ইরাকের ভবিষ্যত্ প্রসঙ্গে

আপডেট : ২৭ জুন ২০১৪, ২০:৪৭
কোনদিকে যাইতেছে ইরাক? একদিকে সুন্নি উগ্রবাদী সংগঠন আইএসআইএস-এর সাম্প্রতিক সামরিক সাফল্য, অন্যদিকে দৃশ্যমান হইতেছে আইএসআইএসকে রুখিবার শপথকারী শিয়া উগ্রবাদীদিগের সামরিক সংঘাতের প্রস্তুতি গ্রহণ। অভ্যন্তরীণ এই দৃশ্যপটের সহিত যুক্ত হইয়া আছে অন্তঃধর্ম কোন্দলকারীদের বিভেদের খেলায় জড়িত থাকা আন্তর্জাতিক পক্ষগুলি। নানামুখী স্বার্থবাদিতার কোপানলে পড়িয়া দীর্ঘদিন ধরিয়া রক্তপাতে লিপ্ত জাতীয় সংহতিহীন ইরাক এইবার কোন পরিণতির দিকে ধাবিত হইতেছে? আইএসআইএস সরকারি বাহিনীগুলিকে পরাজিত করিতে-করিতে রাজধানী বাগদাদের উপকণ্ঠে পৌঁছিয়া গিয়াছে। এমতাবস্থায় আইএসআইএস-এর উপরে হামলা চালাইবার জন্য সরাসরি আমেরিকার প্রতি আহ্বান জানাইয়া প্রত্যাখ্যাত হইয়াছেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী নূরি আল মালিকী। আমেরিকার এতদিনে মনে পড়িয়াছে যে, মালিকী কথা রাখেন নাই! মালিকীকে যখন পশ্চিমারা প্রধানমন্ত্রীর পদে বসান তখন কথা ছিল যে, তিনি শিয়া, সুন্নি, কুর্দি তথা সকলকে লইয়া জাতীয় সংহতির রাস্তায় হাঁটিবেন। কিন্তু পশ্চিমাদের একেবারে চক্ষের সম্মুখে থাকিয়াও এই পথে হাঁটেন নাই মালিকী। এখন তাঁহাকে আচমকা দায়ী করিলে চলিবে কেন? তাঁহার প্রয়োজন ফুরাইয়া আসিল কি? অন্যদিকে, আইএসআইএস-এর বিরুদ্ধে লড়িবার জন্য প্রস্তুতি লইতেছে মুক্তাদার আল সদরের মত শিয়া ধর্মগুরু ও মাহদি আর্মির মত শিয়া সংগঠনগুলি। এই অবস্থা চলিতে থাকিলে আরও ভয়াবহ রক্তপাত শুরু হইয়া যাইবে যেকোন দিন। যুক্তরাষ্ট্র আইএসআইএস ও মালিকী সরকার উভয়কেই উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য দায়ী করিতেছে। পরোক্ষভাবে মালিকীকে হটাইবার জন্য ইরাকের জনগণের প্রতি আহবানও জানানো হইয়া গিয়াছে যুক্তরাষ্ট্রের তরফ হইতে। আবার আইএসআইএসকে ইরাকের অস্তিত্বের জন্য হুমকি বলিয়াও চিহ্নিত করিতেছে দেশটি। কিন্তু ঘনায়মান সঙ্কট নিরসনে কি করা হইতেছে তাহা স্পষ্ট নহে। মালিকীকে সরিতে বলা হইতেছে। মালিকী কি তাহা করিবেন? আর মালিকী সরিয়া গেলেই কি আইএসআইএস তত্পরতা বন্ধ করিবে? ইহা স্পষ্ট যে, আইএসআইএস সামরিক উপায়ে সরকার পতন চাহিতেছে। ইরানের প্রভাবকে পাশ কাটাইয়া সাদ্দাম আমলের ন্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়াদের সরাইয়া রাখিয়া সংখ্যালঘিষ্ঠ সুন্নিদের সরকার গঠন করিতে পারিবে কি আইএসআইএস? ইরাককে রক্ষা করিতে হইলে এইসব বিষয়ের ফয়সালা দ্রুত হওয়া আবশ্যক। কিন্তু প্রধান-শক্তিমান যুক্তরাষ্ট্রকে এই ক্ষেত্রে খুব একটা উদ্যোগী মনে হইতেছে না। এইদিকে সৌদি আরবসহ অপরাপর সুন্নি রাজতান্ত্রিক দেশগুলিতে শাসক ও জনগণের মধ্যে ইরাক প্রসঙ্গে মতভেদ স্পষ্ট হইতেছে অধুনা। উদাহরণস্বরূপ, ইরাকী কর্তৃপক্ষ অভিযোগের আঙুল উঁচাইলেও আইএসআইএসকে পৃষ্ঠপোষকতাদানের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করিয়াছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। আবার ইহাও সত্য যে, আইএসআইএস সদস্যদের মধ্যে সৌদি নাগরিকের সংখ্যাই সর্বাধিক। উল্টাদিকে, আরেক প্রভাবশালী দেশ ইরান অবস্থান লইয়াছে মালিকীর সরকারের পক্ষে। কি বিচিত্র রাজনীতি! অথচ এই মালিকীকেই কিনা ক্ষমতায় বসাইয়াছে আমেরিকা! ২০০৩ সালে আগ্রাসনের পর হইতে ইরাকে প্রাণহানি হইয়াছে কম-বেশি পাঁচ লক্ষ মানুষের; আহত হইয়াছে বেশুমার। নূতনরূপে শিয়া-সুন্নি বিভেদজনিত সংঘাত শুরু হইয়া গেলে লাশের সংখ্যা এইবার কোথায় যাইয়া ঠেকিবে তাহা কে বলিতে পারে? রাজনীতির মধ্যে প্রকৃত রাজনীতি না থাকিলে কি হয় তাহার ভয়াবহ এক নজীর ইরাক। ইরাকের বিদ্যমান পরিস্থিতির জন্য কেবলমাত্র সাম্রাজ্যবাদকে দায়ী করিয়া পার পাওয়া যাইবে কী? একই ধর্মের ভিতরকার দুইটি ধারা যেইভাবে পরস্পরকে নির্মূল করিতে চাহিতেছে তাহা ব্যাখ্যা না করিয়া কেবলই বাহিরের শত্রুকে চিহ্নিত করিয়া জীবনখানি বাঁচাইয়া রাখিবার নিশ্চয়তাও যে ইরাকীরা নিশ্চিত করিতে পারিতেছে না তাহাতো দেখাই যাইতেছে অনেকদিন ধরিয়া।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন