তার মেধা আছে, গণতন্ত্রের প্রতি ভালোবাসা আছে। আছে সাধারণ মানুষের হূদয় জয় করার ক্ষমতা। এমন মানুষকেই তো দেশের শাসক হিসেবে চায় জনগণ। সেই হিসেবে মিয়ানমারের প্রকৃত শাসক হতে পারতেন সেদেশের গণতন্ত্রের মানসকন্যা হিসেবে খ্যাত নেত্রী অং সান সু চি। দীর্ঘদিন গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তির পর তিনি চেয়েছিলেন জনগণের সেবা করতে। কিন্তু মিয়ানমার সরকারের কুটকৌশলের কাছে হার মানতে যাচ্ছেন তিনি। আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে সু চিকে গৃহবন্দিদশা থেকে মুক্তি দিলেও তিনি যাতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়তে না পারেন সে উদ্দেশে সরকার এমনভাবে ঘুটি সাজিয়েছে যাতে সু চি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘মাত’ হয়ে যান।
সু চি নির্বাচনে লড়লে জিতে যাবেন এমন আশঙ্কায় তাকে ভোটে দাঁড়ানোর সুযোগই দেবে না সরকার। নির্বাচনে প্রার্থীতা সংক্রান্ত সংবিধানের সেই বিতর্কিত ধারাটি অক্ষুণ্নই থেকে যাচ্ছে। ফলে মাঠে মারা পড়ছে সু চির স্বপ্ন। সু চির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে বিবেচিত সংবিধানের ধারাটি বহাল রাখার পক্ষে সম্প্রতি ভোট দিয়েছে দেশটির সংসদীয় কমিটি। ওই কমিটির গৃহীত সিদ্ধান্ত এসময় নেয়া হলেও এখনও তা প্রকাশ করা হয়নি। তবে পরিষদের একজন সদস্য গণমাধ্যমকে ভোটের এ ফল সম্পর্কে নিশ্চিত করেছেন। মিয়ানমারের সংবিধানের ৫৯ (এফ) ধারায় বলা হয়েছে, মিয়ানমারের কোনো নাগরিকের স্বামী বা স্ত্রী অথবা সন্তান বিদেশি নাগরিক হলে তিনি প্রেসিডেন্ট পদের প্রার্থী হতে পারবেন না। পার্লামেন্টের একটি কমিটির বেশিরভাগ সদস্য সংবিধানের ওই ধারা বহাল রাখার পক্ষে ভোট দিয়েছে। যেহেতু সু চির প্রয়াত স্বামী মাইকেল এরিস ব্রিটিশ নাগরিক ছিলেন, তার দুই ছেলেও বর্তমানে ব্রিটিশ নাগরিক, কাজেই তিনি প্রেসিডেন্ট পদের প্রার্থী হতে পারবেন না।
সংবিধান সংস্কার নিয়ে কাজ করছে এমন কমিটির ৩১ সদস্যের মধ্যে ২৬ জনই প্রেসিডেন্ট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ার যোগ্যতা সম্পর্কিত ওই ধারাটি বহাল রাখার পক্ষেই ভোট দিয়েছে।
তবে এই ধারা বহাল থাকবে কি-না, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। কেবল পার্লামেন্টে ভোট গ্রহণের পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাবে। পার্লামেন্ট কবে ভোটাভুটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, তাও স্পষ্ট নয়। পার্লামেন্টের যে কমিটি সংবিধানের ওই ধারা বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে তার বেশিরভাগ সদস্যই সু চি বিরোধী ও সেনা সমর্থক ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির রাজনৈতিক নেতা। এ পার্টি পার্লামেন্টে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের অধিকারী। এই কমিটি সু চিকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করার সুযোগ দেয়ার মতো কোনো পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দেবে এমনটি প্রত্যাশিত নয়। তবে পার্লামেন্টের ভোটের ফলাফলও একই ধরনের হবে বলে পশ্চিমা বিশ্লেষকদের ধারণা।
আগামী বছর কোনো এক সময়ে মিয়ানমারের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সু চিকে নির্বাচনে লড়তে দেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। সম্ভবত একারণে সরকার তড়িঘড়ি করে সংবিধানের ধারাটি আরো পোক্ত করে আন্তর্জাতিক মহলকে দেখাতে চাইছে যে দেশের আইনেই সু চি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সু চির ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি পার্টি ওই নির্বাচনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবে আবির্ভূত হবে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে সু চির দল জয়লাভও করে যেতে পারে। দলের নেত্রীকে যদি নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বঞ্চিত করা যায় তবে তার নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মনোবল ভেঙে যাবে। একারণেই সম্ভবত সু চিকে ‘বলির পাঠা’ বানানো হচ্ছে। সংবিধানের ধারা দিয়েই কাবু করার কৌশল নিয়েছে সরকার। তবে সু চি বর্তমান সংবিধানকে সংশোধন করে একে গণতান্ত্রিক রীতিনীতির সঙ্গে মানানসই করে তোলা এবং আগামী নির্বাচনকে অবাধ ও নিরপেক্ষ করে তোলার দাবি জানিয়েছেন।
প্রায় পাঁচ দশক ধরে মিয়ানমারে সামরিক শাসন চলছে। তবে ২০১০ সালে সাজানো একটি ‘গণতান্ত্রিক’ নির্বাচনে জেনারেল থেইন সেইন দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। সু চির রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি বা এনএলডিকে পাশ কাটিয়ে ওই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময় থেইন সেইনের ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে ২০১০ সালের নভেম্বরে সু চিকে মুক্তি দেয়া হয়। প্রসঙ্গত, ২১ বছরের রাজনৈতিক জীবনের ১৫ বছরই তাকে কাটাতে হয়েছে গৃহবন্দি হিসেবে।
২০০৮ সালে মিয়ানমারের তত্কালীন সামরিক জান্তা নতুন করে সংবিধান রচনা করে। তখন মূলত সু চি যাতে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতেই ৫৯ (এফ) ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
১৯৯০ সালের সাধারণ নির্বাচনে সু চির দল এনএলডি বিপুল ভোটে জয়ী হয়। কিন্তু তত্কালীন সামরিক জান্তা দলটিকে সরকার গঠন করতে দেয়নি। ২০১০ সালে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হওয়ার পর সু চি ও তার দল এনএলডি দেশের সংবিধান পরিবর্তনের জন্য চেষ্টা চালিয়ে আসছে। ২০১২ সালে উপ-নির্বাচনেও সু চির দল ৪৩ আসনে জয়লাভ করে। বার বারই সু চি প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন এবং সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল মিন অং কে আহ্বান জানিয়েছেন সংবিধানের এই ধারাটি বাদ দেয়ার জন্য। কিন্তু তারা এখনো আলোচনার জন্য রাজি হননি।
মিয়ানমারে প্রেসিডেন্ট সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না। পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী দল তাদের পছন্দের প্রার্থীকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করে। গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর এনএলডি ২০১৫ সালে অনুষ্ঠেয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয়। একারণেই হয়তো ভয় পেয়ে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার রাস্তা বেছে নিল সরকার।
