২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের বাজেট :একটি পর্যালোচনা

আপডেট : ২৮ জুন ২০১৪, ২১:২১
স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের প্রথম বাজেটের সাইজ ছিল ৭০০ কোটি +(অনুন্নয়ন + উন্নয়ন) মিলে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা ২৫০,৫০৬ কোটির প্রস্তাবে নেতিবাচক মন্ত৬ব্য ও সমালোচকের দৃষ্টিতে অবাস্তব, কল্পনাপ্রসূত, উচ্চাভিলাষী ও অনুমান ভিত্তিক দুর্বল কল্পনার কথামালা হিসাবে ব্যাখা করার চেষ্টা করেছেন। পত্র-পত্রিকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বাজেট বিষয়ক আংশিক মন্তব্য দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে প্রতিবারই বিভ্রান্ত করছে। গঠনমূলক না লিখে রাজনৈতিক ক্ষীণ স্বার্থ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সমালোচনা আমাদের যুব সমাজকে বিভ্রান্ত করছে। তোতা পাখির মত আমাদের কিছু অর্থনীতিবিদ বলেছেন দেশ বিনিয়োগশূন্য। সংবাদ শুনে যুবসমাজ হতাশ। আবার UNCTAD রিপোর্ট করছে, রাজনৈতিক হানাহানির মধ্যেও বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ২৪% এর অধিক। তাহলে কি দাঁড়ায়। তবে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হলে BoI কে East India Company কোম্পানির দুর্নীতিবাজ কেরানীমুক্ত করতে হবে। BoI দুর্নীতিবাজ আমলাদের আখড়ায় রূপান্তরিত হয়েছে। বাংলাদেশের অন্য ক্ষেত্রের বড় দুর্নীতিবাজরাও এদের ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকেও East India Company কেরানীমুক্ত এবং দুর্নীতিবাজ মুক্ত করা দরকার। উন্নয়ন-অনুন্নয়ন বাজেট মিলে ২৫০,৫০৬ কোটি টাকার মধ্যে অনুন্নয়ন বাজেটের পরিমাণ ১৬৮,৬৯৯ কোটি যা মোট বাজেটের ৬৭.৩৪% এবং মূলধনী বাজেটের পরিমাণ ৮১,৮০৭ কোটি যা মূল বাজেটের ৩২.৬৫%। আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করা উচিত একটি সরকারের বাত্সরিক বাজেট বরাদ্দের রেভিনিউ এবং মূলধন বাজেটের বর্তমান হার ৬৭.৩৪% এবং ৩২.৬৬%। ইহা বাস্তবসম্মত বা best practice কি-না? এই হার কাঙ্ক্ষিত জিডিপি অর্জনের জন্য সঠিক পরিমাপ কি-না? রেভিনিউ ব্যয়ের এ বিশাল আকার কমিয়ে অবকাঠামো বৃদ্ধির লক্ষ্যে মূলধনী ব্যয় বৃদ্ধি করে জিডিপি বৃদ্ধি করা সম্ভব বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। রেভিনিউ আয়ের সাথে সাথে যদি রেভিনিউ ব্যয় বৃদ্ধি করা হয় তাতে মূলধনী খরচ বৃদ্ধির সুযোগ সীমিত হয়। ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির সুযোগও সীমিত হয়ে যায়। অনেকের দাবি বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়নে প্রথমে খরচ বৃদ্ধি পরে আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্র চিন্তা করা হয়। যদি এমন করা যেত প্রথমে আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এগুলো নির্ণয় করে খরচ কমানোর ক্ষেত্র নির্ণয় করে আয় নির্ধারণ করা হতো। বিভিন্নভাবে দাবি করা হচ্ছে আয়ের অনেক উত্স সরকারি রাজস্ব বোর্ডের নিয়ন্ত্রণের বাইরে অথবা অজানা। ইহা রাজস্ব বোর্ডকে নির্ণয় করতে হবে এবং প্রতি বছর তাদের নতুন টার্গেট থাকা দরকার। এভাবে সংশ্লিষ্ট বিভাগ চলতি বাজেটের ডিসেম্বরের মধ্যে স্থির করতে পারে। একইভাবে সরকারের পরিচালনা খরচ কমানোর বিষয়েও সিদ্ধান্ত করে টাকার পরিমাণ টার্গেট করা দরকার। অর্থাত্ আয় বৃদ্ধি এবং রেভিনিউ ব্যয় কমিয়ে revenue surplus বৃদ্ধি করতে হবে। অর্থাত্ বর্তমান প্রস্তাবিত বাজেটে ২৫০,৫০৬ কোটি টাকা হতে revenue expenditure ১৬৮,৬৯৯ কোটি টাকা খরচ যদি ৫% কমানো হয় ৮৪০০ কোটি টাকা কমবে এই টাকা Capital Budget খরচ করলে আনুপাতিক হারে অভ্যন্তরীণ অথবা বিদেশি ঋণের সুদ কমবে। যদি ১০% কমানো যায় তবে ১৬৮০০ কোটি টাকা খরচ কমবে এবং আনুপাতিক হারে ঋণের সুদ কমবে। বর্তমান বাজেটে রেভিনিউ খরচ ১৬৮,৬৯৯ কোটি টাকার জনপ্রশাসন খাত ১৫.৭% এবং পেনশন ৫%, জনশৃংখলা ৫.৯%, প্রতিরক্ষা ৮.৫% এবং সুদ পরিশোধ ১৮.৪% এবং বিবিধ ৮% মিলে ৬১.৫% সরকারের প্রশাসনিক ব্যয় যা যে কোনো মাপকাঠিতে এ প্রশাসনিক ব্যয়ের হার গ্রহণযোগ্য নহে। এই উচ্চ হার কমানো দরকার। প্রয়োজন revenue surplus বৃদ্ধি করার। বলা হয়, ১০% ঘুষ দুর্নীতি কমলে ২০% revenue বৃদ্ধি পাবে। এ ভূমিকা নিতে হবে রাজস্ব বোর্ড এবং অর্থ মন্ত্রণালয়কে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায় (Gwartney et al 1998) OECD দেশসমূহে সরকারের খরচের আকার কমানোর প্রবণতা দেখা যায়। আয়ারল্যান্ডের ১৯৬০ সালে ৫২.৩% থেকে কমে ১৯৮৬-১৯৯৬ সালে ৩৭.৭% দাঁড়ায়। একই গবেষণা তথ্যে দেখা যায়, নিউজিল্যান্ডের সরকারি ব্যয় জিডিপি ৩৪.১ থেকে ৪৮.৪% এ উন্নীত হয় ১৯৭৪-১৯৯২ সাল পর্যন্ত ঐ সময় গড় জিডিপি বৃদ্ধি ছিল ১.২% ভাগ। একই দেশে ১৯৯২-১৯৯৬ সময়ে সরকারি খরচ কমিয়ে জিডিপি’র ৪৮.৪% থেকে ৪২.৩% তাতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১.২ থেকে ৩.৯% শতাংশে উন্নীত হয়। যুক্তরাজ্যে সরকারি খরচ ১৯৬০ সালে জিডিপি’র ৩২.২% থেকে ১৯৮২ সালে ৪৭.২% উন্নীত হয়। তখন যুক্তরাজ্যেও জিডিপি বৃদ্ধিও হার ছিল ২.২%। ১৯৮২-১৯৮৯ সালে সরকারি খরচ কমানোর উদ্যোগ নিয়ে জিডিপি’র ৪০.৭% আনা হয় এবং দেশের জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি ৩.৭% উন্নীত হয়। একই গবেষণায় দেখা যায়, দক্ষিণ কোরিয়া তাদের মোট সরকারি খরচের মধ্যে মূলধনী/বিনিয়োগ খরচ রেভিনিউ খরচের তুলনায় বেশি। দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি রেভিনিউ খরচ জিডিপি’র ১০-১৫% এর মধ্যে ধরে রেখেছে। তাইওয়ানের সরকারি খরচ জিডিপি’র ২১.৫%-৩০.১% এখনো World average এর নিচে অবস্থান করছে। থাইল্যান্ডের সরকারি খরচ জিডিপি’র ২০% এর নিচে একই ধারা বজায় রেখেছে সিঙ্গাপুর এবং হংকং-এর মত উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধির দেশ। GDP Growth maximizing সরকাউর খরচের সন্ধানে আমাদের কি করা দরকার। এ প্রশ্নের উত্তরের সন্ধানে দেখা যায়, Economic Growth maximiser সরকাউর খরচ এবং কেবিনেটের আকার বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। সরকারের কতগুলো মৌলিক কাজ যেগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়নের সহায়ক যেমন Protecting Property rights and creating an environment conductive to economic growth | অর্থনীতির এই মূল কাজের বাইরে গিয়ে সরকারের আকার বৃদ্ধি করলে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে। কারণ হিসাবে disincentive effects of taxes, সরকার প্রাইভেট সেক্টরের উত্পাদন ব্যবস্থার সাথে প্রতিযোগিতায় নামবে, সরকার ঋণ গ্রহণ করে প্রাইভেট সেক্টর ঋণ সুবিধা সংকুচিত করবে জিডিপি কমবে, rent seeking বাড়বে প্রাইভেট সেক্টর বিনিয়োগ কমবে। বাংলাদেশের বাজেট প্রণেতারা উপরোক্ত বিষয় বিবেচনায় রেখে বর্তমান বাজেট ক্যাপিট্যাল এবং রেভিনিউ খরচের অনুপাত নির্ধারণ করা উচিত এবং সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলীয় এমপি মহোদয়গণ বিবেচনায় নিবেন অথবা আগামী বাজেটের চিন্তার খোরাক হিসাবে বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হলো। উপনিবেশিক আমলের কর আইনের ধারায় বর্ণিত discretionary power সম্বলিত কর কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা গণতান্ত্রিক ধারার পরিপন্থী এবং ঘুষ দুর্নীতির কালোহাত হিসাবে চিহ্নিত। এসব ধারা বাতিল করার জোরদাবি। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন প্রতি স্তরে Financial Reporting and disclosure নিশ্চিতকরণ। Financial Reporting নিশ্চিতকরণের জন্য প্রয়োজন সংবিধান স্বীকৃত এবং Rules of Business এ বর্ণিত প্রতিটি মন্ত্রণালয় এবং সংস্থার বাধ্যতামূলক Financial Statement প্রস্তুত করে তা রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নেয়া। এ কাজ দীর্ঘ ৪২ বছরেও প্রতিপালন করা হচ্ছে না বলে অনেকের দাবি। সরকারের প্রতিটি বিভাগ ও মন্ত্রণালয় আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করে তা consolidate করে মন্ত্রণালয়ের Financial Statement তৈয়ার করবে এবং সব মন্ত্রণালয়ের Financial Consolidate করে কেন্দ্রীয় সরকারের Financial Statement প্রস্তুত করে সকল মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত Standing committee এর vetting এর মাধ্যমে মাননীয় রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য প্রেরণ করা যেতে পারে। এতে সুশাসন নিশ্চিতকরণের পথ সুগম হবে। লেখক: এফসিএ, সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন