অন্যান্য পচনশীল ভোগ্যপণ্য তাজা ও আকর্ষণীয় রাখতে লোভী ব্যবসায়ীরা খেয়াল-খুশিমতো এই বিষাক্ত রাসায়নিকটি ব্যবহার করে চলেছে। ফরমালিনের তাত্ক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিকর প্রভাব বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত। তীব্রমাত্রায় ফরমালিন দেহের সংস্পর্শে এলে যেমন ত্বক, চোখ, নাক, গলা, পরিপাকতন্ত্র ও শ্বাসযন্ত্রে গুরুতর উপসর্গ সৃষ্টি করতে পারে তেমনি ঘটাতে পারে মৃত্যু। খাবারের মাধ্যমে শরীরে এর বিভিন্ন মাত্রায় দেখা দিতে পারে বহুমুখী উপসর্গ।
শরীরে দীর্ঘমেয়াদী ফরমালডিহাইডের উপস্থিতি লিভার, কিডনী ও ফুসফুসকে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। দেখা দিতে পারে নিউরোলজিক্যাল সমস্যা এবং শিশুদের জন্মগত বৈকল্য। ফরমালিনের স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা বিবেচনা করে এর আমদানি, বিপণন, সরবরাহ ও ব্যবহারে কঠোর আইন এবং ব্যাপক সচেতনতা জরুরি। এক্ষেত্রে ভোগ্যপণ্য ক্রয়ে ব্যক্তিসচেতনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফলমূল, শাকসবজি, মাছ প্রভৃতি পচনশীল ও সংরক্ষিত পণ্যক্রয়ে ক্রেতাদের সতর্ক থাকা উচিত। বাজার থেকে কেনা ফলমূল পানিতে ভালো করে ধুয়ে তারপরই খাওয়া উচিত। শুকনো ও সংরক্ষিত খাবার খাওয়ায় সতর্কতা আরো দরকার। ফরমালিনযুক্ত মাছে সাধারণত মাছি বসে না। চোখ থাকে চকচকে, মাছের আঁইশ ও ত্বক শক্ত চামড়ার মতো। মাছের স্বাভাবিক আঁঁশটে গন্ধও পাওয়া যায় না। ব্যক্তিপর্যায়ে সতকর্তা সত্ত্বেও ফরমালিনের ঝুঁকি থেকেই যায়। তা-ই ফরমালিনমুুক্ত বাজার প্রতিষ্ঠাই আসল কথা। প্রতিটি বাজারে হিমাগার প্রতিষ্ঠা এবং পচনশীল খাদ্য সংরক্ষণ ও বিপণনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ দরকার। এক্ষেত্রে পরিবহনগত সংকট নিরসনের কথাও ভাবতে হবে।
বাজারে ফরমালিন সনাক্তকরণে উপযুক্ত এবং সঠিক মানের ফরমালডিহাইড মিটার বা পরীক্ষাযন্ত্রের ব্যবহার একটি অপরিহার্য বিষয়। প্রাকৃতিকভাবেই স্বাভাবিক মাত্রার ফরমালডিহাইড ফল, সবজি ও মাছে থাকতে পারে। কাজেই ফরমালিনের উপস্থিতি খাদ্যে ফরমালিন ব্যবহার নিশ্চিত করে না। এক্ষেত্রে ফলমূলে ফরমালিন বা ফরমালডিহাইডের উপস্থিতি মাত্রা গুরুত্বপূর্ণ। তাই ফরমালিন-বিরোধী অভিযান যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয় এবং ব্যবসায়ীরা যেন অহেতুক ক্ষতি ও হয়রানির শিকার না হয় সেদিকেও লক্ষ্য রাখা উচিত। কারণ এর সাথে আমাদের কৃষি অর্থনীতির বিষয়টিও জড়িত। তবে ফরমালিন-বিরোধী অভিযান যেন কোনভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয় এদিকে লক্ষ্য রাখা দরকার। বিষ ও ভেজালমুক্ত নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে আমাদের দেশে প্রায় একডজনেরও বেশি আইন আছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা এবং আইনের ধারাবাহিক রুটিনভিত্তিক কার্যক্রমের অভাবে ক্রেতা-ভোক্তারা কাঙ্ক্ষিত ফল থেকে বঞ্চিত। খাদ্যে ফরমালিনসহ যে কোনো ক্ষতিকর প্রিজারভেটিভের নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড এন্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের মতো শক্তিশালী একক সংস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। জনস্বাস্থ্য সংরক্ষণ ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তার স্বার্থে বিষমুক্ত নিরাপদ খাদ্য সুনিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া এখন সময়ের দাবি।
লেখক:অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক, শহীদ জিয়াউর রহমান কলেজ, জামালপুর।
