রাজনীতির ফুটবল, ফুটবলের রাজনীতি

আপডেট : ৩০ জুন ২০১৪, ২১:৩৪
Everything is Politics বলে জার্মান লেখক টমাস ম্যান যখন তাঁর দেখা পৃথিবীকে সমালোচনা করেছেন, তখন তিনি সম্ভবত ভুল কিছু করেননি। রাজনীতি এখন এক মস্ত এ্যানাকন্ডা যা একে একে দুনিয়ার সবকিছু গ্রাস করে ফেলছে। নারী-পুরুষ নিয়ে, ধনী-গরিব নিয়ে, সাদা-কালো নিয়ে, পূর্ব-পশ্চিম নিয়ে, আমরা-তারা নিয়ে রয়েছে হাজারো রকমের রাজনীতি। ক্ষমতার করিডোর থেকে খেলার মাঠ পর্যন্ত চলে রাজনীতি। ব্রাজিল-আর্জেটিনার সমর্থকদের দ্বন্দ্ব আওয়ামী লীগ-বিএনপির সমর্থক দ্বন্দ্বের চাইতে কম মারাত্মক নয়। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে একজনের মৃত্যুর খবর পর্যন্ত পাওয়া গেছে। ব্রাজিল সমর্থকেরা মেসি ম্যাজিকে মুগ্ধ নয়, ওদিকে আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা নেইমারের ভরাডুবি দেখতে উদগ্রীব। বাংলাদেশে বিশ্বকাপের রাজনীতি মোটামুটি আওয়ামী লীগ-বিএনপির মতো দুই ভাগে বিভক্ত। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা। সুদূর দক্ষিণ আমেরিকার দুটো দলের প্রতি বাংলাদেশিদের এই বিভক্ত আগ্রহের পেছনে ‘ফুটবলের রাজা’ পেলে আর ‘ফুটবলের যাদুকর’ ম্যারাডোনার হাত থাকতে পারে বলে ধরে নেয়া যায়। তবে ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার দীর্ঘ আধিপত্যে বিরক্ত অনেকে আবার তৃতীয় ধারার অন্বেষায় ইংল্যান্ড, জার্মানী, নেদারল্যান্ডস কিংবা স্পেনের মতো ইউরোপীয় দলকে সমর্থন করে। শ্বেতচর্ম অনিহ কেউ কেউ আবার ঔপনিবেশিকতার ধোঁয়া তুলে ইউরোপীয় দলগুলোর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং এশিয়া, আফ্রিকা, কিংবা ল্যাটিন আমেরিকার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। জগতের লাঞ্ছিত, ভাগ্যহতদের প্রতিনিধি হিসেবে তারা এই দলগুলোকে মনে করে এবং জোরালো সমর্থনদানের মধ্যদিয়ে তাদের ঔপনিবেশিক জ্বালা জুড়ায় এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক দায় পালন করে। এও এক ধরনের রাজনীতি। আরেক শ্রেণীর মানুষের ফুটবল সমর্থন আবার স্রেফ ধর্মবাদী উপাদান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। স্বধর্মের দলের কিংবা খেলোয়াড়দের সামান্য কৃতিত্বেই তারা বিগলিত হয়। অবশ্য দলবিশেষে কিংবা খেলোয়াড় বিশেষে সমর্থনদানে রাজনৈতিক গন্ধ শোঁকা অভিপ্রেত নয়। তবে সেই সমর্থন যদি ক্রীড়া নৈপুণ্য দ্বারা নির্ধারিত না হয়ে রাজনৈতিক প্রবণতা দ্বারা নির্ধারিত হয়, তাহলে তো কিছু বলার থাকতেই পারে। আবাহনী-মোহামেডানের সমর্থন কি দলীয় বিবেচনায় হওয়া উচিত? ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট দলের সমর্থন কি আওয়ামী লীগ-বিএনপি সমর্থনের মাপকাঠিতে হওয়া উচিত? কিন্তু তাকি হচ্ছে না? যদি হয়ে থাকে তাহলে তাকে খেলার রাজনীতি বলতে দোষ কি? বাংলাদেশে আওয়ামী-বিএনপি রাজনৈতিক বিভাজন এমনই প্রকট হয়ে পড়েছে যে, এর হিংসাত্মক প্রকাশ আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চাকে রীতিমতো বিব্রত করছে। একদল বলছে ‘জয় বাংলা’ আরেকদল বলছে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’। একদল রবীন্দ্রনাথকে ভাবছে প্রধান কবি, অন্যদল ভাবছে নজরুলকে। কবিদ্বয়ের নিজেদের মধ্যে যে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি ছিলো তার ছিটে-ফোঁটাও নেই তাদের বিভাজিত ভক্তদের মধ্যে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যে শ্লোগান জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সাড়ে সাত কোটি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলো, সেই ‘জয় বাংলা’ বলতে কেনো অনেকের এতো দ্বিধা আর ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’-এর স্থলাভিষিক্ত করে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলতে কেনো এতো আগ্রহ, তা বুঝতে বেশি মেধা খরচের দরকার পড়ে না। বিভাজিত রাজনীতির প্রকোপে বাংলা ভাষার কোনো কোনো শব্দেরও রাজনীতিকরণ হয়েছে। যেমন, ‘জননেত্রী’ এবং ‘দেশনেত্রী’ মোটামুটি সমার্থক হলেও এদের দ্বারা যে দুইজন রাজনৈতিক নেত্রীকে বোঝানো হয়, তাদের রাজনৈতিক দূরত্ব আলোকবর্ষ সমান। সমার্থক হলেও শব্দ দু’টোর উল্টো প্রয়োগ ঘোরতর অপরাধ বলে বিবেচিত হতে পারে। রাজনৈতিক এই বিভাজনের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা পায়নি আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্যও। স্বাধীনতার ঘোষণার মতো এক ঐতিহাসিক সত্যকেও দেখা যায় বিভাজনের বেড়াজালে আবদ্ধ হতে। বাংলাদেশে বিদ্যমান প্রায় সকল সঙ্কটের অন্যতম প্রধান কারণ এই হিংসাত্মক রাজনৈতিক বিভক্তি এবং অনড়। অপরিবর্তনীয় রাজনৈতিক মাইন্ডসেট। এর থেকে উত্সারিত রাজনীতি তাই কল্যাণের জন্যে রাজনীতি না হয়ে, হয়ে উঠেছে রাজনীতির জন্যে রাজনীতি কিংবা বিরোধিতার জন্যে রাজনীতি। সে ফ বিরোধিতার জন্যে বিরোধিতা করতে গিয়ে বিএনপি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নিয়ে এবং বর্জনের সহিংস পথে পা বাড়িয়ে আম-ছালা সবই খোয়াতে বসেছে। হাসিনা প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তী নির্বাচনী সরকারে সক্রিয় অংশ নিয়ে নির্বাচনে গেলে যে ভিন্ন ফল হতো, বিএনপি এখন তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। কিন্তু হাসিনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের মধ্যেই খালেদার রাজনৈতিক মঙ্গল নিহীত মনে করে গোঁ ধরে থাকাটা যে কাজের হয়নি, তা নিশ্চয়ই এখন বিএনপি’র নীতি-নির্ধারক মহল স্বীকার করবে। বিএনপি’র সবচেয়ে বড় ভুল ছিল বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের ব্যর্থতাগুলো না খুঁজে, সেগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা না করে, আওয়ামী বিরোধিতায় এবং জামায়াত নির্ভরতায় পরিত্রাণের পথ খোঁজা। বিএনপি আপাতত পথ হারিয়ে ফেলেছে। বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদীর সরকার তাদের বাংলাদেশ নীতিতে পূর্বসূরিদের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ইঙ্গিত দেয়ায় এবং দীর্ঘবাহিত সীমান্ত বিরোধ ও তিস্তা পানি বণ্টনে বর্তমান সরকারের সাথে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাওয়ার আশ্বাস দেয়ায় বিএনপি’র ভরসার বেলুন চুপসে গেছে। তবে পরাশ্রয়ী এবং বহির্মুখী না হয়ে আত্মনির্ভরশীল হয়ে দেশ-মাটি ও মানুষের জন্যে গঠনমূলক রাজনীতি চালিয়ে গেলে ভবিষ্যতে বিএনপি শিবিরে সুবাতাস বইতে পারে। চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটের দায় আওয়ামী লীগও সবটুকু এড়াতে পারবে না। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার বোকামির দণ্ড হয়তো বিএনপি ভোগ করছে, কিন্তু আওয়ামী লীগও কি এই উত্তেজনাহীন সহজ বিজয়ে পূর্ণ তৃপ্তি পাচ্ছে? সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করে কিংবা গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রেখে অসাংবিধানিক শক্তির ক্ষমতারোহণের পথকে হয়তো বা রুদ্ধ করা গেছে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে, কিন্তু দেশের সর্ববৃহত্ রাজনৈতিক দল, তথা মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এই নির্বাচন খুব বেশি পয়েন্ট যুক্ত করবে না। সাংগঠনিকভাবে আরো বেশি তত্পর এবং কৌশুলী থাকলে আওয়ামী লীগ ঐ নির্বাচনকেই অধিকতর গ্রহণযোগ্য ও প্রশ্নহীন করতে পারতো। তবে সে সুযোগ এখনও শেষ হয়নি। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল এক সাংবিধানিক বাস্তবতা। ইতিহাস হয়তো একে সেভাবেই মেনে নেবে। কিন্তু এই নির্বাচনের ফলকে তো সুমিষ্ট করে তোলা যেতেই পারে। দিনের শেষে মানুষের বিবেচনায় স্থায়ী হবে যে, সেই সরকারই সেরা সরকার যে সেরা শাসন (সুশাসন) প্রতিষ্ঠা করতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো আওয়ামী লীগ কি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারছে? কাকেই বা বলে সুশাসন? আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক সংগঠন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নামের মহিমা জড়িয়ে আছে দলটির সাথে। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে এ দেশের লক্ষ কোটি স্বাধীনতাপ্রেমী মানুষের হূদয়ের মণিকোঠায় ঠাঁই পেয়েছে এই দল। এর প্রতি মানুষের ভালবাসা বেশি; এর কাছে মানুষের প্রত্যাশাও বেশি; প্রাপ্তিও বেশি; অপ্রাপ্তির বেদনা-সঞ্জাত অভিমানও বেশি। আওয়ামী লীগের বিশেষ কৃতিত্বকেও অনেক সময় অবশ্য কর্তব্য বলে বিবেচনা করা হয় আর সাময়িক অসাফল্যকে ক্ষমাহীন ব্যর্থতা ভাবা হয়। তবুও বলি, সকল সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েই, আওয়ামী লীগের বিকল্প আওয়ামী লীগই। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করেছে একমাত্র আওয়ামী লীগই, পরাশক্তির অনীহা অগ্রাহ্য করে একজনের মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর করে নতুন ইতিহাস রচনা করেছে শেখ হাসিনার সরকার। মুক্তিযুদ্ধ যাদের প্রত্যক্ষ ত্যাগ ও তিতীক্ষার ফসল তাদের কাছে আওয়ামী লীগের এই যুদ্ধাপরাধী বিরোধী ভূমিকার গুরুত্ব অপরিসীম। এছাড়াও গত পাঁচ বছরে মহাজোট সরকারের অন্যান্য সাফল্যের পাল্লাও কম ভারী নয়। শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, বিদ্যুতায়ন, নারীর ক্ষমতায়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের সাক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু সকল অর্জন ম্লান হতে বসে যখন দেখি ক্ষমতার লালসায় উন্মত্ত গডফাদারদের উত্থান। মানুষের জীবন নিয়ে তাদের হোলি খেলা। যে কোনো মূল্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একজনও যদি প্রতিকারহীন বোবা কান্নায় বুক ভাষায়, অবশ্যই সরকার তার দায়ভাগ এড়াতে পারে না। আর তা এড়ানো যাবে না বলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। স্বাধীনতা-উত্তর বেয়াল্লিশ বছরে বিভিন্ন দলের, মতের, কাঠামোর সরকার এসেছে— গণতান্ত্রিক সরকার, স্বৈরতান্ত্রিক সরকার, সামরিক সরকার, তত্ত্বাবধায়ক সরকারসহ বিভিন্ন নিয়মতান্ত্রিক ও অনিয়মতান্ত্রিক সরকার— কিন্তু কিছু মাত্রাগত তারতম্য ছাড়া সুশাসনের অবস্থা থেকেছে তথৈবচ। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে সরকারকে জবাবদিহিমূলক হতে হবে। স্বচ্ছ হতে হবে। সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া জনগণের কাছে বোধগম্য এবং অনুসরণযোগ্য হতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। স্থানীয় সরকারকে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়সমূহের সার্বিক দায় গ্রহণ করতে হবে। সরকারকে দক্ষ, দায়িত্বশীল, কার্যকর ও অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। সুশাসন বলতে অবশ্য সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং সেই প্রক্রিয়া যথাযথভাবে বাস্তবায়ন কিংবা বর্জনের প্রক্রিয়ার যোগফলকে বোঝায়। সুশাসন দুর্নীতির মাত্রা কমিয়ে আনে, সংখ্যালঘু শ্রেণীর মতামতকে গ্রাহ্য করে, তাদের ক্ষমতায়িত করে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত করে। সুশাসন সবার জন্যে সর্বোচ্চ আইনী সুরক্ষার বন্দোবস্ত করে। আওয়ামী লীগের সামনে আজ অগ্নিপরীক্ষা। রাজনীতির বিশ্বকাপে না হলেও রাজনীতির জাতীয় কাপ চ্যাম্পিয়নশিপে আওয়ামী লীগ ফুটবল খেলছে। আর সে খেলাতে শুধু গোল করলেই বিজয়ী হওয়া যায় না। নিরন্তর ক্রীড়াশৈলী দেখিয়ে দর্শকদের মন জয় করতে হয়। দর্শকরাও আবার ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার দর্শকদের মতো বিভাজিত। প্রতিপক্ষকে সহজেই কৃতিত্ব দিতে চাইবে না। তবে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ফুটবল যদি নয়নাভিরাম হয়, সারা পৃথিবীর দর্শক যদি বাহবা দিতে থাকে, তবে বিভক্ত দেশি দর্শকেরাও হয়তো একদিন বলতে বাধ্য হবে— নাহ্ চমত্কার খেলে আওয়ামী লীগ। এই চমত্কার খেলার অর্থ সর্বোতভাবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। আর সে সুশাসনের ফল ভোগ করবে প্রেসিডেন্ট থেকে প্যাডলার পর্যন্ত সবাই। এতে সাফল্য সরকারকে ঘিরে সকল প্রশ্নের নিরব উত্তর। আর ব্যর্থ হলে, অনেক কিছুই ব্যর্থ হবে। লেখক:রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইংরেজির অধ্যাপক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন