[ আ ন্ত র্জা তি ক ]

ইরাক ইস্যুতে বৃহত্ শক্তির উভয় সংকট

আপডেট : ৩০ জুন ২০১৪, ২১:২৫
পীর আওলিয়ার পুণ্যভূমি সৌম্য-শান্ত-স্নিগ্ধ ইরাকের সর্বত্র আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হচ্ছে যা গৃহযুদ্ধের রূপ নিতে পারে বলে অনেকের ধারণা। একমাসে সহস্রাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন, এবং প্রায় দেড় হাজার গুরুতরভাবে আহত হয়ে মৃত্যু-যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। ইরাক সংকটে নানা প্রতিকূলতা যুক্ত হয়ে এটা দিন দিন এতই গভীর হচ্ছে, যার সমাধান খুব অল্প সময়ে সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইরানসহ বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বৃহত্ শক্তিসমূহ ইরাক সংকটে এমনভাবে জড়িয়ে পড়ছেন, যাতে মনে হয় তারা ইরাক প্রশ্নে নিজেরাই উভয় সংকটে পড়েছে। অনতিবিলম্বে বৃহত্ শক্তিবর্গের অবস্থান স্পষ্ট না হলে ইরাক সংকট মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের সূচনা করবে, একথা নিশ্চিন্তে বলা যায়। জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিদ্রোহী সুন্নী যোদ্ধাদের উপর্যুপরি আক্রমণে ইরাকের বর্তমান সরকারের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোনভাবেই ইরাকী সরকার বিদ্রোহ-দমনে পরিপক্ব ভূমিকা পালনে সক্ষম হয়নি। ১১ জুন সুন্নী বিদ্রোহীদের গোলা-বারুদের মুখে টিকতে না পেরে সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের জন্মস্থান সুন্নী অধ্যুষিত তিকরিত নগরীর সেনানিবাস থেকে পালাতে থাকেন সব নিরাপত্তা কর্মী, আস্তে আস্তে তিকরিতের পতন হয় বিদ্রোহীদের হাতে। এ ঘটনার আগে-পরে সুন্নী বিদ্রোহীরা একে একে গুরুত্বপূর্ণ নগরী মসুলসহ অন্যান্য বড় শহরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। দেশের উত্তর এবং পশ্চিমাঞ্চলসহ বিশাল এলাকা দখলের পর গত ২৬ জুন সুন্নী বিদ্রোহীরা বাগদাদের খুব কাছাকাছি চারটি প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র বিশিষ্ট মানসুরিয়াত আল জাবাল নামক শহরটি দখল করে নেয়। রাজধানী বাগদাদ থেকে মাত্র ১ ঘন্টার দূরত্বে অবস্থিত এ শহরটির কৌশলগত তাত্পর্য অপরিসীম। এখানে বেশ কয়েকটি বিদেশি কোম্পানীর দপ্তর রয়েছে। সুন্নী যোদ্ধারা ইরাক ও সিরিয়ায় সীমান্ত এলাকায়ও নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে সক্ষম হয়েছে এবং সিরিয়ায় যুদ্ধরত সুন্নীদের সাথে তাঁদের একটা যোগাযোগও রক্ষিত হচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। সেই ১১ জুন সুন্নী বিদ্রোহীদের তিকরিত দখলের মাত্র ১৭ দিন পর গত ২৮ জুন তিকরিতের চতুর্দিক থেকে সুন্নী বিদ্রোহীদের আফগানসমূহে উপর্যুপরি পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে তিকরিত নগরীকে ছিন্ন-ভিন্ন করা হয়। সুন্নী গেরিলাদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী এ অভিযানে অগ্রভাগে ছিল রাশিয়া ও বেলারুশের কাছ থেকে পাওয়া যুদ্ধবিমান ও গোলাভর্তি ট্যাংক। পেছনে ছিলো ইরাকী সেনাবাহিনী আর শিয়া গেরিলা গ্রুপের হাজার হাজার বন্দুকধারী ইরাকী সরকারি টেলিভিশনে এ খবর ফলাও করে প্রচার করে ইরাকের সরকার কর্তৃক তিকরিত পুনর্দখলের দাবি করা হয়। ইরাকের বর্তমান গৃহযুদ্ধের উপরোক্ত খণ্ডচিত্রে ইরাকী সংকটের গভীরতা, এ সংকটে জড়িত পক্ষসমূহ এবং সর্বোপরি এ সংকটে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বৃহত্ শক্তিবর্গের ভূমিকার একটা সংক্ষিপ্ত চিত্র পাওয়া যায়। আজকের ইরাকের সংকটটিকে ইরাক নামক দেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করলে সংকটটির মূল বৈশিষ্ট্য অজানা রয়ে যাবে এবং এ সংকট সমাধানে কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে না। ইরাকের জাতীয়তাবাদী নেতা লৌহমানব সাদ্দাম হোসেন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয় পরাশক্তির স্বার্থ রক্ষা করে স্বীয় একনায়কত্ব বজায় রেখেছিলেন। মৃদু মাক্সবাদী আদর্শে গড়া তার বাথ পার্টি সাবেক সোভিয়েত আদর্শের রেখায় চলতে থাকে। পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্শক্তির রাজনৈতিক দাবা খেলায় শিকার হন সাদ্দাম হোসেন। বেশ কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে টিকে থেকে মধ্যপ্রাচ্যে এবং উপসাগরীয় এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন সাদ্দাম এবং এভাবে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সূচনা হয়। দীর্ঘ আট বছর ধরে চলতে থাকা ইরান-ইরাক যুদ্ধের ফলে নব প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ইরান বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং নব উত্থিত আরব জাতীয়তাবাদী নেতা সাদ্দাম হোসেনেরও মাজা ভেঙ্গে পড়ে। এরপর আস্তে আস্তে ইরান শক্তি সঞ্চয় করে এবং অতিশীঘ্র আঞ্চলিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ইরান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করে। অপরদিকে দিকভ্রান্ত হন সাদ্দাম হোসেন। তিনি বিশ্ব বাজারে তৈলের মূল্য বৃদ্ধির ব্যাপারে অনড় থাকলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাদ্দামের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেয় এবং এক পর্যায়ে ইরাক আক্রমণ করে সাদ্দাম হোসেনের সরকারের পতন ঘটিয়ে, সাদ্দামকে হত্যা করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের আজ্ঞাবহ নূর-ই-মালিকীকে ইরাকের মসনদে বসায়। মজার ব্যাপার হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাদ্দামকে উত্খাত করে শিয়া রাজনীতিবিদ নূর-ই-মালিকীর হাতে ইরাকের শাসন ভার অর্পণ করে ইরাক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসার পথ বের করতে সক্ষম হয়। কিন্তু নূর-ই-মালিকীর শাসনে ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি অর্থনীতি, আইন ও শাসন মারাত্মক ধসের মুখে পড়ে। প্রতিনিয়ত, খুন, যখম, গুম, অপহরণ, ইরাকের স্বাভাবিক রাজনৈতিক জনজীবনকে অস্থির করে তোলে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে ইরাকের রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির মূল নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক এন্ড দ্য লেভাল্ট (আইএসআইএল) নামক সুন্নী যোদ্ধা গ্রুপটি। আইএসআইএল ইরাকে নূর-ই-মালিকী সরকার উত্খাত করে সেখানে ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ শহর দখল করে চলেছে। আইএসআইএল বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানালেও ইরাক সরকারের সে আহ্বান তামিল করা থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিরত থাকে। বারাক ওবামা কয়েকজন সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়ে এবং তাদের নিরাপত্তার জন্য ইরাকের আকাশে ড্রোন বিমান উড়িয়ে ইরাক সরকারকে নতুন বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে বলে অনুমিত হচ্ছে। ইরাকের বর্তমান সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পশ্চাত্পসারণ (strategic retreat) হিসেবে অভিহিত করলেও ভূল হবে না। আইএসআইএন যোদ্ধারা সুন্নী, কিন্তু ইরাকের সরকার প্রধান শিয়া। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র সিরিয়ার শিয়া সরকারের বিরুদ্ধেও লড়ছে সুন্নী যোদ্ধাদের বিরাট দল, যাঁদের সাথে রয়েছে আইএসআইএনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং যাদেরকে এতদিন সহায়তা দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। এমন এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপূর্ণ সিরিয়ায় সুন্নী যোদ্ধাদের মতাদর্শপন্থি ইরাকের সুন্নী যোদ্ধারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র অনেকটা উভয় সংকটে। যদি সুন্নীদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র অবস্থান নেয়, তাহলে সেই নীতি সিরিয়ায় সুন্নীদের বিরুদ্ধে যাবে এবং বাশারের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র দাঁড়িয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা হবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র নূর-ই-মালিকীকে পদত্যাগ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের ডাক দিচ্ছে এবং সুন্নীদের একাংশকে সেই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশে স্থান দেওয়ার আহবান জানাচ্ছে। অন্যদিকে ইরান এবং সিরিয়া ইরাকের শিয়া নেতা নূর-ই-মালিকীর সাহায্যে এগিয়ে আসছে। এএফপির সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরাকে সুন্নী বিদ্রোহ সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশারের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। গত ২৪ জুন সিরিয়ায় জঙ্গি বিমান ইরাকের সীমান্ত শহর আল কাইমের কাছে সিরিয়ায় অংশে জঙ্গি হামলা চালিয়েছে বলে আলজাজিরা, বিবিসি ও রয়টার্সের খবরে উল্লেখ করা হয়েছে। স্পষ্ট যে ইরাকের শিয়া সরকারের সহায়তায় সিরিয়া এগিয়ে আসছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়া এ আক্রমণের মৃদু বিরোধিতা করেছে, কিন্তু ইরাক সরকার এ সিরীয় আক্রমণের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করেছে। ইতিপূর্বে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনও ইরাক সংকটে ইরাকী সরকারের পাশে থাকার প্রত্যয় ঘোষণা করেছিলেন। স্পষ্টত ইরান ও শিয়াদের সহায়তায় এবং বাশারের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ সৃষ্টিতে ইরানের ভূমিকা রাখবে। প্রশ্ন হলো, ইরাকের শিয়াদের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইরান, সিরিয়াসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বৃহত্ শক্তিবর্গের নীতির সম্মিলন কেন হচ্ছে? তবে কি বৃহত্ শক্তিবর্গ ইরাক সংকটে উভয় সংকটে পড়েছে? এ উভয় সংকট থেকে কিভাবে তারা উত্তোরণ ঘটাবে, তা অবলোকনের জন্য আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। এ মুহূর্তে সকলের দাবি- নূর-ই-মালিকী সরকারের পদত্যাগ, ইরাকের শিয়া নেতা মোকতাদা আল সদয়, ইরান বংশোদ্ভূত শিয়া নেতা সিসতানী, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিসহ সকলেই আজ ইরাকে নতুন এক একতার সরকারের ধারণা দিচ্ছেন। ইরাকের বর্তমান সংকটে বৃহত্ শক্তিবর্গের ঐক্য যদি দীর্ঘ হয়, একতার সরকার গঠনে যদি সবাই একতাবদ্ধ থাকেন, তাহলে হয়ত শিগগিরই ইরাক সংকটের সমাধানের আলো চোখে পড়বে। লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন