বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা অনিয়ম ও শিক্ষার মান নিয়া আমরা বরাবরই সোচ্চার। আবার ইহার বিকাশের ব্যাপারেও যথেষ্ট আশাবাদী। গবেষণা প্রতিষ্ঠান টিআইবি গত সোমবার এই সংক্রান্ত যে প্রতিবেদন তুলিয়া ধরিয়াছে, তাহার বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যায় না। এই ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন ও শিক্ষার্থীর সার্টিফিকেট প্রদানে বাণিজ্যের বিষয়টি বাংলাদেশের সার্বিক দুর্নীতি ও অনিয়মেরই প্রতিফলন মাত্র। অর্থাত্ আমরা বলিতে চাই, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি আমাদের সমাজ হইতে বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নহে। একইভাবে কোনো ব্যাপারে ঢালাও কোনো মন্তব্য করা সমীচীন নয়। টিআইবি ২০১২ সালের জুন হইতে ২০১৪ সালের মে পর্যন্ত নির্বাচিত ২২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রণয়ন করিয়াছে। অথচ বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে মোট ৭৯টি। তবে ইহাই কি সামগ্রিক চিত্র? এমন প্রশ্নও কোনো কোনো মহল হইতে উঠিতে পারে।
বাংলাদেশে নব্বই দশকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। সে সময় বেশিরভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল সেশনজটে জর্জরিত। ছিল সন্ত্রাস কবলিত ও রাজনৈতিক অস্থিরতার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। ইহার কারণে অনেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ব্যাপারে অসন্তোষ প্রকাশ করিতে শুরু করেন। তাহাছাড়া দেশে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়া যাওয়ার কারণে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর চাপ ক্রমাগতভাবে বাড়িতেছিল। প্রতি বত্সর ভর্তি পরীক্ষায় ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাইতেছিল অপ্রত্যাশিত হারে। তাহাছাড়া সরকার প্রতি বত্সর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বৃদ্ধি করিতে গিয়া হিমশিম খাইতেছিল। এই প্রেক্ষিতে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করিয়া পরিকল্পনা ও নীতিমালায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনকে উত্সাহিত করা হয়। সেই অনুযায়ী বর্তমানে ৭৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়িয়া উঠিয়াছে। ইহাকে আমরা সকল অর্থেই ইতিবাচক মনে করি। এখন যাহারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইবার সুযোগ পাইতেছে না, তাহারা আর হতাশ হইয়া বসিয়া থাকিতেছে না। তাহাদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ভরসাস্থল হইয়া উঠিয়াছে এই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি। এমনকি ইহার কারণে উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশ গমনের হারও কমিয়া গিয়াছে। ইহাতে আমাদের জাতীয় অর্থের সাশ্রয় হইতেছে। এই সাফল্য অর্জনকে কোনোভাবেই অবহেলা ও অবজ্ঞা করার কোনো অবকাশ নাই।
তবে যে হারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাড়িয়াছে, সেই হারে সরকারি তদারকি ও নজরদারি বাড়ে নাই। এই জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের যে জনবল ও ক্ষমতা বৃদ্ধি করা দরকার ছিল, সেদিকেও আমরা মনোযোগ দিই নাই বা দিতে পারি নাই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হইবার এক যুগের মধ্যে স্থায়ী সনদ গ্রহণের নিয়ম আছে। কিন্তু দেখা যাইতেছে যে, এই পর্যন্ত মাত্র দুইটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সকল শর্ত পূরণ করিয়া এই ধরনের সনদ গ্রহণ করিতে সক্ষম হইয়াছে। অনেকে এখনও স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়িয়া তুলিতে পারে নাই। এসব সমস্যা এবং নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও এই দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রা অব্যাহত আছে বলিয়াই প্রতীয়মান হয়। উন্নত বিশ্বের দেশগুলিতে এমনকি সারাবিশ্বে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাই বেশি। অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজসহ পৃথিবীর অধিকাংশ বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় আসলে বেসরকারি। স্বাধীন ও স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপনাই তাহাদের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। তাই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় অধিক হারে বিকশিত হইবে ইহাই প্রত্যাশিত।
যেকোন কিছুর প্রচলনের শুরুতে নানা সমস্যা, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা দেখা দেওয়াটা অস্বাভাবিক নহে। এখন এসব সমস্যা নিয়া গভীরভাবে ভাবিতে হইবে এবং গ্রহণ করিতে হইবে কার্যকর পদক্ষেপ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যথাযথ অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ সৃষ্টি, স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ, দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ ইত্যাদি ব্যাপারে এখন মনিটরিং বাড়াইতে হইবে। সুধীজন ও শিক্ষাবিদদের সুচিন্তিত মতামত লইয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উত্তরোত্তর উন্নয়ন ও মান বৃদ্ধিতে নিরন্তর কাজ করিয়া যাইতে হইবে। এই মুহূর্তে এই ব্যাপারে একেবারে হতাশ না হইয়া বরং আশাবাদী হওয়াটাই বেশি জরুরি বলিয়া আমরা মনে করি।
