যত্রতত্র রাস্তা পারাপার

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০১৪, ২০:৫৮
দৃশ্যটি দেখিলে আতঙ্কিত হইতে হয়। অথচ লোমহর্ষক এই দৃশ্যই রাজধানীর নৈমিত্তিক চিত্র হইয়া দাঁড়াইয়াছে দীর্ঘদিন যাবত্। পাশেই ফুটওভার ব্রিজ প্রায় শূন্য পড়িয়া আছে। কিন্তু চলন্ত যানবাহনে ঠাসা রাস্তার মাঝখান দিয়া হাঁটিয়া-দৌড়াইয়া ব্যস্ত সড়ক পারাপার করিতেছে অসংখ্য মানুষ। ক্ষেত্রবিশেষে কাঁটাতারের বেড়া দিয়াও তাহাদের ঠেকাইয়া রাখা যাইতেছে না। প্রত্যন্ত গ্রাম হইতে আগত—নগরের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে অসচেতন ব্যক্তি কিংবা অসুস্থ ও বয়োবৃদ্ধদের ক্ষেত্রে বিষয়টি সহানুভূতির চোখে দেখা যাইত। এমন কথাও বলা যাইত যে, দায়িত্বরত পুলিশেরই কর্তব্য হইল তাহাদিগকে হাত ধরিয়া রাস্তা পার করিয়া দেওয়া। কিন্তু কোনোকিছুর তোয়াক্কা না করিয়া প্রতিনিয়ত যাহারা এইভাবে রাস্তা পারাপার করিতেছেন তাহাদের মধ্যে নগরবাসী সচেতন তরুণ-যুবক এবং সক্ষম মানুষের সংখ্যাই বেশি। ইহাতে শুধু যে যানজটকবলিত রাজধানীর যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হইতেছে তাহাই নহে, বরং প্রাণঘাতী দুর্ঘটনাও ঘটিতেছে প্রায়শ। আর সেই দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া নির্বিচারে গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সড়ক অবরোধের মতো অনভিপ্রেত ঘটনাও রাজধানীবাসীর নিকট কোনো আকস্মিক বিষয় নহে। এই একবিংশ শতাব্দীতে কর্মব্যস্ত আধুনিক কোনো মহানগরে এমন দৃশ্য প্রায় অকল্পনীয় হইলেও সবই ঘটিতেছে ট্রাফিক পুলিশ, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকদের নাকের ডগায়। অথচ এই ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট আইনও রহিয়াছে। কিন্তু তাহার প্রয়োগ ছিল না। ছিল না নাগরিকদের সচেতন করিবার ন্যূনতম কোনো উদ্যোগও। অবশেষে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)-এর ট্রাফিক বিভাগ এই ব্যাপারে সুসংবাদ শুনাইয়াছেন। বলা হইয়াছে যে, এইবার তাহারা কঠোর হইবেন। ফুটওভার ব্রিজ বা আন্ডারপাস থাকা সত্ত্বেও যাহারা যত্রতত্র যথেচ্ছভাবে রাস্তা পারাপার করিবেন তাহাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে। বিদ্যমান ডিএমপি অধ্যাদেশ অনুযায়ী রাস্তায় দাঁড় করাইয়া রাখা, জরিমানা আদায় করা কিংবা একদিনের হাজতবাসের বিধান রহিয়াছে। অবশ্য ডিএমপির ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা জানাইয়াছেন যে, প্রথমে তাহারা নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে সচেতন করিবার চেষ্টা করিবেন। তাহাতে কাজ না হইলে কঠোর হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকিবে না। কেহই অকারণ কঠোরতা সমর্থন করেন না। তবে ইহা কঠোরতা বা কোমলতার বিষয় নহে। নিয়ম-নীতি ও শৃঙ্খলার প্রশ্নে আপস চলে না। আইন বা নিয়ম থাকিলে তাহা অবশ্যই মানিয়া চলিতে হইবে। প্রশাসনের দায়িত্ব হইল, সংশ্লিষ্ট সকলেই যেন নিয়ম মানিয়া চলেন—তাহার নিশ্চয়তা বিধান করা। সেইটি নানাভাবে করা যায়। নিয়ম-কানুন কেবল কাগজে লিপিবদ্ধ থাকিলেই চলে না, জনসাধারণকে সম্যকভাবে তাহা জানানোরও প্রয়োজন রহিয়াছে। কিন্তু সেই ধরনের উদ্যোগ যে দৃশ্যমান নহে—তাহাও সুবিদিত। এই ক্ষেত্রে জনসচেতনতা যেমন জরুরি, তেমনি আইন প্রয়োগের ব্যাপারে শৈথিল্য প্রদর্শনেরও কোনো অবকাশ নাই। সর্বোপরি, রমজান আসিয়াছে বলিয়াই যে মহানগরগুলিতে যানবাহন চলাচল ও রাস্তা পারাপারে নিয়ম-শৃঙ্খলার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করিতে হইবে এমন নহে, বরং ইহা একটি সার্বক্ষণিক দায়িত্ব। সারা বত্সরই এই ধরনের তত্পরতা অব্যাহত রাখিতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে যে, জাতিগত উন্নয়নে শৃঙ্খলার কোনো বিকল্প নাই। আর শৃঙ্খলা ছাড়া ঢাকার মতো জনবহুল এবং দ্রুত বর্ধিষ্ণু একটি মহানগরকে সচল রাখা সম্ভব নহে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন