১৮৮০ সালে চার্লস ল্যাভেরন সর্বপ্রথম মানব শরীরে ম্যালেরিয়া জীবাণু আবিষ্কার করেন এবং Plasmodium নাম দেন। ১৮৯৮ সালে স্যার রোনাল্ড রস প্রমাণ করেন যে Anopheles নামক মশা এই মারাত্মক জীবাণুটি তাদের শরীরে বহন করে। প্রতিবছরই আফ্রিকা, এশিয়াসহ পৃথিবীর বহু দেশে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বহু মানুষ মারা যায়। Anopheles স্ত্রী-মশা ও ম্যালেরিয়া জীবাণু উভয়েরই মানুষ নামক মেরুদণ্ডী প্রাণীর একান্ত প্রয়োজন তাদের টিকে থাকার জন্য। ম্যালেরিয়া এক মারাত্মক জ্বর-রোগ, এ রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু Plasmodium-এর অধীনে ৬০টি প্রজাতি আছে, তার মধ্যে মাত্র ৪টি প্রজাতি মানব শরীরে ম্যালেরিয়া রোগ সৃষ্টি করে। এদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে মানুষের যকৃত ও লোহিত রক্তকণিকা। প্রথমে জীবাণুগুলো যকৃত আক্রমণ করে, পরে লোহিত রক্তকণিকায় প্রবেশ করে একেবারে শেষ করে দেয়।
ম্যালেরিয়া জীবাণুর প্রধান বাহকই হল মশা, যেগুলো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে কখন যে কাকে অলক্ষ্যে দংশন করে জীবাণু ছড়িয়ে দেবে, তা বুঝে ওঠাই দুষ্কর। অর্থাত্ এ প্রাণীটির কাছে আমরা কার্যত বড় অসহায়, আমরা শুধু শরীরের উন্মুক্ত স্থানে মলম লাগাতে পারি, মশারি টানিয়ে ঘুমাতে পারি, কয়েল/ধূপ জ্বালিয়ে কিংবা মশক-নিধনের ওষুধ স্প্রে করে মশা তাড়াবার প্রয়াস করতে পারি। কিন্তু এসব ব্যবস্থাই ক্ষণস্থায়ী, এতে মশককুলের তেমন একটা সমস্যা হয় না, তারা ফাঁক বুঝে ঠিকই মানব শরীরের রক্ত নিয়ে ও জীবাণু দিয়ে সরে পড়ে। আর ম্যালেরিয়া জীবাণুও তার জীবন-চক্র নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে থাকে মশা ও মানব শরীরে। ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগী যখন শনাক্ত হয়, তখন রোগীর যকৃত ও লোহিত রক্তকণিকার অনেকখানিই জীবাণুর দখলে চলে যায়। কড়া মাত্রার ওষুধ সেবনে রোগীর নিরাময় হয়তো হয়, কিন্তু ততদিনে জীবাণুবাহী মশা হয়তো আরও শত শত ম্যালেরিয়া রোগী তৈরি করে ফেলে। মশার ক্ষুদ্র আকৃতি, তাদের ত্বরিতগতিতে দংশন করার ক্ষমতা এবং চোখের পলক ফেলবার আগেই উড়ে যাবার ক্ষমতা তাদের অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে।
মশা ও ম্যালেরিয়া নিয়ে যে গবেষণা শুরু হয়েছিল ১৮৮০ সালে, তা অদ্যাবধি চলছে এবং নিরন্তর সে গবেষণার ফল হিসেবে সমপ্রতি লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের বিজ্ঞানীরা এক যুগান্তকারী আবিষ্কার করেছেন। তারা এবার টার্গেট করেছেন জীবাণুর আধারকে, জীবাণুকে নয়। অর্থাত্ তারা ভেবেছেন, যে কোন উত্সমুখ বন্ধ করতে পারলেই সেখানকার কার্যক্রমও বন্ধ করা সম্ভব অনায়াসে। তাই বিজ্ঞানীরা অনেক চিন্তা-ভাবনা করে মশাদের জীন নিয়ে গবেষণা করে বের করলেন অভিনব ও যুগান্তকারী এক পথ, যা কার্যকর হলে ম্যালেরিয়া জীবাণু তাদের প্রধান আশ্রয়স্থল মশাকে আর কাজে লাগাতে পারবে না।
ইম্পেরিয়াল কলেজের বিজ্ঞানীরা জেনেটিক মডিফিকেশনের মাধ্যমে তৈরি করলেন এমন পুরুষ মশা, যাদের শুক্রাণু স্ত্রী মশা উত্পাদনে অক্ষম। অর্থাত্ তাদের শুক্রাণুতে বিদ্যমান ক্রোমোসোম স্ত্রী মশার ডিম্বাণুর ক্রোমোসোমের সাথে মিলিত হয়ে শুধু পুরুষ মশাই উত্পন্ন করবে। আর আমরা জানি যে পুরুষ মশা মানুষের রক্ত শোষণ করতে পারে না, কারণ তাদের সে ধরনের শোষণ-উপযোগী অঙ্গাণু নেই। ইম্পেরিয়াল কলেজের ঐ তুখোড় বিজ্ঞানীরা জীনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে যে মশা উত্পাদন করেছেন সেগুলো ৯৫% পুরুষ মশা জন্ম দিতে সক্ষম। এভাবে যদি পৃথিবীব্যাপী পরিবর্তিত জীনের মশক প্রকৃতিতে ছেড়ে দেয়া যায়, তাহলে হয়তো একদিন ম্যালেরিয়া জীবাণুবাহী মশকী বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আর মানুষও ম্যালেরিয়ার ভয়াবহ প্রকোপ থেকে মুক্ত হতে পারবে।
উপরে উল্লেখিত দীর্ঘ আলোচনা থেকে একটা জিনিসই পরিষ্কার বোঝা গেল যে মশার জীনগত পরিবর্তনই এই অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছে। জীন এমনই এক বিস্ময়কর বস্তু যেগুলো জীবের যাবতীয় বৈশিষ্ট্য ধারণ করে এবং বংশপরম্পরায় তা বহন করে চিরকাল। তাই যদি বিজ্ঞানীরা এমন কিছু আবিষ্কার করতে পারতেন যার দ্বারা মানুষের মধ্যে বিদ্যমান কুপ্রবৃত্তিগুলো (লোভ-হিংসা-স্বার্থপরতা) আমূলে পাল্টে যেত, সিচন্তা ও সত্কর্মে নিয়োজিত থেকে দেশ ও দশের কল্যাণ সাধন করতো। যদি সত্যিই এমন করা যেতো, তাহলে এদেশ থেকে চোর-বদমাশ-খুনী-লম্পটের দল চিরতরে বিলুপ্ত হতো। হায় কোনদিন কি তেমন চমত্কার কিছু ঘটবে এই পৃথিবীতে অথবা এই দেশে? এদেশে আজ সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, সুদখোর, ঘুষখোর, খাদ্যে ও ফলমূলে ভেজাল মিশ্রণকারী দুর্বৃত্তদের জীনের পরিবর্তন করা যে জরুরি হয়ে পড়েছে।
লেখক: প্রভাষক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, বাউফল কলেজ, পটুয়াখালী
[email protected]
দৃষ্টি আকর্ষণ
কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও নবীন লেখকদের কাছ থেকে রাজনীতি, অর্থনীতি, দর্শন, বিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক ইস্যু, সমাজ ভাবনা, বাংলাদেশি প্রবাসীদের সংকট ও সম্ভাবনা প্রভৃতি সমসাময়িক বিষয়ে লেখা আহ্বান করা হচ্ছে। লেখাটি হতে হবে অনুর্ধ্ব ৮০০ শব্দের মধ্যে। ডাক বা কুরিয়ারযোগে লেখা পাঠানোর ক্ষেত্রে খামের ওপর লিখতে হবে ‘এক কলাম’।
লেখা পাঠানোর ঠিকানা—
দৈনিক ইত্তেফাক,
৪০ কাওরানবাজার,
ঢাকা-১২১৫।
email:[email protected]
