‘দাদার কীর্তিতে’ ভারতজুড়ে নিন্দা

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০১৪, ২১:১৫
‘আমি কলকাতার মাল নই। চন্দননগরের মাল। প্রচুর মস্তানি করেছি। একটা কেউ বিরোধী যদি মস্তানি করতে আসে, আমাদের ছেলেদের ঢুকিয়ে ‘রেপ’ করে দেব। তাপস পাল নিজের রিভলবার বের করে গুলি করে মারবে।’ দাপুটে মস্তানের ভঙ্গিতে এসব বলেছেন অভিনেতা-সাংসদ তাপস পাল, নদীয়ার নাকাশিপাড়ায়, চৌমাহা গ্রামে। দলীয় সাংসদের কীর্তিতে মহাসচিব, উচ্চশিক্ষা দপ্তরের মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় টেলিভিশনের পর্দায় তাপস পালের সচিত্র দেহভঙ্গি আর হুমকি দেখার কয়েকঘণ্টার মধ্যেই তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘ঘোরতর অন্যায়। দল তার কৈফিয়ত তলব করবে।’ বিপদ আঁচ করে একান্ত বাধ্য, অনুগত জনসেবকের মতো, চিঠি লিখে ক্ষমা প্রার্থনার আদলে তাপস বলেছেন, কুকথা বলে আমি আমার ভোটারদের, রাজ্যবাসীদের, আমার রাজনৈতিক সহকর্মী ও বন্ধুদের সকলকে ছোট করে দিয়েছি। ছোট করেছি আমার দল তৃণমূল কংগ্রেসকে। ছোট করেছি আমার স্ত্রী-সন্তানসহ গোটা পরিবারকে। আমার মাকে বাবাকে। এদের সবার কাছে ক্ষমা চাইছি। বিশেষ করে নারী সমাজের কাছে। আমার কোনো অজুহাত নেই, অত্যন্ত অবিবেচকের মতো কাজ করেছি। ঘোরতর অসংবেদনশীলতার পরিচয় দিয়েছি। যা করেছি, তা উচিত হয়নি। কথা দিচ্ছি, ভবিষ্যতে আর কখনো এরকম ঘটবে না। আবার বলছি, আমি নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থী। কিন্তু অবাক কাণ্ড, বিনম্র আত্মসমালোচনার ভাষার, এক চিঠিতেই ঠান্ডা হয়ে গেল তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব। মুখ খুললেন নেত্রী আর মুখ্যমন্ত্রী মমতা। বললেন, তাপস যা করেছে তাকে ভুল বলা যায় না। ও একটা ব্লান্ডার করেছে। পাশাপাশি ঝাঁঝালো মন্তব্যও করেছেন, আমি কি ওকে মারব, খুন করব? তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের কৌশলী অবস্থান তাপস পালকে কতটা বাঁচাতে পারবে, বলা মুশকিল। কারণ এক, অভিনেতা সাংসদের বিরুদ্ধে রাজ্য কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, তার রিপোর্ট চেয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দপ্তর। দুই. রাজ্যের ভেতরে ও বাইরে তাকে অবিলম্বে গ্রেফতার, সাংসদ পদ থেকে বহিষ্কার ও তার পদত্যাগের দাবি উঠেছে। তিন, বিভিন্ন নারী সংগঠন প্রতিবাদে রাস্তায় নামছে। চার. জাতীয় মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন মমতা শর্মা, উস্কানিমূলক মন্তব্য ও আচরণের অভিযোগ তুলে সাংসদ অভিনেতার গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন। পাঁচ. বিজেপির সর্বভারতীয় মুখপাত্র, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শাহনাওয়াজ হুসেন প্রশ্ন তুলেছেন, এরকম দুর্ভাগ্যজনক মন্তব্যের পরও কেন মমতাদিদি নিশ্চুপ (যদি ও মমতা একেবারেই চুপ নয়। ১ জুলাই রায়দিঘিতে প্রশাসনিক বৈঠক শেষে তাপসের নাম না করেই ধিক্কার জানিয়েছেন)। ছয়. বিজেপির সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি মুখতার আব্বাস নকভি বাংলার মুখ্যমন্ত্রীকে সরাসরি আক্রমণ করে বলেছেন, ওর ঔদ্ধত্যই এই ধরনের আচরণকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। সাত, রাজ্য কংগ্রেসও বসে নেই। ১ জুলাই ঘটনাটি নিয়ে বিধানসভায় তাদের মূলতবি প্রস্তাব খারিজ হয়ে গেলে ওয়াকআউট করলেন কংগ্রেসের বিধায়কেরা। আট. বিরোধীদল নেতা (সিপিএম) সূর্যকান্ত মিশ্র বলেছেন, রাজ্যজুড়ে থানায় থানায় এফআইআর করা হচ্ছে। আন্দোলনে রাস্তায় নামছে মহিলাদের বিভিন্ন সংগঠন। তারা জাতীয় মহিলা কমিশনের দ্বারস্থ হচ্ছেন। সংসদেও বিষয়টা নিয়ে লোকসভার অধ্যক্ষের দ্বারস্থ হচ্ছে সিপিএম। দশ. সবচেয়ে বড়ো কথা, সমাজের শুভবুদ্ধি আর বিবেক বলে যারা পরিচিত, যে কোনো অপ্রীতিকর, ভয়ঙ্কর ঘটনায় যারা কখনো চুপ করে, হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকেন না তাদেরই বড়ো অংশ কবি শঙ্খ ঘোষ থেকে নবনীতা দেব সেন সবাই প্রতিবাদের স্বরে স্বর মিলিয়ে আজ সাংসদের ওই মস্তানি আর উস্কানির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। ব্যক্তির নয়, ভয়ঙ্করের পা গুঁড়িয়ে দিতে তারা দৃঢ় প্রতিজ্ঞও। তার মানে তাপসের নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার পরও অবিরাম বর্ষণ থামছে না। এই তো লেখাটি যখন লিখছি, তখনই টিভি জুড়ে ঝড় বইছে ,বাইরে প্রবল বৃষ্টি। জনপ্রিয় অভিনেতা আর সাংসদের মস্তানমার্কা দেহভঙ্গি আর উস্কানিমূলক মন্তব্য নিয়ে পরিশীলিত, প্রতিবাদমুখর, সৃষ্টিশীল বুদ্ধিমানেরা কে কী বললেন—তা একটু বিশদভাবে বলা জরুরি। কারণ সমাজ দাবি করছে ঔদ্ধত্যহীন মনোভাব। দাবি করছে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সংযত আচরণ। তার সার্বিক অভিপ্রায় ক্ষমতামত্ততা, আচরণ, নারী নিষ্পেষণের হুমকিও বিস্তারে অবসান ঘটুক অবিলম্বে। কবি শঙ্খ ঘোষ তার সহজাত দৃঢ় সংযত উচ্চারণে বলেছেন, তাপস পালের ভয়ঙ্কর কথাটায় তো প্রমাণ হয় যে, তার অনুগত এমন সব ছেলে আছে, যাদের দিয়ে ইচ্ছে করলেই ‘রেপ’ করানো যায়। এর চেয়ে বিপজ্জনক আর কী হতে পারে? শুধু সাংসদ নয়, যে কোনো মানুষের মুখেই এমন কথা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই মুহূর্তে এর বিচার দরকার। প্রবীণ চিত্রপরিচালক তরুণ মজুমদার সংক্ষিপ্ত বয়ানে জানালেন, যার যেমন রুচি। সে তেমন কথা বলে। আমি ওই মন্তব্যে অত্যন্ত আহতবোধ করছি। কবি-কথাসাহিত্যিক নবনীতা দেব সেনের কণ্ঠস্বরে ঝরে পড়ল আক্রমণাত্মক প্রতিবাদ, খলনায়কের ভাষায় কথা বলেছেন সাংসদ। একজন জনপ্রতিনিধি খুন, ধর্ষণের অধিকার দিচ্ছেন। এটা মেনে নিলে মমতার সরকার শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস হারাবে। তাপস পালকে শাস্তি দিলে একটা দৃষ্টান্ত তৈরি হবে। তাপসের এই আচরণ বাংলার সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ বলে মনে করছি। গত দু’দিনে সাধারণ থেকে অসাধারণ এমন কাউকে আমরা খুঁজে পাইনি, যারা তাপস পালের নিন্দা করেননি বা তার হয়ে সাফাই গাইছেন। তৃণমূল বিরোধী রাজনীতিক ও সামাজিকদের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম, যারা তার দলের সমর্থক—তারাও প্রকাশ্যে বা ফিসফিস করে বলতে শুরু করেছেন, এই আচরণ ঘৃণ্য, শাস্তিযোগ্য। তার মানে গোটা সমাজ চমকে উঠেছে। বিপন্নবোধ করছে। আবার তাদেরই সরব অংশ রাজনৈতিক দাদাগিরির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে এসব অনাচারের মৃত্যু দাবি করেছে। তাপস পালের সৌভাগ্য, তাঁর অভব্য আচরণের খবরটি একটু দেরিতে চাউর হয়েছে। সম্ভবত ভোটের ঠিক পরেই কৃষ্ণনগরের নাকাশিপাড়ার হরিহর গ্রামে খুন হন তৃণমূল কর্মী আসাদুল মন্ডল। ১৪ কিংবা ১৫ জুন তাঁর স্মরণসভায় যোগ দিতে যান তাপস। ম্যাটাডোরে ওই সভায় আসার পথে, চৌমাহা গ্রামে পথ দুর্ঘটনায় কয়েকজন কর্মী সমর্থক আহত হন। খবর পেয়েই স্মরণসভা ছেড়ে ঝড়ো আবেগ নিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান সাংসদ-অভিনেতা। অতর্কিত উত্তেজনা তাঁকে ঘিরে ধরে। চারপাশে জনতার ভিড়। মাঝখানে মঞ্চের মতো উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি হুমকি দিয়ে উল্লিখিত অশালীন মন্তব্য করতে থাকেন। একবারও ভাবলেন না, দুর্ঘটনার সঙ্গে বিরোধী রাজনীতির সম্পর্ক কোথায়? তিনি যখন উস্কানিমূলক বক্তব্য পেশ করছিলেন, তখনই কেউ কেউ মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় তাঁর বয়ানচিত্র, তাঁর দেহভঙ্গি বন্দী করে রাখে। এটি সংবাদ মাধ্যমের হাতে আসে ৩০ জুন। আর সেদিনই এক চ্যানেল থেকে আরেক চ্যানেলে ‘দাদার কীর্তি’ সিনেমার প্রধান নায়কের নতুন কীর্তিটি ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন ১ জুলাই, ওই ঘটনার, ওই উস্কানির আরও একটি ভিডিও ফুটেজ নাকি সংবাদ মাধ্যমের হাতে আসে। এতেও দেখা গেছে, উত্তেজিত তাপস বলছেন —‘উদোম কেলান কেলাব আমি বলে রাখছি। আমি একটা মাল ছেলে কিন্তু। ... স্ট্রেটওয়ে বলে যাচ্ছি সবার সামনে, টাঙ্গি দিয়ে মাথা অর্ধেক করে দিয়ে যাব। আমিও ছ’টা গুলি চালাব আমার রিভলবার থেকে। কারো বাবার যদি ক্ষমতা থাকে আমাকে আটকে দেখাবে সে।’ দ্বিতীয় ভিডিও ফুটেজটি দেখিনি। খবরের কাগজে সংবাদ পড়েছি। প্রশ্ন উঠছে, তাপস হুমকি দিয়েছেন ১৪ কিংবা ১৫ জুন। আর তা সংবাদ মাধ্যমের হাতে এলো দু’সপ্তাহ পরে। কৃষ্ণনগরের নাকাশিপাড়া থেকে কলকাতার দূরত্ব তো বড়জোর চার ঘণ্টার। ক্যামেরাবন্দি ছবি আর বয়ান পৌঁছতে ১৫ দিন লেগে গেল? কেন জানি কিন্তু কিন্তু সংশয় উঁকি দিচ্ছে। পেছনে কোনো অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র নেই তো? হ্যাঁ তাপস যা বলেছেন, তার স্বীকার করেছেন নিজেই। তাঁর দলের লোকেরাও অস্বীকার করেননি। ক্যামেরাবন্দি ছবি আর বয়ান আমরাও দেখেছি। মনে হয়েছে নির্ভুল। তবু প্রশ্ন কিছু ছাড়ছে না। আবেগপ্রবণ সাংসদকে, বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় নায়ককে ফাঁদে ফেলার এটি কোনো ষড়যন্ত্র নয়তো? এ প্রশ্ন তোলার কারণ, উনি সাংসদের পথ থেকে চাপে পড়ে ইস্তফা দিলেই শূন্য হবে একটি আসন। আর সেটি দখল করতে হামলে পড়বে আর্যাবর্তের রাজনীতির অবিভাজিত শক্তি! মনে রাখতে হবে, তাপস পাল পর-পর সংসদে কৃষ্ণনগর থেকেই নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর দলের রাজনীতি ভীষণ আগ্রাসী। তাদের তীক্ষ্ন নজর এখন বাংলা আর আসামে। লেখক:ভারতীয় সাংবাদিক, আরম্ভ পত্রিকার সম্পাদক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন