অন্যদৃষ্টি

আহার সংস্কৃতি

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০১৪, ২১:০০
খাওয়া অনিবার্য প্রাকৃতিক ব্যাপার নিঃসন্দেহে। তবে একই সঙ্গে তা সংস্কৃতিরও অংশ। সেই সংস্কৃতিকে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো কোথায় নিয়ে গেছে তা খানিকটা আঁচ করা যায় ইফতারের জন্য নির্মিত রান্নার অনুষ্ঠানগুলোর রঙে রঙিন খেল খেলানি দেখলে। এক চ্যানেল যদি রান্নার জন্য তাদের রন্ধন শিল্পীকে সাহারা মরুভূমিতে পাঠান তো আরেক চ্যানেল দলেবলে চলে যায় এ্যান্টার্কটিকায়। হায় ! রান্নার জন্য সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগর পর্যন্ত কোথায় না যান তারা ! বুঝি না সাহারা মরুভূমি কি আরব সাগর সব পরিবেশ-ই রান্না বান্ধব, সমস্যা কি তবে বাংলাদেশের মাটি ! (কেন? বাংালাদেশের মাটিতে কি চুলা জ্বালানো খুবই অসম্ভব? সেই সাগর-মহাসাগরের মধ্যে চুলা জ্বালিয়ে যে বিচিত্র গেট আপ ও মেক-আপে তারা রান্না করেন তাতে ধন্ধ লেগে যায় চোখে ঠিক দেখছি কিনা। আরব্য রজনীর রূপকথার পাতা থেকে উঠে আসা বাদশাহ জাদিরা বুঝি বা ওই গেট আপে রন্ধনশালা পরিদর্শনে যেতেন (অবশ্য তারা ও তল্লাটে যেতেন কিনা, সেও এক প্রশ্ন)। চারদিকের শান শওকত আর এলাহি কাণ্ড-কারখানার মধ্যে যে রেসিপিটি অভাগা দর্শকের সামনে প্রদর্শিত হয়, ভাবি, আদৌ সেই খাবারটি আমাদের আহার সংস্কৃতির সঙ্গে যায় কিনা। অবশ্য গ্লোবাল সংস্কৃতির এই যুগে ক্ষমতাধররা তো তাদের খাবার কে সেরা মান ধার্য করে সব্বাইকে ম্যাকডোনাল্ড আর কার্বোনেট পানীয় খাওয়াচ্ছে ঘাড় ধরে। চীনারা জ্যান্ত ফড়িং ভেজে খায় অনেকটা আমাদের চিংড়ির মতো। সেদিন হয়ত সুদূর নয় যেদিন আমাদের রন্ধন শিল্পীরা চিংড়ির সাথে গাইবে ফড়িংয়েরও জয়। সৈয়দ মুজতবা আলী ফ্রান্সে গিয়ে বিলিতী মাস্টার্ডের পরিবর্তে বাংলাদেশী কাঁসুন্দী দিতে বলায় ওয়েটার তাঁর মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়েছিলো। ‘রন্ধন যজ্ঞ’ প্রবন্ধে মুজতবা আলী লিখেছিলেন ‘কেউ কেউ আমাকে গাইয়া ভাবতেই পারে, তা ভাবুক, তবু বলব কখন তেতো খেতে হয় আর কখন টক এ বিদ্যা বাঙালির চেয়ে আর কে ভালো জানে? ভাগ্যিস মুজতবা আলীর এই আহার সংস্কৃতির প্রতি শ্রেষ্ঠত্ব বোধ বিশ শতকের। একুশ শতকে নিজের সংস্কৃতির প্রতি দুর্বলতা—ঘোরতর জাতীয়তাবাদী অপবাদ পায়। শত্রু শিবিরের নিকবাজরা ঝাঁকে ঝাঁকে মাইনাস রেটিং করে গালির চূড়ান্ত রূপ দেখায়। ব্লগ মিডিয়ার নিকবাজরা নির্বিচার গালাগালির পন্থাকে ক্ল্যাসিক মানে নিয়ে যায়। বলা হয় স্ট্যালিনের আমলে তাঁর হাত নাকি, খোদার থেকেও লম্বা ছিলো। এখন নিকওয়ালাদের। যাই হোক আহারের সংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণে গণমাধ্যমের এসব খেল উত্তরোত্তর বেড়েই চলবে। আর আমরা যারা গণমাধ্যমের সাদামাটা মধ্যবিত্ত ভোক্তা, আমরা পর্দার এপাশ থেকে আন্তর্জাতিক রন্ধন শিল্পের রথী-মহারথীদের রান্নার বিবিধ ফ্রেজিং দেখে মজমার আড়াল থেকে বাচ্চালোগ তালিয়া বাজাই!! ভাবি, আহার সংস্কৃতির জাতীয়তাবাদের অধ্যায়ও শেষ হতে চললো। শুরু হলো কর্পোরেট আহারের হেজিমনির দিন। আবার কারো কারো মতে এটাই নাকি শাইনিং বাংলাদেশ। এই শাইনিং বাংলাদেশের মানে হলো বস্তির ড্রাগ সাপ্লায়ারের কোটিপতি হবার স্বপ্ন। বিশ্বায়নের এই সংস্কৃতির নির্মাণের শুরুটা থেকে সাবঅল্টার্ন প্রণোদনার শেষমেষ সে হয়ে উঠতে চায় এলিটিস্ট। টেলিভিশনের এই পুঁজিতান্ত্রিক সংস্কৃতির অতি দ্রুতমান প্রসারের পেছনে কি রয়েছে এর লগ্নিকারকদের সুনির্দিষ্ট কোন উদ্দেশ্য আদর্শ? নিশ্চয়ই। মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণ এখন নয়া পুঁজিপতিদের হাতে। আদর্শিক এজেন্ডা থেকে তারা আমাদেরকে নিয়ে যেতে চান ফ্যান্টাসির জগতে। ফিস সস, ডার্ক সসসহ হাজারটা সসের কাহিনী ছাড়া যে রান্নাবান্না অচল, ক্যাপসিকাম, সিমলা মরিচ আর মনো সোডিয়াম ছাড়া ডাইনিং আঁধার এই স্ট্যান্ডাইজেশন তারা পণ্য মোহগ্রস্ত মধ্যবিত্তের মগজে সেট করে দিতে চান। আপাত ভিন্নতা দেখিয়ে একই বড়ি তারা বারবার গেলান আর নাগরিক রুচির দুর্দান্ত লড়াইয়ে হেরে যায় আমার পিঠাপুলি, আর খইমুড়ি। ফার্স্টফুড কিংবা জাঙ্কফুড কালচারের মোহের জগতে প্রবেশ করে এখন আমাদের পঁচিশ বছরের কম বয়সের তরুণ-তরুণীরা আক্রান্ত হচ্ছে স্থূলতায়। যুক্ত হচ্ছে উচ্চ রক্তচাপসহ চর্বিযুক্ত খাবারের বিপজ্জনক ঝুঁকিপূর্ণ রোগে। কফিশপগুলোতে দেখবেন কানে হেডফোন গুঁজে খাওয়ার মতো ভাবনা আদান-প্রদান সাংস্কৃতিক আবহকে দিব্যি বদলে ফেলেছে। খাওয়া মানে এখন পারিবারিক আবহে গল্পগুজবের সঙ্গে মিষ্টি খুনসুটি নয়। খাওয়া মানে ল্যাপটপের সামনে একটা স্ট্যাটাস ‘হাই গাইস...। নৃ বিজ্ঞানী লেডি স্ট্রইসের মতে খাদ্য শুধু খাওয়ার বিষয় নয়, ভাবনারও। তবে সেটি ভাবনার প্রান্ত ধরে যে কথাটি প্রথমেই মনকে তাড়িত করে সেটা এই যে, আমাদের দেশে একদল অতিরিক্ত খেয়ে খাবারকে রীতিমতো মুনতাসীর ফ্যান্টাসির পর্যায়ে নিয়ে গেছে। খাল বিল নদী নালা পাহার, পর্বত বনভূমি সবই তাদের খাদ্য। অন্যদল রীতি তো ক্ষুধার্ত- আমৃত্যু। এই অমীমাংসিত সংকটের কি কোনো দিন নিষ্পত্তি হবে? লেখক :কথাসাহিত্যিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন