নারায়ণগঞ্জের রেল সড়কের পার্শ্ববর্তী একটি গ্রাম। এই গ্রামের সূর্যের আড়াআড়ি গড়ে ওঠা একটি বাড়ির বাসিন্দা স্বামী পরিত্যক্তা জয়গুন। জয়গুনের ছেলে কাশু ও মেয়ে মায়মুনাকে নিয়ে দুঃখ-কষ্টের সংসার। সে এক দুর্ভিক্ষের বছর। জয়গুন ট্রেনে চড়ে ময়মনসিংহ যায় এবং চাল এনে তা বিক্রী করে সংসার চালায়।
জয়গুনকে গ্রামের মানুষ ভালো চোখে দেখে না। দু’একজন তাকে উপদ্রব করে। নানাভাবে নিপীড়ন চালায়। রাতে ঘরের চালে ঢিল মেরে ভয় দেখায়। প্রলোভন দেখিয়ে স্বার্থ উদ্ধার করতে চায়। কিন্তু জয়গুন সাহসী, সংগ্রামী ও প্রতিবাদী এক নারী। এতো নির্যাতন ও শোষণের মধ্যে ভিটে-বাড়ি ত্যাগ করতে চায় না। কিন্তু পুরুষশাসিত সমাজে তাকে অপকৌশলের কাছে হার মানতে হয়। একসময় ছেলেমেয়েদের নিয়ে তাকে বাড়ি ছাড়তে হয় এবং আশ্রয় খুঁজতে হয়। ওপরের এই গল্পটি বাংলা কথা-সাহিত্যের দিকপাল আবু ইসহাকের রচিত অমর গ্রন্থ সূর্যদীঘল বাড়ীর। সূর্যদীঘল বাড়ির কাহিনী ছায়াছবিতে রূপ দেয়া হলে ব্লাউজহীন শরীরে জয়গুনের চরিত্রে অভিনয় করেন ডলি ইব্রাহীম। এই একটিমাত্র ছায়াছবিতে অভিনয় করে ১৯৭৯ সালে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর সম্মান লাভ করেন। অবশ্য পরবর্তীকালে শর্টফিল্ম দহন ও হুলিয়ায়ও তিনি অভিনয় করেন।
একবার ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির মানববন্ধনের সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমি সূর্যদীঘল বাড়ীর প্রণেতা আবু ইসহাক ভাইকে প্রশ্ন করেছিলাম—জয়গুনের অভিনয় আপনার কেমন লেগেছে? উত্তরে তিনি বলেছিলেন— সূর্যদীঘল বাড়ীর জয়গুনের পরিপূর্ণতা দিয়েছে ডলি। কিন্তু ওর ৩ জুলাইয়ের মর্মান্তিক দুঃসংবাদে আমি কেঁদেছি। ডলি তার জীবনেও ছিলো দুঃখের এক পাথর-প্রতিমা এবং সূর্যদীঘল বাড়ীর আমার স্বপ্নকন্যা জয়গুন।
ডলির মা-বাবার দেয়া নাম পিয়ারা ইব্রাহিম। তবে ডলি নামেই সুপরিচিত। ১৯৪৮ সালের পয়লা জুলাই ডলি যশোরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম এবং মায়ের নাম ড. নীলিমা ইব্রাহিম। ডলি পড়াশোনা করেছেন বরিশাল, খুলনা এবং ঢাকার বাংলাবাজার গার্লস হাইস্কুল, পুরানা পল্টন কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কৈশোর থেকেই তার সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ জন্মে এবং অভিনয় করার জন্য ১৩ বছর বয়সে (১৯৬১) রঙ্গম নাট্যগোষ্ঠীতে যোগ দেন এবং চরিত্রহীন নাটকে অভিনয় করেন। বেতারে প্রচারিত প্রথম নাটকে অংশগ্রহণ করেন ১৯৬৩ সালে আর পিটিভির প্রথম রবিবারের নাটকে ১৯৬৫ সালে। একাত্তরের পূর্বেই ডলি বেতার ও টিভিতে অভিনয় করে একজন অসাধারণ শিল্পীর মর্যাদা লাভ করেন। শুধু তাই নয়, চরিত্রহীন ছাড়া কঙ্কাল, দুয়ে দুয়ে চার, চিঠি রোজ রোজ ও জোনাকি জ্বলে নাটকে অভিনয় করেন। তার ধারাবাহিক নাটকগুলো হলো—সোনার শেকল, সুখের অপর নাম, আর এক বসন্ত, সূর্যাস্তের সমুদ্র অনেক দূর, বকুলতলা কতদূর ইত্যাদি। অভিনয়ের জন্য তিনি চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির পুরস্কার ও ফটোগ্রাফিতে জাতিসংঘের ইউনেস্কো পুরস্কার লাভ করেন ১৯৮৭ সালে। ডলি ‘সাতদিন’ নামে একটি সাপ্তাহিকীও সম্পাদনা করেন।
ডলি নামের এই মহান শিল্পী নতুন প্রজন্মের কাছে প্রায় অপরিচিত। বছরের ১ ও ৩ জুলাই তার জন্ম-মৃত্যু দিবস হলেও কেউই তার জন্য একটি পঙক্তি লেখেন না কিংবা কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় না। আমাদের শিল্পী সমাজে তাকে নিয়ে আছে ভ্রান্ত ধারণা। অবশ্য এই ভ্রান্ত ধারণা নিরসনে পাক্ষিক অনন্যা তৃতীয় বর্ষের ২০ সংখ্যাটি একটি স্মরণ সংখ্যা হিসেবে প্রকাশ করে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিল। ডলি ফেরেস্তা ছিলো না, ছিলো আমাদের সমাজের একজন সচেতন ও সংগ্রামী নারী। জীবন ও জগেক তিনি আপন আলোয় দেখতে চেয়েছিলেন। আর মানুষকে বিশ্বাস করেছিলেন মনে-প্রাণে। কিন্তু বার বার তার বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা করেছে তথাকথিত সমাজের কুিসত লোকগুলো। ১১টি বছরের মধ্যে তার একমাত্র পুত্র পার্থকে ১টি বারের জন্যও দেখা দিতে দেয়া হয়নি।
ডলি এমএ শেষপর্বে আমাদের সহপাঠী ছিলেন। তিনি ক্লাসে আসতেন কম এবং আমাদের কারো সঙ্গেই তিনি কথা বলতেন না ও মিশতেন না। তখন তাকে ভীষণ অহঙ্কারী ও দেমাগী মনে হতো। তবে মিতা, ড. মারুফী খান রক্সী ও অভিনেত্রী রুবিনার সঙ্গে তার ভীষণ সখ্যতা ছিলো। আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গনে তিনি তখন একজন ডাঁকসাইটে শিল্পী। অহঙ্কারী হওয়াটাই স্বাভাবিক।
আমাদের দুর্ভাগ্য, ডলি আমার ছোটবোন আলেয়ার মতো আত্মহননে নিজের গন্তব্য বেছে নিয়েছিলেন।
আত্মহননের পূর্বে তিনি একটি চিরকূটে লিখেছিলেন ‘জীবন খুব সুন্দর’। অথচ সুন্দর জীবনের জন্য তিনি নিজেকে উত্সর্গিত করেছিলেন সংসার, নাট্যাভিনয় ও চলচ্চিত্র জগতে। আমরা তাঁকে বারবার ঠকিয়েছি। কিন্তু জয়গুনরা কখনো ঠকে না। দুঃখের পাথর প্রতিমা হয়ে বিদ্রোহী সত্তা প্রকাশ করে।
লেখক : শিশু সাহিত্যিক ও সাংবাদিক
