ইরাক কি ভাঙিয়া যাইবে

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০১৪, ২০:৫৯
ধর্মীয় উগ্রবাদীদিগের শক্তিমত্তার দৌরাত্ম্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দস্তুরমত ছত্রখান হইয়া পড়িলেও ক্ষমতার কলহে লিপ্ত হইয়া আছে ইরাকের রাজনীতিকেরা। শাসনকার্য পরিচালনা কর্তৃপক্ষের এহেন কর্মকাণ্ডের পরিণতিতে ইরাক শেষাবধি ইরাক হিসাবে টিকিয়া থাকিতে পারে কিনা তাহা লইয়া ইতোমধ্যে ব্যাপক সন্দেহের বিস্তার ঘটিয়াছে বিশ্লেষক মহলে। সুন্নী উগ্রবাদীদিগের সামরিক সাফল্য ও শিয়াদিগের পালটা আঘাতের প্রস্তুতির বদৌলতে যুদ্ধ-আক্রান্ত দেশটির পরিস্থিতি গত কিছুদিন ধরিয়া সঙ্গীন হইয়া উঠিয়াছে। আহত-নিহত-বাস্তুচ্যুতের সংখ্যা বাড়িয়াই চলিয়াছে। এমতাবস্থায় যাহা একান্ত প্রয়োজন, তাহা হইতেছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের শুভবোধ ও বিচক্ষণ ভূমিকা। কিন্তু এইগুলি যেন ইরাকের জন্য সোনার পাথর বাটি। নিতান্ত সামপ্রদায়িক স্বার্থে মগ্ন থাকিয়া ইরাকের প্রত্যেকটি সমপ্রদায়ের রাজনীতিকবৃন্দ রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিবার প্রতিযোগিতাতে নামিয়া পড়িয়াছে। গত মঙ্গলবার ইহার আরেক দফা প্রমাণ দেখা গেল। জাতীয় জীবনের ক্রান্তিলগ্নে মঙ্গলবার পার্লামেন্ট অধিবেশন বসিয়াছিল ইরাকে। সাধারণ ইরাকীরা ভাবিয়াছিলেন আইন সভাতে বসিয়া শিয়া, সুন্নি ও কুর্দী নেতারা বুঝি কোন না কোন একটি বোঝাপড়াতে উপনীত হইতে সচেষ্ট হইবেন; ভাঙিয়া পড়িবার উপক্রম হওয়া দেশকে ফিরাইয়া আনিবার পথ খুঁজিবেন। নতুন নেতৃত্ব বাছিয়া লইবার দায়িত্বও আইনসভার হাতেই ন্যস্ত ছিল। কিন্তু কিসের কি? অধিবেশন শুরু হইতে না হইতেই সকল পক্ষ হৈ-হট্টগোল বাধাইয়া দিলেন। পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষোদগার, হুমকি, তাড়িয়া যাওয়া, পার্লামেন্ট কক্ষ ত্যাগ করিয়া যাইবার মত সকল ঘটনাই ঘটিল। পরিণতি যাহা হইবার তাহাই হইল। পার্লামেন্ট অধিবেশন পণ্ড হইয়া গেল। সন্দেহের অবকাশ নাই যে, পার্লামেন্ট অধিবেশন পণ্ড হইবার ঘটনা চলমান সহিংসায় নতুন করিয়া ইন্ধন জোগান দিয়াছে। সংখ্যাগুরু শিয়া সম্প্রদায়ের নূরী আল মালিকী তৃতীয়বারের মত প্রধানমন্ত্রী হইতে পারাটাকেই বড় করিয়া দেখিতেছেন। এইদিকে সুন্নিরা মালিকী তথা সুন্নিদের দিকেই যাবতীয় অভিযোগের অঙুলি তুলিয়া ধরিতেছে। কুর্দীরা স্বাধীন ভূখণ্ড পাইবার জন্য সঙ্কটকালীন সময়টিকেই বাছিয়া লইয়াছে। ইরাক ইতিমধ্যেই বাস্তবে খণ্ডিত হইয়া পড়িয়াছে বলিয়া দাবি করিতে শুরু করিয়াছে কুর্দী নেতৃত্ব। স্পষ্ট যে, ইরাকের জাতীয় সংহতি ধসিয়া পড়িয়াছে। প্রথামাফিক সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া সমপ্রদায় হইতে প্রধানমন্ত্রী এবং সুন্নি ও কুর্দীদের মধ্য হইতে যথাক্রমে পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হইবার কথা ছিল এইবারের অধিবেশনে। এই পদগুলির ব্যাপারে শান্তিপূর্ণ সমাধান হইলে অন্যান্য অশান্তির দিকগুলিতেও শান্তির বাতাবরণ নির্মিত হইবার ক্ষীণ আশা ছিল। এখন কী হইবে? অস্ত্রের ঝনঝনানি অনেকদিন ধরিয়াই চলিতেছে ইরাকে। নতুন করিয়া সকল পক্ষই অস্ত্রে শান দিতেও শুরু করিয়াছে। ক্ষমতাসীন শিয়া নেতৃত্বের ব্যাপারে সংখ্যালঘু সুন্নি ও কুর্দী রাজনীতিকদিগের আস্থাহীনতা চূড়ান্ত। এই আস্থাহীনতা যে একেবারে ভিত্তিহীন তাহা বলা যাইবে না। আবার সুন্নি ও কুর্দী নেতৃত্ব যেইভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া সমপ্রদায়ের নেতৃত্বকে মাটিতে গাড়িয়া ফেলিতে চাহিতেছে তাহাও অশান্তি বৃদ্ধির পথ ব্যতীত অন্য কিছুই নির্দেশ করে না। বিশ্ব শক্তিগুলি ইতিমধ্যে দ্রুত একটি সমঝোতায় পৌঁছিবার জন্য ইরাকের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানাইয়াছেন। কিন্তু সেই আহ্বান কাহারও কর্ণকুহরে প্রবেশ করিয়াছে বলিয়া মালুম হইতেছে না। অবশ্য এই আহ্বানের নানামুখী সমীকরণ লইয়াও নানামুখী কথাবার্তা হইতেছে। সাধারণ ইরাকীরা অবশ্য ইতিমধ্যে বুঝিয়া ফেলিয়াছে যে, আরেক দফা বৃহত্ দুর্যোগ সমাসন্ন। তাহারা যে যেমন করিয়া পারে জীবন বাঁচাইবার জন্য দৌড়ঝাঁপ করিয়া চলিতেছে। শাসনকারী এলিট কিংবা সরকারবিরোধী এলিটেরা এইদিকে এতটুকু দৃষ্টি দিতেছে না; তাহারা ক্ষমতার রফায় মত্ত। যেই দেশে রাজনীতিকের এহেন চরিত্র, সেই দেশের জনগণকে যে অশেষ দুঃখ ভোগ করিতে হয় তাহা সহজেই অনুমেয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন