এই মহাবিশ্বে মানুষ কি একা? নাকি এইরূপ গ্রহ আছে আরও অনেক যেখানে সম্ভব প্রাণের বিকাশ? বড় কঠিন প্রশ্ন। ভিনগ্রহে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ রহিয়াছে কিনা, এই জিজ্ঞাসা অনেক পুরনো হইলেও কৌতূহল নিবারণের সবচেয়ে কার্যকর চেষ্টা শুরু হয় দুই দশক পূর্বে মহাকাশে হাবল টেলিস্কোপ স্থাপনের মাধ্যমে। এইবার আরও বিপুলাকৃতির এবং অভাবিত শক্তিশালী দুরবিন স্থাপনের উদ্যোগ লইয়াছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। নাসা দাবি করিতেছে, এই টেলিস্কোপের সাহায্যে ৩০ আলোকবর্ষ দূরের বিভিন্ন গ্রহ ও সৌরজগতের আবহাওয়ার খুঁটিনাটি তথ্য জানা সম্ভব হইবে! বর্তমানে মহাকাশ পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে বহাল ৪৪ ফুট লম্বা হাবল টেলিস্কোপের তুলনায় আকারে প্রায় চার গুণ বড় হইবে নয়া দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি। ইহার মধ্যে থাকিবে ৫২ ফিট ব্যাসের এক আয়না, যাহা মানুষের তৈরি বৃহত্তম। দানবীয় টেলিস্কোপটি কোনও মহাকাশযানে উড়াইয়া নেওয়া অসম্ভব। তাই নাসার ওরিয়ন রকেটে টেলিস্কোপের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ লইয়া মহাকাশে পাড়ি জমাইবে নভোশ্চর প্রযুক্তিবিদের দল। মহাশূন্যেই তাহাদের জুড়িয়া পূর্ণরূপ দেওয়া হইবে দুরবিন ‘অ্যাটলাস্ট’কে। ২০৩০ সালের মধ্যেই পৃথিবী হইতে দশ লক্ষ মাইল দূরে স্থাপিত এই টেলিস্কোপের সাহায্যে পাওয়া যাইবে অন্তত ৬০টি নূতন গ্রহের তথ্য। নূতন কোনো গ্রহের অনুসন্ধানে গ্রহটির আবহমণ্ডলে অক্সিজেন, মিথেন, ওজোন এবং অন্যান্য প্রাণ সঞ্চারকারী গ্যাসের অস্তিত্ব পরখ করিয়া দেখিতে পারিবে অ্যাটলাস্ট। এবং তাহার ভিত্তিতেই জানা যাইবে সেই গ্রহে প্রাণের উপস্থিতির সম্ভাবনা আছে কি নাই।
উন্নত প্রাণী হিসাবে বিশ্বজগতে অন্য প্রাণের সন্ধান তো আমরা করিবই। ইহা মানুষের চিরন্তন জ্ঞান অন্বেষণেরই স্বাভাবিক প্রবণতা। যদি মহাবিশ্বের অন্য কোথাও আমাদের মতো উন্নত প্রাণী থাকে, তবে তাহারাও নিশ্চয়ই তাহাদের প্রযুক্তির সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করিতেছে মহাবিশ্বের অন্যত্র প্রাণ অনুসন্ধানের। কয়েক বত্সর পূর্বে নাসার একটি বিশেষ অনুসন্ধান তথ্য এইখানে প্রণিধানযোগ্য। পৃথিবীর রাতের আকাশের মাত্র চারশত ভাগের এক ভাগ জায়গায় অনুসন্ধান চালাইয়া নাসার বিজ্ঞানীরা আনুমানিক সাড়ে বারো হাজার গ্রহের অস্তিত্ব আবিষ্কার করিয়াছেন। আমাদের ছায়াপথের নক্ষত্রের সংখ্যা ৩০ হাজার কোটির বেশি। সংখ্যাটা আরেকবার চিন্তা করিয়া দেখা যাক—৩০ হাজার কোটি! শুধু আমাদের ছায়াপথেই এত নক্ষত্র! অথচ এই মহাবিশ্বে প্রায় ১০ হাজার কোটি ছায়াপথ রহিয়াছে। তাহা হইলে ব্রহ্মাণ্ডের মোট গ্রহের সংখ্যা কত হইতে পারে? সেইসব লক্ষ গ্রহের মধ্যে একটিতে যদি গড়ে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ থাকে তবে এই বিশ্বে কোটি কোটি প্রাণের বসবাস উপযোগী গ্রহ রহিয়াছে নিশ্চয়ই। আরও বড় কথা হইল, গ্রহ খুঁজিয়া পাওয়া খুব সহজ কথা নহে। আমরা যদি পৃথিবী হইতে এক হাজার আলোকবর্ষ (আলোকবর্ষ হইল আলো এক বত্সরে যত দূরত্ব অতিক্রম করে, এবং আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিন লাখ কিলোমিটার) দূরে কোনো একটি স্থান হইতে খুব শক্তিশালী একটি দূরবিনের সাহায্যে গ্রহ সন্ধান করি, এবং তাহা যদি ফোকাস করি সূর্যের দিকে, তবে আমরা সূর্যের গ্রহগুলোর মধ্যে শুধু শুক্রের কথা জানিতে পারিতাম। খুব সামান্যই সম্ভাবনা ছিল পৃথিবী কিংবা অন্য গ্রহগুলোকে শনাক্ত করার। অথচ প্রাণসৃষ্টির দিক দিয়া পৃথিবী কতই না গুরুত্বপূর্ণ গ্রহ!
সুতরাং টেলিস্কোপ ‘অ্যাটলাস্ট’ যদি ৩০ আলোকবর্ষ দূরত্ব অবধি প্রাণের বসবাস উপযোগী গ্রহের সন্ধান সামান্য কিছুও পায়, তাহার বাহিরেও হিসাব থাকিয়া যাইবে। আর হিসাব যাহাই থাকুক, এই সবুজ পৃথিবীকে আমরা যেভাবে অতি দ্রুত প্রাণের বসবাসের অনুপযোগী করিয়া ফেলিতেছি, যেভাবে পৃথিবীকে অসংখ্যবার ধ্বংস করিবার মতো বোমা মওজুদ করিতেছি, তাহাতে প্রাণের বসবাস উপযোগী নূতন গ্রহ, অদূর বা দূর ভবিষ্যতে, আমাদের প্রয়োজন পড়িবেই। ‘অ্যাটলাস্ট’-এর মাধ্যমে মানুষ সেই কাজের অ-আ পাঠ আরম্ভ করিতেছে মাত্র। শুভ হোক এই উদ্যোগ।
