ম্যালেরিয়া বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ১৩টি জেলার ৭১টি উপজেলায় ম্যালেরিয়া রোগের প্রদুর্ভাব বেশি। ম্যালেরিয়া প্রবণ অঞ্চলগুলো হচ্ছে- রাঙ্গামাটি, বান্দরবন, খাগড়াছড়ি (তিন পার্বত্য জেলা)। এছাড়া চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, শেরপুর এবং কুড়িগ্রাম জেলা। এই সমস্ত জেলায় ম্যালেরিয়াজনিত অসুস্থতার প্রবণতা যেমন বেশি তেমনি ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুর হারও বেশি। ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে সারাবিশ্বের মত বাংলাদেশ সরকারও প্রতিবছরই বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে।
ম্যালেরিয়া প্রধানত এক প্রকার পরজীবী জীবাণু (প্লাজমোডিয়াম) দ্বারা সংঘটিত সংক্রামক রোগ, যা বিশেষ ধরনের জ্বরের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। ম্যালেরিয়ার জীবাণুবাহক মশা হচ্ছে এনোফিলিস জাতীয় স্ত্রী মশা। বাংলাদেশে মূলত প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম এবং প্লাজমোডিয়াম ভাইভেক্স দ্বারা ম্যালেরিয়া হয়ে থাকে। তবে প্লাজমোডিয়াম ভাইভেক্স-এর মাধ্যমে মাত্র ৪% লোক আক্রান্ত হয়ে থাকে। প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরামে আক্রান্ত হয় ৯৬%। ফ্যালসিপেরাম জীবাণুটাই হচ্ছে ভয়াবহ।
ম্যালেরিয়ায় উচ্চ প্রকোপ অঞ্চলে বিশেষত্ব পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত ৫ বছর বয়সের নিচে শিশুরা আক্রান্ত হয়। এছাড়া গর্ভবতী মহিলারাও আক্রান্ত হয়। বিশ্বের সার্বিক ম্যালেরিয়া পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিশ্বের ১০৯টি দেশে ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন জনগোষ্ঠী ম্যালেরিয়া রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিশ্বের ম্যালেরিয়াজনিত অধিকাংশ মৃত্যু সংঘটিত হয় আফ্রিকার সাব-সাহারান দেশগুলোতে ও এশিয়ার কয়েকটি দেশে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০১২ সালে ম্যালেরিয়াজনিত কারণে প্রায় বিশ দশমিক সাত কোটি লোক আক্রান্ত ও ছয় দশমিক দুই লক্ষ লোক মৃত্যুবরণ করেন।
ম্যালেরিয়া প্রবণ ১৩টি জেলার মধ্যে ২০০৭ সাল থেকে ২০১৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এক জরিপ রিপোর্টে জানা গেছে, (জরিপকারী প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য বিভাগ ও ব্র্যাক) ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত মোট রোগী সংখ্যা ছিল ২৮৪৫ জন। মৃত্যুর সংখ্যা ১৮ জন। শুধু ২০১২ সালে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে কোনো লোক মারা যায়নি। তবে ২০০৭ সালে ৮ জন এবং ২০০৯ সালে ৬ জন মারা গিয়েছিল।
বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের লক্ষ্যমাত্রা ও উদ্দেশ্যেসমূহ হচ্ছে ২০১৫ সালের মধ্যে ১৩টি ম্যালেরিয়া প্রবণ জেলার বসবাসরত জনগোষ্ঠীর (এক কোটি নয় লক্ষ) মধ্যে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার শতকরা ৬০% কমিয়ে আনা। পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩টি জেলার শতভাগ পরিবারকে এবং বাকি ১০টি জেলার ৮০ ভাগ পরিবারকে কীটনাশক যুক্ত মশারি ব্যবহারের আওতায় আনা এবং এর ব্যবহার অব্যাহত রাখা। ১৩টি ম্যালেরিয়া প্রবণ জেলায় ম্যালেরিয়া আক্রান্ত ৯০ ভাগ রোগীকে দ্রুত ও মানসম্পন্ন উন্নত পদ্ধতিতে রোগ নিরূপণ এবং কার্যকর চিকিত্সা প্রদান। স্থানীয় জনগোষ্ঠী, স্থানীয় সংগঠন ও সহযোগী সংস্থাসমূহের মধ্যে সমন্বয় ও অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করা। সরকারের ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের সাথে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক-এর নেতৃত্বে ২১টি সংগঠনের একটি কনসোর্টিয়াম যৌথ অংশীদারিত্বের মাধ্যমে কাজ করছে বলে জানা গেছে। সংগঠনগুলো হচ্ছে ব্র্যাক, মমতা, মুক্তি, স্কাস, বন্ধন, সীমান্তিক, ভার্ড, হিতোষি, ঘরনি, সাজেদা ফাউন্ডেশন, পিআরডিএস, সচেতন সাহায্য সংস্থা, আইএসিআইবি, একলাব, হীড-বাংলাদেশ, র্যাসডো, এনজেড একতা মহিলা সমিতি, বিডিএসসি, ইপসা, এফআইভিডিবি, নারী উন্নয়ন শক্তি।
ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতার অংশ হিসাবে মিডিয়ার ভূমিকা অপরিসীম। যেমন গণবিজ্ঞপ্তি, গণনাটক, লোকসংগীত, পোস্টার, লিফলেট বিতরণ ইত্যাদি। তাই ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।
লেখক :মিডিয়া কর্মী
