রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাইয়া ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসের ১৪টি বালাম বই বা গোপন নথি উদ্ধার করিয়াছে পুলিশ। সেইসঙ্গে ৯ জনের একটি জালিয়াত চক্রকেও গ্রেফতার করিয়াছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে রহিয়াছে তেজগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দুইজন পিয়ন ও দলিল লেখকসহ এই কাজে জড়িত কয়েকজন প্রতারক। তাহাদেরকে আদালতের নির্দেশে ইতিমধ্যে রিমান্ডেও নেওয়া হইয়াছে। পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী এবারই প্রথম এই ধরনের অপরাধীদের হাতেনাতে ধরা সম্ভব হইয়াছে। এইজন্য আমরা পুলিশকে ধন্যবাদ জানাই। তবে ভূমি নিয়া জাল-জালিয়াতির ঘটনা বাংলাদেশে নূতন নহে। ইহার ভোগান্তিতে পড়িয়া কত পরিবার নিঃস্ব হইয়া গিয়াছে এবং কত খুন-খারাবি ও মামলা-মোকদ্দমা হইয়াছে তাহার ইয়ত্তা নাই। এখনও এই দুর্ভোগ অব্যাহত আছে। আধুনিককালে ভূমি রেজিস্ট্রেশন, মৌজা ম্যাপসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশনের আংশিক উদ্যোগ গ্রহণ করায় এই অপরাধপ্রবণতা কিছুটা হইলেও কমিয়াছে। এমতাবস্থায় ভূমি নিয়া সর্বপ্রকার জাল-জালিয়াতি বন্ধের প্রচেষ্টা আমাদের অব্যাহত রাখিতে হইবে।
বালাম বইয়ের ন্যায় গোপন বই ও তথ্যাদি পাচার হওয়াটা গুরুতর অপরাধ। সর্ষের মধ্যে ভূত না থাকিলে এই কাজ দুঃসাধ্য বটে। কিন্তু যখন এই ধরনের জালিয়াতিও ঘটে, তখন ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসের প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস নষ্ট হইয়া যায়। মূলত জমির মূল নথি হিসাবে বালাম বই ব্যবহূত হয়। এই বালাম বই ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসের ভল্টে সুসংরক্ষিত থাকার কথা। ইহা একমাত্র কোর্ট ছাড়া অন্য কাহারো দেখার অনুমতি নাই। কিন্তু একটি চক্র ভল্ট শাখায় কর্মরত কর্মচারীদের অতি লোভ দেখাইয়া বশে আনিয়া বালাম বই বা বইয়ের কিছু পাতা পাচার করিতেছে। তাহার পর সেই বই বা পাতা হইতে প্রকৃত মালিকের নাম কাটিয়া ভুয়া মালিকের নাম বসাইয়া দেওয়া হইতেছে। ইহার পর তৈরি করা হইতেছে জাল দলিল। যেহেতু বালাম বইতে নাম আছে, তাই শেষ পর্যন্ত জমির মালিকানা নিয়া মামলার লড়াইয়ে কোর্টের রায় ভুয়া মালিকের পক্ষে চলিয়া যাইতেছে। এই ধরনের ভয়াবহ অপরাধের দ্রুত শাস্তি না হইলে ভূমি ব্যবস্থাপনায় চলিতে থাকা দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর করা আরও কঠিন হইয়া পড়িবে।
বস্তুত জমি নিয়া জাল-জালিয়াতির অভাব নাই। শুধু বালাম বই পাচারকারীদের নহে, ভুয়া জাল দলিল করিতে যাহারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করে, তাহাদেরও সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেফতার করা দরকার। যাহারা জমির দাম নিয়া লুকোচুরি খেলে, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেয়, রেজিস্ট্রেশনে মাত্রাতিরিক্ত অর্থ আদায় করে ও সাধারণ মানুষকে নানা হয়রানিতে ফেলে, তাহাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক। এক সময় দেশের আদালতগুলোর মোট মামলার শতকরা ৭৭ ভাগ ছিল ভূমিবিরোধ সংক্রান্ত। বর্তমানে ভূমি ব্যবস্থা আধুনিকীকরণের উদ্যোগে কোন কোন ক্ষেত্রে এই অবস্থার কিছুটা উন্নতি হইয়াছে। তবে এখনও এক্ষেত্রে বহু পথ পাড়ি দিতে হইবে। মূলত জমি নিয়া বিরোধের মূল উত্স হইতেছে ১৭৯৩ সালে জারিকৃত লর্ড কর্ণওয়ালিশের ভূমি বন্দোবস্ত আইন। ইহার মাধ্যমে বাংলার সাধারণ কৃষক সমাজ চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইহাতে জমির মালিকানা চলিয়া যায় জমিদারদের হস্তে। ইহার পর নানামুখী আন্দোলন ও কৃষক বিদ্রোহের ফলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়। কিন্তু দুর্নীতি জর্জরিত জরিপের কারণে জমির মালিকানা ও স্বত্ব নিয়া দেখা যায় জটিলতা। তখন হইতেই ভূমি অফিসগুলি নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়। জমি নিয়া বিভিন্ন সময় প্রণীত আইনের সঠিক বাস্তবায়ন না থাকার কারণেও সমস্যা গভীরতর হয়। যাহা হউক, ইহা হইতে আমাদের বাহির হইয়া আসিতে হইবে। ভূমি নিয়া বিরোধের অবসান এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় একদিকে ভূমি ব্যবস্থায় সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বাড়াইতে হইবে, অন্যদিকে ভূমি প্রতারকদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হইবে। সারাদেশে তাহাদের বিরুদ্ধে পরিচালনা করিতে হইবে নিয়মিত অভিযান।
