বাজেট পাসের আগে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদসহ সরকার দলীয়, বিরোধী দলীয় ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা ৫৬ ঘণ্টা আলোচনা করেন। সংসদ সচিবালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই আলোচনার প্রায় ৭০ শতাংশ জুড়ে ছিল রাজনৈতিক বক্তব্য। আবার এই ৭০ শতাংশের সিংহভাগ বক্তব্য ছিল জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া এবং তাদের দুই পুত্র তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো তথা বিএনপিকেন্দ্রিক। রাজনৈতিক প্রসঙ্গের বাইরে বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের বক্তব্যে যে বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছিল তা হল, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ব্যাংকিং খাতে ঘটে যাওয়া কেলেঙ্কারি।
বাজেট আলোচনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আর্থিক খাতে কেলেঙ্কারির বিষয়ে আলোচকদের বক্তব্যের সারমর্ম ছিল, শেয়ারবাজার, সোনালী ব্যাংকে হলমার্ক ঋণ কেলেঙ্কারি, বিসিমল্লাহ, ডেসটিনি এবং জনতা ও বেসিক ব্যাংকে ঘটে যাওয়া কেলেঙ্কারির ঘটনা। বিষয়টি তুলে ধরে সব বক্তাই এজন্য সরকারকে, বিশেষত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতকে দুষেছেন। এসব কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে সরকার ‘ব্যর্থ’ হয়েছে অভিযোগ তুলে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন এসব সদস্য। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির ঘটনা তদন্তে খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদকে প্রধান করে গঠিত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ না করায়ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এরসঙ্গে সম্প্রতি সুইস ব্যাংকে টাকা পাচারকারীদের বিষয়টিও উঠে এসেছে তাদের বক্তব্যে। কারা এই টাকার মালিক, সেই তালিকা প্রকাশের পাশাপাশি ওই টাকা ফেরত এনে দেশের উন্নয়ন খাতে ব্যয়ের পরামর্শ দিয়েছে সংসদ সদস্যরা।
তাদের এই অভিযোগ বা বক্তব্য অস্বীকার করেননি অর্থমন্ত্রীও। তিনিও দ্বিধাহীন কণ্ঠে স্বীকার করে বলেছেন, ‘একথা সত্য যে, আর্থিক খাতে কেলেঙ্কারির ঘটনাগুলোতে দোষীদের বিরুদ্ধে আমরা যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারিনি। এবারের অর্থবছরে সরকার এসব বিষয়ে তীক্ষ নজর রাখবে।’ অবশ্য মুহিত এ-ও বলেছেন, ‘ব্যাংক খাতে মাঝে-মধ্যে এরকম ঘটে থাকে। বেসিক ও সোনালী ব্যাংকে কিছু জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এ সরকার এসব জালিয়াতির বিরুদ্ধে যে ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে, তা অতীতের কোনো সরকার চিন্তাও করেনি।’
রবিবার ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট পাসের দিন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ব্যাংক ও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ চাইলে কয়েকজন সংসদ সদস্য এর বিরোধিতা করেন। এর বিপক্ষে তারা ছাঁটাই প্রস্তাব দেন। তীব্র বিরোধিতা করেন স্বতন্ত্র দুই সংসদ সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী ও তাহ্জীব আলম সিদ্দিকী (ঝিনাইদহ-২)। জাতীয় পার্টির (জাপা) নূরুল ইসলাম মিলনও (কুমিল্লা-৮) ছাঁটাই প্রস্তাব দেন।
ছাঁটাই প্রস্তাব এনে তাহ্জীব আলম সিদ্দিকী বলেছেন, বেসিক ব্যাংকে ব্যাপক জালিয়াতি হল। পর্ষদ ভেঙ্গে দেয়ার প্রস্তাব করা হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এর আগে সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারির বিষয়েও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনটি পর্যন্ত জনসম্মুখে প্রকাশ করা হলো না। বরং সরকার ব্যাংকগুলোতে রি-ক্যাপিটালাইজেশন করেছে। জনগণের করের টাকা সরকার ব্যাংকগুলোকে দিয়েছে। এভাবে চলতে পারে না। এসব কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। নাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারি ঘটার আশঙ্কা থেকে যাবে। তিনি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে বাজেটে বরাদ্দ ৭২২ কোটি টাকা ছাঁটাই করে তা জনগণের স্বাস্থ্য উন্নয়ন খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব দেন। অবশ্য তার এই প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়।
আগেরদিন শনিবার বাজেট আলোচনায় ব্যাংক খাতের কেলেঙ্কারি নিয়ে কথা বলেন বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ। তিনি বলেছেন, শেয়ারবাজার, হলমার্ক, ডেসটিনি ও বিসিমল্লাহ গ্রুপসহ এসব কেলেঙ্কারি কেন ঘটল? ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে, শেয়ারবাজারে ধস নামলো। ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থা নেই। ব্যাংকে এখন টাকা রাখাও নিরাপদ নয়। অর্থমন্ত্রীর কাছে জানতে চাই, কেন এমন অবস্থা হল? একসময় মানুষ মাটির নীচে টাকা রাখতো। তাহলে তো এখনও সেই অবস্থা ফিরে আসছে, মানুষ কী মাটির নীচে টাকা পুঁতে রাখবে? অর্থমন্ত্রী ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর দু’জনই দক্ষ, অভিজ্ঞ ও সত্। এরপরেও এই ধরনের ঘটনা ঘটল কেন?
এর আগেরদিন জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদও বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ব্যাংক লুট হচ্ছে। লুটেরারা বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শেয়ারবাজার থেকে যারা হাজার-হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে তাদের বিচার হলো না। অর্থমন্ত্রী বলছেন, তাদের হাত অনেক লম্বা। জানতে চাই- কত লম্বা? তাদের হাত কী সরকার, প্রশাসন ও আইনের চেয়েও লম্বা? অনেকে অর্থ পাচার করে আমেরিকা, কানাডা, মালয়েশিয়ায় বাড়ি করছেন। এরা এতো টাকা কোথায় পেল?
বাজেট পাসের দিন স্বতন্ত্র সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী ছাঁটাই প্রস্তাব এনে বলেন, রাষ্ট্রব্যবস্থার চাবিকাঠি হল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। কিন্তু হলমার্ক, বেসিক, বিসিমল্লাহ গ্রুপসহ আর্থিক কেলেঙ্কারির মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে খোসা বানিয়ে ফেলা হয়েছে। শেয়ার বাজার লুটপাট হয়ে গেল, ডেসটিনি টাকা নিয়ে গেল, সুইস ব্যাংকে টাকা চলে গেল। সরকার কিছুই করল না। সরকারের ছত্রছায়া ছাড়া এসব ঘটনা ঘটতে পারে না। শুধু বিরোধী দল বা স্বতন্ত্র সদস্যরাই নন, বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে খোদ সরকারি দল আওয়ামী লীগের কোনো কোনো সংসদ সদস্যই বিদায়ী অর্থবছরে ব্যাংক খাতে কেলেঙ্কারির ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
