ধুত্তুরি, এসব আমার মোটেই ভাল লাগে না। আমি প্রযুক্তি বুঝি না; জীবনেও ভাবিনি যে, এমন কাজ আমাকে করতে হবে— লাজুক হাসি দিয়ে এমনই বলছিলেন কলম্বিয়ার গবাদি পশু প্রজনন প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মী, ৬১ বছর বয়স্ক আলিরিও আলফন্সো গুয়েরেরো। দেশটির রাজধানী বগোটায় একটি বেসরকারি সংগঠনের সহযোগিতায় তিনি এখন কম্পিউটার শিখছেন। নিজ দেশেই শরইার্থী বনে যাওয়া ৫ দশমিক ৭ মিলিয়ন কলম্বিয়ানের একজন হচ্ছেন এই গুয়েরেরো। কম্পিউটার তার কাছে দুর্বোধ্য ঠেকে। সেজন্য ফিরে যেতে চান গ্রামে, যেখানে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন। কিন্তু মন চাইলেও যেতে না পারার কারণটি না হয় তার নিজ মুখেই শুনি, ‘এ কাজ আমি এখন করতে পারি না; করা উচিতও হবে না। গ্রামাঞ্চলের লোকজন সবচে’ বেশি ভুগছে।’
অভ্যন্তরীণভাবে স্থানচ্যুত লোকের সংখ্যার বিচারে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ার অবস্থান পৃথিবীতে দ্বিতীয়। প্রথম স্থানে সিরিয়া। বড় বড় ভূস্বামীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্যারামিলিটারি গ্রুপগুলো সিজার অঞ্চলে অবস্থিত নিজের খামার ছাড়তে বাধ্য করেছিলেন গুয়েরোরোকে। সেটি ২০০৫ সালের কথা। গুয়েরেরো দুঃখ করে বলছিলেন, ‘তারা সকল কৃষকের উপর গেরিলার ছাপ দিয়ে দিয়েছিল। তারা মনে করত, আমরা সকলেই এফএআরসি (দ্য রেভুলুশনারি আর্ম ফোর্সেস অফ কলম্বিয়া)-এর কাছে খাবার বিক্রি করি। ওই অপরাধেই আমাদের বাস্তুচ্যুত হতে হয়।’ প্যারামিলিটারি সদস্যরা গুয়েরেরোর এক ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। প্রায় ২০০ পোষাপ্রাণী রেখে জীবণ নিয়ে পালিয়েছিলেন গুয়েরেরো। সিজার অঞ্চলে এখন পর্যন্ত কয়েকশ’ লোক নিহত হয়েছে। যে কারণে তিনি ফিরে যেতে পারছেন না।
বামপন্থী বিদ্রোহী, ডানপন্থী প্যারামিলিটারি ও অপরাধী চক্রগুলোর মধ্যে দশকব্যাপী চলা ত্রিমুখী দ্বন্দ্বে কলম্বিয়া ক্ষতবিক্ষত। মোট জনসংখ্যার দশ শতাংশই অভ্যন্তরীণভাবে স্থানচ্যুত। এদের একটা বড় অংশই বোগাটায় বসবাস করছে। বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন স্থায়ীভাবে এদের কাজের বন্দোবস্ত করতে বেশ তত্পর। তারা স্থানচ্যুত লোকজনকে কম্পিউটার মেইনটেনেন্স, রুটি বানানো, অফিস পরিচালনা, সেলাই, গহনা তৈরি ও ইংরেজি শেখাচ্ছে। সরকারও তাদের ব্যাপারে বেশ আন্তরিক। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে, স্থায়ী নয় ভেবে নিয়োগকারীরা তাদেরকে কাজ দিতে চায় না। যে কারণে বেশিরভাগই নিজস্ব ব্যবসা শুরু করতে চায় আর এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে, তাদের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ নেই। শরণার্থী শিবিরগুলোতে তারা যে খুব ভাল রয়েছে তাও বলা যাবে না। খাবার, পানি ও শৌচাগারে কষ্ট না থাকলেও ইউনাইটেড ন্যাশনস হাই কমিশন ফর রিফিউজিস-এর মাধ্যমে প্রত্যেকটি পরিবারকে প্রতি বছর যে অর্থ দেয়া হয় তাতে তাদের অন্যান্য খরচ মোটেও চলে না।
কলম্বিয়ায় ভূমি প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ২০১১ সালে। সরকারিভাবে যার নাম শিকার ও ভূমি প্রত্যর্পণ আইন। এর মাধ্যমে ২ লাখ স্থানচ্যুত পরিবারকে তাদের জমি ফিরিয়ে দেয়ার আশা করা হচ্ছে। কিন্তু হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ অন্য মানবাধিকার সংগঠনগুলো চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ধীরগতির কড়া সমালোচনা করে আসছে। সরকারের ভূমি প্রত্যর্পণ এজেন্সির জাতীয় পরিচালক জেসাস রিকার্ডো উরোগো স্বীকার করেছেন, চুক্তি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকার নানাবিধ সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। তার মতে পুরো প্রক্রিয়াটি আসলে খুবই জটিল। কিছু লোক অজ্ঞাতেই অন্যের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া জমি কিনে বসে আছে। এদেরকে উচ্ছেদ করে প্রকৃত মালিকের কাছে জমি ফিরিয়ে দেয়াটাই সরকারের জন্য বিরাট এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ তাদেরকে সরিয়ে দিলে তাদেরও তো বাস্তচ্যুতি ঘটবে। তাদেরকে জোর করে সরানো যাচ্ছে না ওইসব অঞ্চলে সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল বলে। তবে উরেগো দাবি করেছেন, কলম্বিয়াই পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যেখানে সংঘাত চলমান অবস্থায় ভূমি প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
মোট জনসংখ্যার দশ শতাংশ লোক তাদের প্রথাগত জীবিকা থেকে দূরে থাকলেও কলম্বিয়ার অর্থনীতি কিন্তু খুব একটা খারাপ পর্যায়ে নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি থেকেছে ৫ শতাংশের আশেপাশে, যা ল্যাটিন আমেরিকার তৃতীয়-বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ আর্জেন্টিনার চেয়ে বেশি। বিশ্বমন্দার এই সময়েও কলম্বিয়ার অর্থনীতির উপর তেমন আঘাত আসেনি। দ্বন্দ্ব-সংঘাত দূর করতে পারলে তরতর করে উপরে উঠে যাবে দেশটি— এমনই বিশ্বাস বিশ্লেষকদের। শরণার্থী সমস্যা দূর করতে পারলেও অর্থনীতিতে সুবাতাস বইতে শুরু করবে।
আলিরিও আলফন্সো গুয়েরেরো তার কম্পিউটার ক্লাসের ফাঁকে বলছিলেন, ‘প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে নীতিগতভাবে আমি সমর্থন করি; কিন্তু আমি মনে করি, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটাতে পারলে চুক্তি বাস্তবায়ন করেও কোন লাভ হবে না। ফিরে গেলেও সশস্ত্র গ্রুপগুলো আবার আমাকে তাড়িয়ে দেয়ার সম্ভাবনা যথেষ্টই। আসলে সরকারের প্রধান কর্তব্য সংঘাতের মূল উপড়ে ফেলা। কিন্তু এ কাজটি বড্ড কঠিন।
