মৃত্যুকূপে বসবাস

আপডেট : ২৯ জুন ২০১৪, ২২:১৩
ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের জন্মস্থান সুন্নি অধ্যুষিত তিকরিত নগরী। এগারো জুন। গুলি আর গোলার শব্দে ঘুম ভাঙে সবার। যারা হামলা চালিয়েছে তারাও সুন্নি। সেনা চৌকি আর সেনানিবাস থেকে পালিয়ে যায় সব শিয়া নিরাপত্তা কর্মী। অত্যাধুনিক অস্ত্রের মুখে টিকতে পারেনি তারা। বেশ কয়েকজন বন্দি হয়, মারাও যায়। আকস্মিক হামলায় সুন্নি গেরিলাদের নিয়ন্ত্রণে আসে গোটা তিকরিত। তবে এটা সবে শুরু। এর সতেরো দিন পর আরো ভয়াবহ কান ফাটানো শব্দ। হামলা চলে চতুর্দিক থেকে। পুরোনো গেরিলা কায়দায় নয়, বরং সুন্নি গেরিলাদের হটাতে রক্তক্ষয়ী ঐ অভিযানের অগ্রভাগে ছিলো রাশিয়া ও বেলারুশের কাছ থেকে পাওয়া যুদ্ধ বিমান আর গোলাভর্তি ট্যাংক। পেছনে পেছনে সেনাবাহিনী আর শিয়া গেরিলা গ্রুপের হাজার হাজার বন্দুকধারী। ইরাকি টেলিভিশনে এই খবর ফলাও করে প্রচার করা হয়। বলা হয়, বড় ধরনের অভিযানে মারা গেছে অন্তত ৬০ জন সুন্নি গেরিলা। পুনরুদ্ধার করা হয়েছে তিকরিত। ইরাক যুদ্ধ শেষ না শুরু, সেটা এখন বিরাট এক প্রশ্ন। টানা আট বছর ধরে বিতর্কিত যুদ্ধ চালিয়ে ক্লান্ত পশ্চিমা বিশ্ব হয়তো বলবে, ২০১১-তেই ইরাক যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। সব বিদেশি সেনা প্রত্যাহারের পর সেখানে আবার যুদ্ধ কিসের! তবে ইরাকিদের কাছে সম্ভবত যুদ্ধ কেবল শুরু, হোক সে শিয়া অথবা সুন্নি। এই রক্তারক্তিতে নিজেকে স্বেচ্ছায় জড়িয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। পরোক্ষভাবে জড়িয়েছে সিরিয়া, রাশিয়া ও বেলারুশ। তাই ইরাকে যা চলছে, তাকে অনেক বিশ্লেষক গৃহযুদ্ধ বলতেও নারাজ। বরং তা আরো বড় কিছু। কিন্তু যুদ্ধ মানেই মানবিক বিপর্যয়। একসাথে বহু মানুষের প্রাণহানি, ক্ষতবিক্ষত শরীর আর আর্ত চিত্কার। চিকিত্সা, খাবার, বাসস্থান কোন কিছুই নেই। তারপরও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে স্ত্রী, সন্তান নিয়ে পালিয়ে বেড়ানো। সবমিলিয়ে ইরাক এখন এমনই এক মৃত্যুকূপ। জাতিসংঘের হিসেবে ইরাকে সুন্নি গেরিলা হামলা চলাকালে মাত্র দুই সপ্তাহে মারা গেছে সহস্রাধিক মানুষ। আহত হয়েছে আরো সমান সংখ্যক লোক। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিনেভেহ ও সালাহ আল-দ্বীন প্রদেশ এবং দায়ালায় পাঁচ থেকে বাইশ জুনের মধ্যে মারা গেছে সাড়ে সাতশ’রও বেশি মানুষ। আহত হয়েছে প্রায় ছয়শ’। একই সময়ে বাগদাদ ও এর দক্ষিণাঞ্চলে মারা গেছে আরো তিনশ’ আঠারোজন। আহত হয়েছে অন্তত পাঁচশ’ নব্বইজন। এদের অধিকাংশই গাড়িবোমার শিকার। জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের মুখপাত্র রুপার্ট কলভিল জানিয়েছেন, হতাহতের সংখ্যা নিরূপণ করা হয়েছে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে। আসল সংখ্যা আরো বেশি। ব্যাপকভাবে অপহরণ, খুন ও মৃত্যুদণ্ড দেয়ার প্রমাণও আছে জাতিসংঘের কাছে। রেহাই পাচ্ছে না সংখ্যালঘু তুর্কমান, শাবাক ও ইয়াজেদিরা। আর গোটা তিকরিত এখন ভূতুড়ে নগরী। আতঙ্কে আছে নিরস্ত্র সাধারণ সুন্নিরা, কখন যে শিয়া গেরিলারা প্রতিশোধ নিতে রক্তের নেশায় মেতে ওঠে, তা বলা মুশকিল। ইরাকি সেনাবাহিনী হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, সুন্নি আইএসআইএস গেরিলাদের সামনে দু’টি পথ খোলা রয়েছে। ‘হয় পালাও, নইলে জীবন দাও’। পশ্চিমের নাজাফ শহরও পুনরুদ্ধার করেছে শিয়া গেরিলারা। ইরাকি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গোটা তিকরিত অভিযানে সমন্বয় করেছে মার্কিন সামরিক উপদেষ্টারা। যদিও যুক্তরাষ্ট্র বলছে, সরাসরি যুদ্ধ বা সহিংসতায় অংশ নেবে না উপদেষ্টারা। তবে তাদের সুরক্ষা দিতে ইরাকের আকাশে সশস্ত্র ড্রোন মোতায়েনের কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরাকে সহিংসতা ঠেকাতে প্রয়োজন রাজনৈতিক কার্যকারিতা, দুর্বৃত্তায়ন করে যা সম্ভব নয়। এই বিষয়টিই ভাল করে বুঝেছে যুক্তরাষ্ট্র। সুন্নি বিদ্রোহের মূল যে তাদের কোণঠাসা করে রাখা, সেটা বুঝতে বাকি নেই ওয়াশিংটনের। তাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নূরি আল মালিকির পদত্যাগের। আহ্বানে সাড়া না দিলেও এর গুরুত্ব আরেকজন বেশ ভাল করেই আঁচ করতে পেরেছেন; তিনি আয়াতুল্লাহ আল সিস্তানি। জন্মস্থান ইরানে হলেও তিনি এখন ইরাকের সবচেয়ে প্রভাবশালী শিয়া ধর্মীয় নেতা। সিস্তানি ক’দিন আগে ইরাকের সুন্নি গেরিলাদের বিরুদ্ধে শিয়াদের অস্ত্র ধরার আহ্বান জানিয়েছিলেন। আর এবার যুক্তরাষ্ট্রের কণ্ঠেই সুর মিলিয়ে তিনি আহ্বান জানালেন প্রধানমন্ত্রী নূরির পদত্যাগের। সুন্নি গেরিলাদের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন আর তেহরানের একই অবস্থান বা মতৈক্য বেশ রহস্যজনক। পদত্যাগ করতে প্রধানমন্ত্রী নূরিকে মঙ্গলবার পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছেন আয়াতুল্লাহ আল সিস্তানি। সব রাজনৈতিক দলের প্রতি তিনি নতুন স্পীকার ও নতুন প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দেয়ারও আহ্বান জানান। কিন্তু নূরি চান তৃতীয় মেয়াদেও প্রধানমন্ত্রী থাকতে। গত এপ্রিলের নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন স্টেট অব ল’ জোট পার্লামেন্টের অধিকাংশ আসন পেলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে কিছু যায় আসে না ইরাকের তেলবাজ ক্ষমতালিপ্সুদের। কিন্তু আয়াতুল্লাহ আল সিস্তানির আহ্বান রাজনীতিকদের উপর বড় ধরনের চাপ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একদিকে সুন্নি গেরিলা, অন্যদিকে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে কুর্দিদের স্বাধীনতার দাবি। সবমিলিয়ে ইরাকের রাজনীতি অঙ্গনে চলছে বড় ধরনের ঝড়। এরই মধ্যে কুর্দি নেতা মাসুদ বারযানি কুর্দিস্তানের স্বায়ত্তশাসন অর্জনের দাবি করেছেন। তেলসমৃদ্ধ কিরকুর নগরীর পতনের পরই তিনি এই ঘোষণা দেন। আসলে সুন্নি গেরিলাদের ভয়ে ইরাকি সেনারা সেখান থেকে পালিয়ে গেলে ঐ নগরী সহজেই কুর্দিদের হস্তগত হয়। ইরাকে আইএসআইএসের রয়েছে দশ হাজার যোদ্ধা। বর্তমানে তাদের গণ্য করা হচ্ছে দুনিয়ার সবচেয়ে সম্পদশালী গেরিলা সংগঠন হিসেবে। যাদের দখলে রয়েছে সিরিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ আলেপ্পোর আল-বাব নগরী থেকে ইরাকের সালাহউদ্দিন প্রদেশের সুলেইমান বেক পর্যন্ত খনিসমৃদ্ধ এলাকা। কেন্দ্রীয়ভাবে তারা সুনিয়ন্ত্রিত ও শক্তিশালী। রাজনৈতিক দর্শনের পাশাাপাশি এই সংগঠনের রয়েছে আমলাতন্ত্র, হিসাব নিরীক্ষণ ব্যবস্থা এবং সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামো। আইএসআইএসের স্বপ্ন ইসলামি রাষ্ট্র গঠন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- ইরাকের নূরি সরকারের বিরুদ্ধে আইএসআইএসের মতো অস্ত্র ধরেছে আরো অনেকে। সুফিবাদী, সাদ্দামের বাথ পার্টির সমর্থক এবং স্থানীয় উপজাতি গোষ্ঠী। আর এ কারণেই হয়তো সরকার বিরোধীদের দমন করা এতটা সহজ হবে না। তবে চতুর্মুখী হামলার মুখে অদূর ভবিষ্যতে বা দীর্ঘ মেয়াদে আইএসআইএসের পরিকল্পনা কী, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জঙ্গি দমনের কার্যকারিতা থেকে শুরু করে গোটা ঐ অঞ্চলের স্থিরতা, সবকিছুই এখন নির্ভর করছে নূরি আল মালিকির ভবিষ্যত্ কর্ম তত্পরতার উপর।