ব্রাম স্টোকারের ‘ড্রাকুলা’ উপন্যাসটি অভাবিত জনপ্রিয় হইয়াছিল রক্তখেকো মনুষ্যরূপধারী ড্রাকুলার জন্য। সেই রক্তখেকো তাহার শ্বদন্ত দিয়া মানুষের গলা কামড় দিয়া ধরিয়া রক্ত খাইত। উরুগুয়ে ফুটবল দলের তারকা স্ট্রাইকার লুইস সুয়ারেজ ‘ড্রাকুলা’র অনুরাগী কিনা বলা মুশকিল, কিন্তু তিনি কাল্পনিক ড্রাকুলার বাস্তবিক ড্রেস রিহার্সেল করিয়াছেন এইবারে বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতার গ্রুপপর্বে। উরুগুয়ে ও ইতালির মধ্যকার সেই খেলা চলিবার সময় সুয়ারেজ কামড়ের কাণ্ডটি ঘটাইয়াছেন উপস্থিত লাখ দর্শক ও সারা বিশ্বের সরাসরি খেলা দেখা শত কোটি দর্শকের সামনে। ইতালির জর্জো কিয়েলিনিকে কামড়াইয়া দেওয়ার ‘অপরাধে’ ফিফা গত বৃহস্পতিবার সুয়ারেজকে ফুটবল হইতে নিষিদ্ধ করিয়াছে চার মাসের জন্য। এতদিন ফুটবল খেলায় ল্যাং মারামারি চলিত আকছার, ঘুষাঘুষিও চলিয়াছে লুকিয়ে চুরিয়ে। কনুইয়ের খোঁচা মারিয়া প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করা তো অতি সাধারণ দৃশ্য। কিন্তু কামড়ে দেওয়ার ঘটনার কথা কে শুনিয়াছে কবে? হ্যাঁ, শোনা গিয়াছে বটে। সেইসব ঘটনার খলনায়কও এই সুয়ারেজ। প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে কামড়াইবার অপরাধে অতীতে আরও অন্তত দুইবার তিনি পড়িয়াছেন শাস্তির মুখে।
ফুটবলের বাহিরে বক্সিং-এর মাইক টাইসনও ‘কামড়াইতেন’ বলিয়া অভিযোগ আছে বিস্তর। কিন্তু সেটা তো বক্সিং। ফুটবল খেলার সহিত তাহার মূলগত পার্থক্য বিপুল। তবে কেন সুয়ারেজ বার বার নিজের রেকর্ড নিজেই ভঙ্গ করিতেছেন? যেই মনস্তত্ত্ব হইতে উত্সারিত হইতেছে এমন হঠকারী মানসিকতা, তাহা বিশ্লেষণ করিতে গিয়া বিশ্বের মনস্তত্ত্ববিদরা অঙ্গুলি নির্দেশ করিতেছেন সুয়ারেজের দারিদ্র্যপীড়িত শৈশবকে। মন্টেভিডিওর এক গরিব ঘরে জন্ম সুয়ারেজের। সাত ভাইয়ের মধ্যে চতুর্থ সুয়ারেজের ছেলেবেলা কাটিয়াছে নিদারুণ কষ্টে। কোনোদিন খাবার পাইয়াছেন, কোনোদিন থাকিয়াছেন অভুক্ত। যখন বয়স মাত্র ৯ বত্সর, বিচ্ছেদ ঘটিয়াছে তাহার বাবা-মায়ের। ছোট্ট সুয়ারেজকে দেখভাল করিবার ছিল না কেহ। রাস্তাই হইয়া উঠিয়াছিল সুয়ারেজের ঠিকানা। ধুলাবালিতে খেলাধুলা আর মারপিট করিয়াই তিনি পার করিতেন সময়। ফুটবলের প্রথম পাঠও তিনি গ্রহণ করিয়াছেন ওই রাস্তার ওপরেই। আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ তো অনেক কল্পদূরের কথা।
ছেলেবেলার সেই কষ্টকর দিনগুলিই কি সুয়ারেজের মননে এমন খুনে প্রবৃত্তির জন্ম দিয়াছে? কেননা মানসিকভাবে বাড়িয়া ওঠার ওই দিনগুলিই তো মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনে ভূমিকা রাখে। সুয়ারেজের কামড় নিন্দনীয় নিঃসন্দেহে। তাহা লইয়া হইচই হওয়াটাও অস্বাভাবিক নহে। কিন্তু মুদ্রার অন্যপিঠের সত্যের দিকেও তাকাইতে হইবে। সুয়ারেজ যে স্বাভাবিক শৈশব পায় নাই, তাহার জন্য কি সুয়ারেজ দায়ী? তাহার আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ যে তিনি পান নাই, বড় হইয়াছেন এক ধরনের ‘চরম’ পরিবেশে। অথচ নিজের বিরল প্রতিভার শক্তিতেই তিনি একসময় হইয়া উঠিয়াছেন খ্যাতিমান ফুটবল খেলোয়াড়। মাত্রই মাসখানেক পূর্বে তিনি ইংল্যান্ড ফুটবল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন ও পেশাদার ফুটবলার অ্যাসোসিয়েশনের বিচারে বর্ষসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হইয়াছেন। সুতরাং যাহা কিছু তাঁহার ভালো, তাহা তাঁহার নিজস্ব। আর যাহা খারাপ, তাহা তাঁহার নহে—বিশ্বের রাষ্ট্র-সমাজ ও পরিবার ব্যবস্থার। আমাদের দেশেও কোটি কোটি শিশু সুয়ারেজের মতো শৈশব পার করিয়া বড় হইতেছে। তাহাদের জন্যও আমাদের একই ভাবনা উত্সারিত হওয়া উচিত।
