জলাবদ্ধতা বন্দরনগরী চট্টগ্রামের একটি দুর্বিষহ সমস্যা। বিপুলসংখ্যক লোকের অবর্ণনীয় ভোগান্তির কারণে এটাকে নাগরিক জীবনের একটি মারাত্মক ব্যাধি হিসেবে উল্লেখ করা যায়। বৃষ্টির পানিতে প্রতি বছর এ সময়ে বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়ে। অনেক এলাকায় যানবাহনের পরিবর্তে নৌকা চলাচল করে। অসংখ্য ঘর-বাড়ি, দোকানপাটে পানি ঢুকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্ভোগের কারণ হয়। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থবির হয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের, শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত করে তোলে। লাখ লাখ মানুষের ভোগান্তি যাকে বলা যায় Beggars description অর্থাত্ বর্ণনাতীত।
এই যে একটা দুরবস্থা তা চট্টগ্রামে প্রতিবছর কতোটা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে থাকে তা সরকার অবশ্যই জানেন। সে জন্যেই যখন-তখন বলা হয় তা সমাধানে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এই ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গে এযাবত্কালের প্রত্যেকটি সরকার রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণগুলো হচ্ছে—খাল ও নালা-নর্দমা দখল হয়ে যাওয়া। নগরজুড়ে অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং অপরিকল্পিতভাবে ভবন নির্মাণ। আমাদের সকলের মনে একই প্রশ্ন—সরকার কি উল্লেখিত প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করার ক্ষমতা বা যোগ্যতা রাখেন না? নিশ্চয়ই এমন কোনো অসুবিধে আছে যা পুরাপুরি জেনেও সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে না। সে অসুবিধে কী?
চট্টগ্রামের মানুষ দীর্ঘদিন যাবত্ জলাবদ্ধতা ও পাহাড় ধসের নির্মম পরিণতি অবলোকন করে আসলেও চট্টগ্রাম নগর প্রশাসন, উন্নয়ন ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো এ দুর্যোগ থেকে মুক্তি দেয়ার কোনো বাস্তবসম্মত উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। বরং গঙ্গা আর তিস্তা বাঁধের ন্যায় এ নিয়ে রাজনীতি করা হয়েছে এবং এখনও তাই করা হচ্ছে বলে মনে হয়। চট্টগ্রামের মানুষ মনে করছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন-এর মেয়র আন্তরিক হলে এবং যথাযথ ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করলে চার বছর পর এসে নগরবাসীকে হতাশা প্রকাশ করতে হতো না। সত্যি আমারও তাই মনে হয়। তিনি কি এ ব্যাপারে আন্তরিক অথবা অসহায়?
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম সিটি করপরেশন এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নগরবাসীকে জলাবদ্ধতাজনিত দুঃসহ কষ্ট থেকে রেহাই দিতে এখনো কোনো আন্তরিক উদ্যোগ নেয়নি। অথচ একমাত্র জলাবদ্ধতাজনিত দুর্ভোগ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে গত মেয়র নির্বাচনে জনগণ বর্তমান মেয়রকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করে। কিন্তু গত চার বছরে কিঞ্চিত্ সুফলও আসেনি। কেন মেয়র এ ব্যাপারে এমন ব্যর্থ তা একটা যৌক্তিক জিজ্ঞাসা। চউক চেয়ারম্যান চট্টগ্রামে উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দেয়ার কথা উচ্চকণ্ঠে বললেও নগরীর রাস্তা-ঘাটের বেহাল দশার অবসান ও জলাবদ্ধতা নিরসনে কি কি কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছেন তা স্পষ্ট নয়। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেও নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। মনে হয়, কথিত উন্নয়নের জোয়ারে প্রতিবছর প্লাবিত হচ্ছে চট্টগ্রাম শহরের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ও প্রধান বন্দর নগরীর এমন দুঃসহ অবস্থা চিন্তা করতেও কষ্ট লাগে। আশা করি সরকার অনতিবিলম্বে এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। পরিস্থিতি এখন সকল অর্থে দুর্বিষহ।
একটানা বর্ষণে সমপ্রতি বন্দরনগরী চট্টগ্রামের অধিকাংশ এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টিতে পানি জমে ডুবে গেছে নগরের অনেক রাস্তাঘাট। প্রায় সব রাস্তায় হাঁটুপানি। কিছু কিছু এলাকা কোমর পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় বাসা-বাড়ির নিচতলা ও দোকানে পানি ঢুকে গেছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাওয়া এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে নগরীর হামজারবাগ, বহদ্দারহাট, নাসিরাবাদ, ষোলশহর, চকবাজার, পাঁচলাইশ, ডিসি রোড, চান্দগাঁও, দেওয়ানবাজার, ডবলমুরিং, আগ্রাবাদ, হালিশহরসহ আরো অনেক নিম্নাঞ্চল। প্রবল বর্ষণে নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে গিয়ে জনসাধারণের ঘরের আসবাবপত্র ও গৃহস্থালিসামগ্রীর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বহু দোকানপাট ও গুদামে রক্ষিত পণ্যসামগ্রী ভিজে গেছে। এই পরিস্থিতির জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন দায় এড়াতে পারে না।
সিডিএ’র অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং সিটি কর্পোরেশনের এলাকার খালগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কার না করা এবং নালা-নর্দমার ময়লা অপসারণে ব্যর্থতাই এই দুর্দশার প্রধান কারণ। উল্লেখ্য, নগরে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন হওয়ার জন্য মূল খাল রয়েছে ১৬টি। কিন্তু এই ১৬টি খালের সবকটির অধিকাংশ ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ বেদখল হয়ে গেছে। এ ছাড়া এসব খাল সময়মতো সংস্কার ও খনন করা হয়নি। কিছু কিছু খালের মাটি তোলা হলেও তা রাখা হয়েছিল পাড়ে। পরে বৃষ্টির পানিতে ওই মাটি আবার খালে পড়ে। নগরীতে ফ্লাইওভার নির্মাণের কারণে এমনিতেই বহু নালা-নর্দমা খাল ভরাট হয়ে গেছে, তার উপর সংস্কার নেই পুরনো খাল ও নালার। পানি ধারণক্ষম বহু পুকুর ভরাট করে দালানকোঠা ও দোকানপাট গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি সরতে পারছে না। সহজে পানি সরে যাওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় ভারি বৃষ্টিতে হঠাত্ এমন জনদুর্দশার সৃষ্টি হয়েছে। এক তথ্যে জানা যায়, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন জলাবদ্ধতা নিরসনে চার বছরে ব্যয় করেছে ১৪৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা। কিন্তু জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয় করা হলেও এর সুফল পাচ্ছে না নগরবাসী।
এদিকে প্রতি বর্ষায় অল্প বৃষ্টিতে নগরীর অধিকাংশ এলাকা তলিয়ে যায়। আশংকা করা হচ্ছে লাগাতার বর্ষণ শুরু হলে চট্টগ্রাম মহানগর জলাবদ্ধতাজনিত প্লাবনের শিকার হবে। পানি সরে যাওয়ার পথগুলো বাধামুক্ত না করার কারণে সামান্য বর্ষণেও নগরে প্লাবন নেমে আসবে। ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি নাগরিক জীবনে নেমে আসবে দুঃসহ যন্ত্রণা। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তাদের দায় এড়াতে পারে না মোটেও।
চট্টগ্রাম সড়ক ও অবকাঠামোর দিক দিয়ে উন্নয়নে বেশ এগিয়ে গেলেও জলাবদ্ধতা ও বার বার পাহাড় ধসের কারণে ওসব অর্জন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। বর্ষা মৌসুম চট্টগ্রাম মহানগরীর জনগোষ্ঠির জন্য এক মহাদুর্ভোগের কাল হিসেবে আবির্ভূত হয়। কারণ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নগরবাসীকে জলাবদ্ধতার দুঃসহ কষ্ট থেকে রেহাই দিতে এখনও কোন কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। তাছাড়া লক্ষ্য করা গেছে এই দুই সেবাদানকারী সংস্থার কিছু তত্পরতা জলাবদ্ধতাকে দীর্ঘস্থায়ী করছে। আমরা মনে করি, জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব কোন্ বিভাগের বা কার তা না ভেবে বরং চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করে নগরীর সকল কর্তৃপক্ষকে সমন্বিত উপায়ে কাজ করতে হবে। নগরবাসী এ দুর্বিষহ অবস্থা থেকে যথাশীঘ্র মুক্তি চায়।
লেখক :হূদরোগ বিশেষজ্ঞ ও প্রাবন্ধিক
ইমেইল: [email protected]
