বর্ষা আসিলেই চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলির নানান স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটিতে থাকে এবং কিছু মানুষের অনিবার্য মৃত্যুর সংবাদ শুনিতে পাওয়া যায়। এই বছর বর্ষা শুরু হইতে না হইতেই পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটিয়াছে চট্টগ্রাম শহর, বান্দরবান ও কমলগঞ্জে। এই ঘটনাগুলি যেন চেনা চিত্রের পুনরাবৃত্তি মাত্র। ফি বছরই এই ধরনের দুর্ঘটনা কমবেশি ঘটিয়া থাকে। এইসব যেন বা আমাদের গা সহা হইয়া গিয়াছে। বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ঘটিলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয় এবং প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবার নিমিত্ত দেওয়া হইয়া থাকে নানান পরামর্শ। কিন্তু প্রতিকার হয় না। পুনরায় পাহাড়ধসের কথা শোনা যায় এবং আরও কিছু মানুষের মৃত্যু ঘটে। অল্পবিস্তর কিছু উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও, কোনো ফলোদয় ঘটিতে দেখা যায় না।
উদাহরণ হিসাবে হাজির করা যায় কক্সবাজারের চকোরিয়ার কথা। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে, চলতি বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই স্থানীয় প্রশাসন ঝুঁকির মধ্যে থাকা পাহাড়ের ঢালে ও পাদদেশে বসবাসকারী মানুষগুলিকে সরিয়া যাইবার জন্য মাইকিং করা হইয়াছে। অধিক ঝুঁকিতে থাকা পরিবারকে স্থানীয় সাইক্লোন সেল্টার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্থান করিয়া দিবার নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। যেকোনো মুহূর্তে পাহাড়ধসের ঝুঁকি থাকিলেও অধিবাসীরা সরিয়া যাইতেছে না। কখনো কখনো স্থানীয় প্রশাসন এই সকল ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলিকে উচ্ছেদও করিয়া থাকে। কিন্তু কিছুদিন পর তাহারা আবার একত্রিত হইয়া বসবাস শুরু করিয়া দেয়। ইহা কেবল চকোরিয়ায় নহে, পাহাড়ে বসবাসকারী বিভিন্ন জেলার মানুষগুলি প্রায় একইরকম আচরণ করিয়া থাকে। কারণ তাহাদের সকলের বাস্তবতা প্রায় একই রকম। কোথাও মাথা গুঁজিবার ঠাঁই নাই।
সাধারণত পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী মানুষগুলি নিম্নবিত্তের অসহায় ভূমিহীন মানুষ হইয়া থাকে। নদীভাঙ্গন বা অন্য কোনো কারণে সর্বস্ব হারাইয়া পাহাড়ে কুঁড়েঘর বানাইয়া কোনোরকমে তাহারা জীবনযাপন করিয়া থাকে। অনেকক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালীদের নিকট কিছু মাসোহারা দিয়া তাহারা এইসব স্থানে প্রায় বিনা ভাড়ায় থাকার সুযোগ পাইয়া থাকে। শহরে যেমন করিয়া বস্তিবাসীরা প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় কোনোরকমে মাথা গোঁজার ঠাঁই পায়, পাহাড়ের ঢালের মানুষগুলির ক্ষেত্রে একই কথা খাটিবে। নিঃস্ব মানুষগুলি তিল তিল করিয়া এই নিবাসেই অকিঞ্চিত্কর সম্পদ গড়িয়া তোলে, যাহা সহসা ত্যাগ করিয়া অস্থায়ী কোনো ক্যাম্পে তাহারা যাইতে চাহে না। ফলে তাহাদের উচ্ছেদ বাস্তবসম্মত ও মানবিক নহে। বরং তাহাদের স্থায়ীভাবে সরাইয়া অন্যত্র পুনর্বাসনই লাগসই সমাধান হইতে পারে। অস্থায়ীভাবে ক্যাম্পে সরাইয়া লওয়া কিংবা উচ্ছেদের পদক্ষেপ স্থায়ী কোনো সমাধান নহে। বর্ষা চলিয়া গেলে অসহায় মানুষগুলি আবার সেই পাহাড়েই ফিরিয়া যাইবে এবং পরবর্তী বর্ষায় আবারও মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়িবে।
অন্যদিকে পাহাড়ধস পুরাপুরি প্রাকৃতিক কারণে হয় না। পাহাড়কর্তন কিংবা প্রাকৃতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো পাহাড়ধসের অন্যতম কারণ। দখল, পাহাড়ের পাদদেশে ভৌত স্থাপনা নির্মাণ, ভিন্ন কাজে মাটির ব্যবহার ইত্যাদি নানান উদ্দেশ্যে লোভী ভূমিদস্যুরা পাহাড় কর্তন করিয়া থাকে। সরকারি নানান প্রকল্পের জন্যও পাহাড়কর্তন করা হইয়া থাকে। ফলে পাহাড়ের স্বাভাবিক গঠনের ভারসাম্য হারাইয়া যায়, অল্প বর্ষণেই পাহাড়ের উপরের দিক হইতে মাটি নিম্নে ধসিয়া পড়ে। আবার কিছু প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিলে ধসের সম্ভাবনা কমাইয়া আনা সম্ভব। ইহার একটি হইলো ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় চিহ্নিত করিয়া তাহার পাদদেশে শক্ত প্রতিরক্ষা-দেয়াল তৈরি করা যাইতে পারে। কিন্তু নিয়ম করিয়া এই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় না। এই আশু দুর্যোগের সমাধানের জন্য স্থানীয় প্রশাসনকেই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করিতে হইবে। প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ করিবার পাশাপাশি ভূমিদস্যুদের হাত হইতে পাহাড়গুলিকে রক্ষা করিতে হইবে। আর সাময়িক আশ্রয় ও বিচ্ছিন্ন উচ্ছেদ নয়, নিরাশ্রয় মানুষগুলির জন্য পুনর্বাসনের সঠিক উদ্যোগ গ্রহণ করিতে হইবে, যাহাতে তাহারা পুনরায় পাহাড়ে ফিরিয়া যাইতে বাধ্য না হয়।
