বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার শিক্ষার্থী সংখ্যা গত ৬ বছরে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। বর্তমানে উচ্চশিক্ষার শিক্ষার্থী সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ, কেবল চীন, ভারত ও ইন্দোনেশিয়া বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। এটি আমাদের জন্য সুখকর খবর হতে পারতো যদি আমরা উচ্চশিক্ষিত গ্রাজুয়েটদেরকে যোগ্য কাজে লাগাতে পারতাম এবং তারা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারতো। কিন্তু উচ্চশিক্ষা শেষ করে প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী চাকরি পাচ্ছে না। পড়ালেখা শেষ করে বেকার থাকার চেয়ে অমানবিক আর কী হতে পারে? আবার যারা চাকরি পাচ্ছেন, তাদের মধ্যে অনেকে ছদ্ম বেকার অর্থাত্ তারা তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছেন না। ভাল চাকরি না পেয়ে যেনতেন একটি চাকরি চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
গত ৬ বছরে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি কেন বৃদ্ধি পেল? এর কি কোন যৌক্তিক কারণ আছে? কোন গবেষণা কি করা হয়েছে? আমাদের কি এত গ্রাজুয়েটদের চাকরি দেয়ার সুযোগ আছে? তারা কি অন্য দিকে পড়ালেখা করলে বা প্রশিক্ষণ নিলে সহজে কাজে যোগ দিতে পারতো না? উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থী সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বাড়বে এতে কোন সমস্যা থাকার কথা নয়। আমাদের মত জনবহুল দেশে এটা আরোও সত্যি। কিন্তু এ রকম হুজুগে বৃদ্ধি যুক্তিযুক্ত হতে পারে না। ১৯৯০ সালে থাইল্যান্ডের জমতিয়েনে অনুষ্ঠিত ইএফএ (এডুকেশন ফর অল-সবার জন্য শিক্ষা) বৈশ্বিক কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রাথমিক ও মৌলিক শিক্ষার প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয় যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসেবে উচ্চশিক্ষার প্রতি অবহেলা তৈরি হয়। দাতা গোষ্ঠী উচ্চশিক্ষার জন্য সহায়তা কমিয়ে দেয়, অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ শিক্ষার ফান্ড প্রাথমিক শিক্ষায় সরিয়ে নেয়া হয়। এর কারণ উন্নয়নশীল অনেক দেশের নেতৃবৃন্দ বুঝতে পারেননি, সম্ভবত এখনও বোঝেন না। একদিকে উচ্চশিক্ষার ফান্ড কমিয়ে দেয়া এবং অপর দিকে সবার জন্য শিক্ষা এজেন্ডা বাস্তবায়নের মাধ্যমে অনেক শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। আমরা জানি, সাগরে পানি বেড়ে গেলে নদী এবং খালে-বিলে পানি বাড়বেই। সে কারণে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থী সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার অবশ্যম্ভাবী প্রভাব হিসেবে মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীসংখ্যা বিশাল সংখ্যায় বেড়ে গেছে। আগেই বলেছি, প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থী বাড়ানোর সূচনাতেই উচ্চশিক্ষা অবহেলিত হয়ে পড়েছে। সবার জন্য শিক্ষা শ্লোগানে আকৃষ্ট হয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশামতোই মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে ভিড় করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায়। আর তাদেরকে উদারভাবে স্বাগত জানিয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। সবার জন্য শিক্ষা আন্দোলন শুরু হওয়ার পরপরই দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চালু করা হয়েছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও আসনসংখ্যা বাড়ানো হয়েছে, নতুন নতুন কোর্স খোলা হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির একটি স্রোত তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু উচ্চশিক্ষার মানের দিকে নজর দেয়া হয়নি এবং কর্মক্ষেত্র তৈরির জন্যও উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
অনেকেই এ কথাটা ভুলে যান যে, উচ্চশিক্ষার মানের উপর নির্ভর করে শিক্ষার অন্য স্তর, যেমন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের মান। কারণ শিক্ষার অন্য স্তরগুলো উচ্চশিক্ষিত গ্রাজুয়েটদের দ্বারাই পরিচালিত হয়ে থাকে। মাধ্যমিক শিক্ষার মান কমে যাওয়ার কারণে হাজার হাজার শিক্ষার্থী গোল্ডেন ৫ পাওয়ার পরও প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে না। একদিকে উচ্চশিক্ষার বরাদ্দ কমে যাওয়া এবং অন্য দিকে ব্যাপক সংখ্যক শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষায় ভর্তি করানোর কারণে সংগত কারণেই শিক্ষার মান সন্তোষজনক রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এ এক অদ্ভুত ও জটিল সমস্যা।
চরম বেকারত্বের এই সময়েও অনেক প্রতিষ্ঠান যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করছেন। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, আমাদের বেশিরভাগ উচ্চশিক্ষিত গ্রাজুয়েটদের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত মান ও যোগ্যতা পাওয়া যাচ্ছে না। চাকরির লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় বেশিরভাগ প্রার্থীই সন্তোষজনক পারদর্শিতা দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছেন। উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে বিতর্ক অনেক দিনের। ইউজিসি বার্ষিক প্রতিবেদনে এ সম্পর্কে চমত্কার আলোচনা করা হয়েছে। উচ্চশিক্ষার কারিকুলাম নিয়ে অসন্তুষ্টি রয়েছে অনেক আগে থেকেই। বিশেষ করে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামে চাকরির বাজারের প্রয়োজনীয় যোগ্যতাগুলোকে বিবেচনা করা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাজার চাহিদাকে অত্যধিক গুরুত্ব দিতে গিয়ে উচ্চশিক্ষার মূল লক্ষ্য হারিয়ে ফেলছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সুযোগ একেবারেই সীমিত এবং এ সব বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।
লেখক: শিক্ষা ও উন্নয়ন গবেষক। আহবায়ক, আইইআর এলামনাই এসোসিয়েশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় । ইমেইলঃ shahjamal22¦yahoo.com
