আজ ৩০ জুন ১৫৯তম ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস। ১৭৮০ সালের ১৩ জানুয়ারি তত্কালীন জনপ্রিয় আদিবাসী নেতা তিলকা মুরমুর নেতৃত্বে সাঁওতালদের সংগ্রামের সূচনা হয়। তিনি প্রথম বিদ্রোহী বাহিনী গঠন করে পাঁচ বছর ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। পরবর্তীতে ১৮১১, ১৮২০, ১৮৩১ খ্রীষ্টাব্দে সাঁওতালগণ সংগ্রাম করলেও ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের সাঁওতাল পারগনা জেলার ভগনাডিহি গ্রামে ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন সিঁদু, কানহুর নেতৃত্বে শোষণহীন সমাজের লক্ষ্যে দশ হাজার সাঁওতালদের শপথ গ্রহণ এবং কলিকাতা অভিমুখে গণযাত্রা ছিল ইতিহাস খ্যাত সাঁওতাল বিদ্রোহ।
ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের সাঁওতাল পারগনা জেলার ভগনাডিহি গ্রামের চুনু মুরমুর যোগ্য সন্তান সিঁদু, কানহু, চাঁদ, ভাইরো বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। জমিদার ও মহাজনদের ঠকবাজী, পুলিশ দারোগাদের নির্যাতন, জুলুম ও অত্যাচার, অন্যান্য সম্প্রদায়ের শোষণ এবং এসকল বিষয়ে সরকার বাহাদুরের অমনোযোগিতা ইত্যাদি ছিল বিদ্রোহের মূল কারণ।
দামিন-ই-কোহ অঞ্চলে সাঁওতাল সম্প্রদায় বসবাস করত। জমিদার মহাজন পুলিশ-দারোগা সরকারি কর্মকর্তাগণ সাঁওতালদের বিভিন্নভাবে অত্যাচার করত। ঋণ নিত, ঋণ শোধ করত কিন্তু ঋণ ফেরত দেয়ার পরও ঋণের খাতায় ঋণ থেকেই যেত। ঋণ শোধ করার জন্য বন্ধকনামা চুক্তি হতো। চুক্তি অনুযায়ী কাজ করে তারা শোধ করার চেষ্টা করত। এই ধারাবাহিকতায় মহাজনদের নিকট বংশ পরম্পরায় আদিবাসীদের গোলাম হয়ে থাকতে হত। মহাজনদের নিকট থেকে গৃহীত ঋণ শোধ করতে সাঁওতালদের জমি-জমা বিক্রয় করতে বাধ্য করত।
৩০ জুন ১৮৫৫ সিঁদু কানহুর ডাকে ভগনাডিহি গ্রামে দশ হাজার সাঁওতাল সমবেত হয়েছিল। বিদ্রোহের জন্য যার যা ছিল তীর ধনুক সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। এই বিদ্রোহের আগুন ১৮৫৪ সালের জানুয়ারি মাস থেকেই চলছিল, তখন থেকেই সাঁওতালরা বিদ্রোহের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সাম পারগনা জানালেন যে, মহেশ দারোগা এবং কেনারাম ভগত পিপড়ার হাড়মা দেশ মাঞ্জহির ছেলে চাম্পাই, গারভু মাঞ্জহি এবং আরো তিন-চারজনকে ভাগলপুরে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। সাম পারগানা তাদের রক্ষা করতে সিঁদু কানহুকে অনুরোধ করলেন। পাঁচকাঠিয়া পাহাড়ের নিকট তাদের রক্ষা করতে গিয়েই ১ জুলাই ১৮৫৫ বিদ্রোহীরা মহেশ দারোগা, কেনারাম ভগতসহ ১৯ জনকে হত্যা করে। এই হত্যার মধ্য দয়েই বিদ্রোহ শুরু হয়।
দামিন-ই-কোহ অঞ্চলের সাঁওতাল, কামার, কুমার, মোমিন (মুসলমান) অত্যাচারিত সকল জনগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ সকলেই এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করে। প্রায় দশ হাজারেরও অধিক বিদ্রোহী এই বিদ্রোহে শহীদ হন। এই বিদ্রোহ দমনে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত কয়েক হাজার বৃটিশ সৈন্য তীর ধনুক সজ্জিত আদিবাসী বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধ করে। দীর্ঘ প্রায় ০৮ মাস এই যুদ্ধ স্থায়ী হয়।
সিঁদু কানহুর মৃত্যুর তারিখ সঠিকভাবে জানা যায় না। কোন কোন ঐতিহাসিক এবং চটরাই দেশ মাঞ্জহির সাক্ষ্য মতে, কানহু মৃত্যুবরণ করে ১৮৫৫ সালে অক্টোবর মাসে যুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়ে। কোন কোন তথ্য মতে সিউড়ির মাঠে মহুয়া গাছে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। আবার ১৮৫৫ সালে ১০ নভেম্বর মার্শাল-ল জারি করার পর সিঁদুকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাষ্ট্রদ্রোহিতার দায়ে তাকে ১৮৫৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ভাগলপুরে অমানসিক অত্যাচারের পর সিংরাইসহ তাকে একটি মহুয়া গাছে হাজার হাজার লোকের সামনে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয় এবং এর কিছুদিন পর বিদ্রোহের অবসান ঘটে। প্রতি বছর ভারত ও বাংলাদেশের সাঁওতালগণ মহান নেতা সিঁদু কানহুর স্মরণে দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালন করে থাকে।
লেখক :নির্বাহী পরিচালক, বিজয় ফাউন্ডেশন, বাগদাহাট, গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধা
