ঝরিয়া পড়াদের জন্য আনন্দ স্কুল

আপডেট : ০২ জুলাই ২০১৪, ২১:০২
যে সকল হতদরিদ্র ছেলেমেয়ে প্রাইমারি স্কুলের চৌকাঠ পার হইবার আগেই ঝরিয়া পড়িয়াছে, কিংবা যাহাদের কোনো স্কুলে কখনোই যাওয়া হয় নাই, তাহাদের জন্য বিশ্বব্যাংক নিয়া আসিয়াছে স্কুল অব জয় প্রকল্প। বাংলায় এই স্কুলের নাম আনন্দ বিদ্যালয়। নাম শুনিলেই মন ভরিয়া যায়। বিশ্বব্যাংক এই প্রকল্প শুরু করিয়াছে ২০০৪ সালে। দেখিতে দেখিতে দশ বত্সর চলিয়া গিয়াছে। এই এক দশককালের মধ্যে আনন্দ স্কুলের যেমন কিছু সাফল্য রহিয়াছে, তেমনই কম নাই নিরানন্দ সন্দেশও। বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে আনন্দ স্কুল পরিচালিত হইলেও দেখভাল করিয়া থাকে বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা বিভাগ। আর স্কুলসমূহ পরিচালনা করে কোনো না কোনো এনজিও। আনন্দ স্কুল পরিচালনা কমিটির প্রধান ব্যক্তিটি প্রায় সকল ক্ষেত্রেই একজন মহিলা। এই দিক দিয়াও আনন্দ স্কুল বিশেষ বৈশিষ্ট্যের দাবি রাখে। দশ বত্সর আগে আনন্দ স্কুল প্রোগ্রাম চালুর পিছনে যে কারণসমূহ দেখান হইয়াছিল, তাহা মোটেও উপেক্ষা করিবার মত নহে। বিশ্ব ব্যাংকের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০০৪ সালে বাংলাদেশে প্রাইমারি স্কুলের বাহিরে ছিল প্রায় ১৫ লাখ শিশু। পাঠশালায় যাওয়ার বয়স হওয়া সত্ত্বেও তাহারা স্কুলে যাইবার সুযোগ পায় নাই। আবার অনেক ছেলেমেয়ে ধারেকাছের কোনো স্কুলে কিছুদিন যাওয়া-আসা করিয়া ঝরিয়া পড়ে। দেশে প্রচলিত সরকারি প্রাইমারি স্কুলসমূহ ঝরিয়া পড়া কিংবা স্কুলের বাহিরে থাকা ওই শিশুদের পাঠে প্রত্যাবর্তন করাইতে পারে না। উল্লেখ্য, সরকারি প্রাইমারি স্কুলে দশ বত্সর আগের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ২ কোটি শিশু আনুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করে। কিন্তু রিচ আউট অব স্কুল ছেলে-মেয়েদের জন্য সেই আনুষ্ঠানিক সরকারি শিক্ষা কার্যক্রম যথেষ্ট নহে, আকর্ষণীয়ও নহে। কাজেই আনন্দ স্কুল প্রোগ্রাম। শিশু শিক্ষার্থীদের আনন্দ দিবার জন্য আনন্দ স্কুল প্রকল্পের আয়োজনও নেহায়েত কম নয়। আনন্দ স্কুল নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি স্কুলে সর্বাধিক ৩৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হইয়া থাকে। প্রত্যেক শিক্ষার্থী মাসিক ১০০ টাকা স্টাইপেন্ড পাইয়া থাকে। শিক্ষা উপকরণ ও পোশাক বাবদ পাইয়া থাকে বার্ষিক ৫২০ টাকা। টিচারের মাস মাহিনা ৩ হাজার টাকা। তবে যে এলাকায় আনন্দ স্কুল স্থাপিত হইবে সেখানে কমপক্ষে ২৫ জন ঝরিয়া পড়া ছেলেমেয়ে থাকিতে হইবে। কাগুজে হিসাব অনুযায়ী ২০০৫ হইতে ২০১২ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সারাদেশে ছড়াইয়া থাকা ২৩০০০ আনন্দ স্কুল হইতে ৭,৯০০০০ ছেলেমেয়ে প্রাইমারি পাস করিয়া বাহির হইয়াছে। এদের প্রায় অর্ধেকই মেয়ে শিক্ষার্থী। নিঃসন্দেহে এই হিসাবটি উত্সাহব্যঞ্জক। কিন্তু মুদ্রার উল্টা পিঠের চিত্রটি কিন্তু মোটেও প্রীতিপ্রদ নয়। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে দেশের নানা স্থানে আনন্দ স্কুল হইয়াছে শুধু বরাদ্দের টাকা আত্মসাত্ করিবার জন্য। এমন বহু অভিযোগ ইতিপূর্বে পত্রপত্রিকায় ছাপা হইয়াছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় ঝরিয়া পড়া শিশুদের জন্য ৫/৬টি স্কুলই যেখানে যথেষ্ট হইতে পারে সেখানে এরই মধ্যে ৩০টি স্থাপিত হইয়াছে। প্রক্রিয়াধীন আছে আরও ১৩০টি। আমাদের বক্তব্য, আনন্দ স্কুলের মত একটি ভাল উদ্যোগকে অনিয়ম দ্বারা কলুষিত করা মোটেও সমর্থনযোগ্য নয়। আনন্দ স্কুলগুলি ঠিকমত চলিতেছে কিনা, তাহা নিয়মিত তদারক করা একান্ত কর্তব্য। মনে রাখা দরকার যে, একালে দেশে খুব কম উপজেলাই আছে, যেখানে গ্রামে গ্রামে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নাই। অনেকক্ষেত্রে সরকারি স্কুলগুলি ঠিকমত চলিতে পারে না শিক্ষক সংকট এবং বিবিধ সমস্যার কারণে। অপ্রয়োজনে আনন্দ স্কুল স্থাপনের পরিবর্তে সরকারি প্রাইমারি স্কুলের মানোন্নয়ন এবং লেখাপড়ার পরিবেশ উন্নয়নে মনোযোগী হইলে বেশি সুফল পাওয়া যাইবে। বিষয়টির প্রতি আমরা সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন