আইনপ্রণেতার সড়ক অবরোধ

আপডেট : ০১ জুলাই ২০১৪, ২১:৩০
কত বিচিত্র ঘটনাই না ঘটে এই দেশে। রক্ষক ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। আইন যাহারা তৈরি করেন তাহারা নিজেরাই আইনের তোয়াক্কা করেন না। আর বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া এইসব দেখিতে দেখিতে জনসাধারণের সহ্যশক্তি এতোটাই বাড়িয়া গিয়াছে যে, এখন সহজে তাহারা বিস্মিত বা বিচলিত হন না। তবে গত রবিবার রাজধানীর প্রবীণ একজন আইনপ্রণেতা যাহা করিয়াছেন তাহাতে জনগণের সেই অটল ধৈর্যের প্রাচীরও ভাঙিয়া পড়িবার উপক্রম হইয়াছে। একে তো সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস, তদুপরি পবিত্র রমজানের শুরুর দিন হিসাবে তারাবিহ্-এর নামাজ ছাড়াও প্রস্তুতির একটা ব্যাপারও ছিল। সকলেরই তাড়া ছিল দ্রুত ঘরে ফিরিবার। কিন্তু অফিস শেষে ঘরে ফিরিবার পথে দুঃসহ যানজটে আটকা পড়িয়া অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হইতে হয় মিরপুরগামী শত শত নারী-পুরুষকে। দুর্ভোগের কারণ অনুসন্ধান করিতে গিয়া ভুক্তভোগীরা জানিতে পারেন যে, কোনোপ্রকার পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই স্থানীয় সংসদ সদস্য তাহার সমর্থকদের লইয়া নিজেই সড়ক অবরোধ করিয়া রাখিয়াছেন। আর কর্মব্যস্ত সময়ে যেই সড়কটি তিনি অবরোধ করিয়াছেন, সেই মিরপুর ১০ নম্বর গোলচক্করে চতুর্মুখী গাড়ির চাপে এমনিতেই গভীর রাত্রি অবধি যানজট লাগিয়া থাকে। জনপ্রতিনিধির কাজ তো জনদুর্ভোগ লাঘব করা। এতোকাল আমরা সেই কথাই জানিয়া আসিয়াছি। গত কয়েকদিনের তীব্র যানজটে এমনিতেই যে জনগণের প্রাণ ওষ্ঠাগত—তাহা সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের অজানা থাকিবার কথা নহে। তাহার পরও তিনি তাহাতে ঘৃতাহুতি করিয়া জনগণকে অধিকতর দুর্ভোগের মুখে ঠেলিয়া দিলেন কেন—তাহা আমরা বুঝিতে অক্ষম। অবশ্য ইহা লইয়া তিনি মোটেও ভাবিত নহেন। বরং কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করিয়া তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়াছেন যে, আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যে তাহাদের প্রত্যাহার করা না হইলে সমগ্র মিরপুর অচল করিয়া দেওয়া হইবে। কী এমন ঘটিয়াছে যে ক্ষমতাসীন দলের প্রবীণ একজন আইনপ্রণেতাকে নিজের হাতে আইন তুলিয়া লইতে হইবে? সংশ্লিষ্ট আইনপ্রণেতার অভিযোগ হইল, পুলিশ তাহার নির্মিত কয়েকটি তোরণ ভাঙিয়া ফেলিয়াছে। যানজটকবলিত এই মহানগরের ব্যস্ত সড়কের উপর যথেচ্ছ তোরণ নির্মাণ কতোখানি যৌক্তিক, সেই প্রশ্ন যদি নাও তোলা হয়—এই প্রশ্ন এড়াইয়া যাওয়া কঠিন যে, পুলিশ যদি সত্য সত্যই কোনো অপরাধ করিয়া থাকে তাহার জন্য তো প্রশাসন আছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আছেন, আছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। একজন দায়িত্বশীল আইনপ্রণেতা হিসাবে সেই আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করিয়া তিনি যাহা করিয়াছেন তাহা কি আইনের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন নহে? পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার জানাইয়াছেন যে, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে তাহার অনুমতিক্রমে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য মিরপুর, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, ভাষানটেক ও কচুক্ষেত এলাকায় ১২টি তোরণ নির্মাণ করিয়াছিলেন। শর্ত ছিল যে ২৫ জুনের মধ্যে স্বউদ্যোগে তিনি তাহা সরাইয়া ফেলিবেন। কিন্তু নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হইবার পর বারংবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও তিনি তাহা আমলে নেন নাই। অথচ সড়কের উপর অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত তোরণগুলি শুধু যে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল তাহাই নহে, যানজটেরও কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। তাই জননিরাপত্তা ও যানজট লাঘবের স্বার্থে পুলিশ নিজেই উদ্যোগী হইয়া কয়েকটি তোরণ অপসারণ করিয়াছে। পুলিশ যেই কাজটি করিয়াছে তাহা তাহাদের দায়িত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশও বটে। ইহার পরও পুলিশের আচরণে যদি কোনোপ্রকার বাড়াবাড়ি ঘটিয়া থাকে—তাহার আইনানুগ প্রতিকারের পথ আইনপ্রণেতা হিসাবে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের অজানা থাকিবার কথা নহে। দুর্ভাগ্যজনক হইলেও সত্য যে, আইন-কানুনের প্রতি তোয়াক্কা না করাই যেন এখন নৈমিত্তিক চিত্র হইয়া দাঁড়াইয়াছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে যে, ক্ষমতাসীন দলের কোনো কোনো সদস্য অতীতের মতো ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও অসদাচরণের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হইয়াছেন। এমতাবস্থায় যতো সদিচ্ছাই থাকুক—সরকারপ্রধানের একার পক্ষে উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করা যে কতোটা কঠিন তাহা সহজেই অনুমেয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন