স্বাগত পবিত্র মাহে রমজান

আপডেট : ২৯ জুন ২০১৪, ২২:১০
আজ পবিত্র মাহে রমজানের প্রথম দিন। বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ গত রাত্রে তারাবিহ্ আদায় করিয়াছেন ও সেহির খাইয়া রোজা রাখিয়াছেন। এইভাবে এই বত্সরও রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস রমজানের শুভ যাত্রা শুরু হইয়াছে। এই পবিত্র মাস আসিলেই মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশে এক অভূতপূর্ব সাড়া পড়িয়া যায়। সর্বত্র পাক-পবিত্রতা ও ধর্মীয় ভাব গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশ ধারণ করিয়া থাকে। ধর্মপ্রাণ মানুষের আবেগ ও উচ্ছ্বাস বৃদ্ধি পায় যেকোন সময়ের তুলনায়। বিশেষত ইফতার, তারাবিহ্ (কিয়ামে রমজান) ও সেহিরর সময় পুণ্যবান মানুষের কোলাহলে চারিদিক মুখরিত হয়। আল্লাহ তায়ালা কুরআন শরীফে বলিয়াছেন, ফামান শাহিদা মিনকুমুশ শাহরা ফালইয়াসুমহু অর্থাত্ তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি রমজান মাসে উপস্থিত থাকিবে, তাহার জন্যই রোজা ফরজ বা অবশ্য পালনীয় (০২:১৮৫)। তবে যাহারা খুবই অসুস্থ ও মুসাফির তাহাদের জন্য কিছুটা শিথিলযোগ্য। তাহারা অন্য সময়ে রোজা রাখিতে পারিবেন বা বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন। কেননা ইসলামের বিধি-বিধানগুলিতে কোন জটিলতা নাই, বরং আছে সহজীকরণের ব্যবস্থা। কাজেই রোজা রাখিবার ব্যাপারে মুসলমানদের আর কোন অজুহাতই চলে না। সিয়াম সাধনা বা রোজা পালনের মুখ্য উদ্দেশ্য হইল—তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন। সুরা বাকারার ১৮৩ নং আয়াতে এই উদ্দেশ্যের কথা উল্লেখিত হইয়াছে। মহান আল্লাহর প্রতি প্রীতি বা ভালবাসা না জন্মিলে এই গুণ অর্জন করা সম্ভব নহে। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে রোজার আলাদা একটি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। সারাদিন পানাহার ও জৈবিক চাহিদা হইতে বিরত থাকিতে হয় বলিয়া ইহাতে লোক দেখানোর অবকাশ কম। নামাজ, হজ্ব ও যাকাতের ক্ষেত্রে লোক দেখানো উদ্দেশ্য থাকিতে পারে। এমনকি, ঈমানের বেলায়ও কপটতা লুক্কায়িত থাকিতে পারে। কিন্তু রোজার ক্ষেত্রে ইহা অসম্ভব। তাই বলা হইয়াছে, আসসওমু লী ওয়া আনা আজজু বিহি অর্থাত্ আল্লাহ পাক বলিতেছেন, রোজা কেবল আমার সন্তুষ্টির জন্যই রাখা হয়। তাই ইহার পুরস্কারও আমি নিজ হাতে দেব। তাহাছাড়া বিশ্বমানবতার আলোকবর্তিকা ‘কুরআনুল কারীম’ নাজিলের মাস রমজানের গুরুত্ব সর্বাধিক। অন্যান্য আসমানি কিতাবও এই মাসে অবতীর্ণ হইয়াছে। একজন রোজাদার কখনও পাপাচারে লিপ্ত হইতে পারেন না, মিথ্যা ও অশ্লীল কথা বলিতে পারেন না, কাহারও সহিত ঝগড়া-ঝাটি করিতে পারেন না ইত্যাদি। এইজন্য হাদীসে সিয়ামকে অন্যায়-অপকর্ম হইতে আত্মরক্ষার ঢাল হিসাবে অভিহিত করা হইয়াছে। এই প্রসঙ্গে রাসূল আকরাম (স.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রমজান মাসে ঈমানের সহিত ও সওয়াবের আশায় রোজা রাখে, তাহার অতীত গুনাহ-খাতা মাফ হইয়া যায়। সে শিশুর মত মাসুম বা নিষ্পাপ ব্যক্তিতে পরিণত হয়।’ প্রকৃতপক্ষে সিয়াম সাধনা হইতেছে একটি বিশেষ ট্রেনিং বা প্রশিক্ষণ। ইহার মাধ্যমে রোজাদারের জীবন-যাপন সুশৃঙ্খলিত হয় ও বাকি মাসগুলিও আল্লাহর পথে চলিবার জন্য সহায়ক হয়। এই মাসের কঠোর পরিশ্রম ও কৃচ্ছ্রতা সাধনের দ্বারা একজন মুসলিম ব্যক্তিগত জীবনেও সাফল্য অর্জন করেন। তাহাছাড়া রোজার চিকিত্সাগত তাত্পর্যও সীমাহীন। আমাদের দেহের বেশিরভাগ রোগ সৃষ্টির কারণ প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ। এক সমীক্ষায় দেখা গিয়াছে যে, গৃহীত খাদ্যের শতকরা ২৫ ভাগ বা তাহারও অধিক অপ্রয়োজনীয়। তাই রোজার সময় পরিপাকতন্ত্র যে অবসরটুকু পায় তাহাতে দেহের অপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের সারাংশ ও সঞ্চিত বিষাক্ত রস নিঃশেষ হইয়া যায়। দেহের বাড়তি ওজন, রস, চর্বি ইত্যাদি হ্রাস পায়। ক্ষুধামন্দা, পেটফাঁপা, টক ঢেঁকুর, লিভারের দুর্বলতা প্রভৃতি রোগের নিরাময় হয়। এইজন্য জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, স্পেন, হল্যান্ড প্রভৃতি দেশে চিকিত্সা ব্যবস্থাপত্রে প্রতিবিধান হিসাবে উপবাসের উল্লেখ করা হয় বলিয়া জানা যায়। রোজা যদিও উপবাস নহে, তথাপি রোজাদারগণ সাধারণত:এইরকম শারীরিক উপকার হইতে বঞ্চিত হন না। রমজান মাসের যেকোন ইবাদত-বন্দেগীতে অন্য মাসের চাইতে সওয়াব বেশি হয়। অতএব, এই একটি মাসে বেশি বেশি নেক আমল করা বাঞ্ছনীয়। রমজান উপলক্ষে কুরআন তেলাওয়াত ও ইহার মর্ম উপলব্ধিতে সময় দেওয়া প্রয়োজন। দ্বীনি দাওয়াতের কাজে আঞ্জাম দেওয়াও একান্ত কর্তব্য। অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, বেপর্দা ইত্যাদি সবসময়ই পরিত্যাগ করা কাম্য। তবে এই মাসে ইহা আরও প্রত্যাশিত। এই মাসে দিনের বেলা প্রকাশ্যে পানাহার বেমানান ও দৃষ্টিকটু। দেখা যায়, রমজান মাস আসিলেই রাজধানী ঢাকা শহরসহ বিভিন্ন নগর-মহানগরগুলিতে অধিক যানজট, দেশ জুড়িয়া লাগামহীন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, লোডশেডিং, যাকাতের কাপড় বিতরণ নিয়া হতাহত ইত্যাদি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিয়া থাকে। এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সবাইকে এইবারও সতর্ক হইতে হইবে। সর্বোপরি এতিম-অসহায় ও দুস্থ লোকদের সহায়তায় সকলকে আগাইয়া আসিতে হইবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সহিহ্ সালামতে পূর্ণ এক মাস সিয়াম পালনের তওফিক দিন, এই দোয়াই করি আজিকার দিনে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন