স্থানীয় নাম ; কদম
বৈজ্ঞানিক নাম: Anthocephalus indicus
অন্যান্য নাম : নীপ, বৃত্তপুষ্প, মেঘাগমপ্রিয়, কর্ণপূরক, ভৃঙ্গবল্লভ, মঞ্জুকেশিনী, পুলকি, সর্ষপ, প্রাবৃষ্য, ললনাপ্রিয়, সুরভি, সিন্ধুপুষ্প
কদমের বর্ণনা
কদম গাছকে সংস্কৃতে কদম্ব বলে। কদম মানে হলো বিরহকে দুঃখিত করে। গ্রামাঞ্চলে কবি গানে— প্রাণ সখিরে/ওই শোন কদম তলায় বংশী বাজায় কে’- এ যেন অতি সুমধুর পরিচিত সুর। মধ্যযুগে পুরো বৈষ্ণব সাহিত্য রাধা-কৃষ্ণের বিরহ- বেদনা মোহিত হতো কদমের সুরভিতে। এখনও লোকসঙ্গীতে তা বিদ্যমান। বাংলাদেশ, ভারতের উষ্ণ অঞ্চল, চীন, মালয় কদমের আদি নিবাস।
রূপসী গাছের মধ্যে কদম অন্যতম । কদম দীর্ঘাকৃতি, বহুশাখাবিশিষ্ট বিশাল বৃক্ষ বিশেষ। এ গাছ প্রায় ১০ মিটার দীর্ঘ এবং পরিধিতে ১.৫ থেকে ২ মিটার খাড়া কাণ্ডবিশিষ্ট হয়ে থাকে। কদম তিন রকমের-নামধারা কদম, ধূলিকদম ও ভূমিকদম। ধূলিকদম ফুল কিছুটা ছোট, গাছও সামান্য ছোট হয়। এর আরেক নাম কেলিকদম্ব। ভূমিকদম্ব এক প্রকার ঝাড়বিশিষ্ট ছোট গাছ। ফুল ও ফল ছোট এবং কদমের মতোই। কদমের কান্ড নীতিদীর্ঘ, মসৃণ, ধূসর। পত্রঝরা বৃক্ষ। কান্ড সমান্তরালভাবে সাজানো শাখা-প্রশাখা যুক্ত। পাতা বড় বড় হূদয়াকৃতির, লম্বাটে, সরল। শাখা অজস্র এবং ভূমির সমান্তরালে প্রসারিত। পাতার রং উজ্জ্বল-সবুজ, তেল-চকচকে এবং বিন্যাস বিপ্রতীপ। পাতার বোঁটা খুবই ছোট। তরুণ গাছের পাতা বেশ বড়, ৫ থেকে ১০ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়। ফলক দীর্ঘাগ্ন, উজ্জ্বল, উপরিতল মসৃণ ও নিম্নতল হালকা রোমশ। বৃষ্টিস্নাত পাতা দৃষ্টিনন্দন। কদমের সঙ্গে বৃষ্টির ভালোবাসা খুবই নিবিড় । ফুল সাদাভ। কদমের পাতা ও ছাল ব্যাথানাশক। মুখের ঘায়ে কদমের পাতার রস উপকারী।
শীতে কদমের পাতা ঝরে যায় এবং বসন্তে কচি পাতা গজায়। কচি পাতার রঙ হালকা সবুজ। কদমের একটি পূর্ণ মঞ্জরি বা ফুল বলের মতো গোল, মাংসল। পূর্ণ প্রস্ফুটিত মঞ্জরির রঙ সাদা-হলুদে মেশানো হলেও হলুদ-সাদার আধিক্যে প্রচ্ছন্ন। প্রতিটি ফুল খুবই ছোট, বৃতি সাদা, দল হলুদ, পরাগচক্র সাদা এবং বহির্মুখীন, গর্ভদণ্ড দীর্ঘ।
ফুল ও ফল: কদম ফুল স্নিগ্ধ সুরভিত। কদম ফুল সাধারণত আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাসের মধ্যে ফোটে। ফুল ও ফলের স্বাদ অম্বলস্বাদের হলেও সুগন্ধি। অনেক প্রাণীর বিশেষ করে বাদুড় ও কাঠবিড়ালের প্রিয় । ফল মাংসল, দুই থেকে আড়াই ইঞ্চি ব্যাসের হয়। কদমের ছোট ছোট বীজ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
কদম কাঠের ব্যবহার: কদম গাছের কাঠ নরম হওয়ায় সাধারণত চায়ের বাক্স, কড়ি-বড়গা তৈরিতে কাজে লাগে। দেশলাইয়ের কাঠি, কাগজ তৈরির জন্যও কদম কাঠ উপযুক্ত।
ঔষধ শিল্পে কদমের ব্যবহার:আয়ুর্বেদিক চিকিত্সাশাস্ত্র মতে কদমের ছাল, পাতা বা ফুলের রস ফোড়া, মুখে ঘা, মুখে দুর্গন্ধ , জ্বর সারানো কমাতে বা চিকিত্সায় ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়াও শিশুদের কৃমি রোগ নিরাময়ে কদম পাতার রস প্রাচীন কাল থেকেই ওষুধ হিসাবে ব্যবহূত হয়। মুত্রের বর্ণ পরিবর্তন ও পরিমানে কম হলে কদম্বের ক্বাথ ও গব্যদুগ্ধসহ যথাবিধি ঘৃত সহ পান করলে মূত্রের বিবর্ণতা ও পরিমান বেড়ে যায়। কদম্বের ছাল জ্বরনাশক ও বলকারক। কদম ফলের রস অধিক পিপাসা নিবারণ করে থাকে।
বর্তমানে কদম এখন একটি দুর্লভ ফুলের নাম। প্রিয় কদমফুলের কদমগাছ হারিয়ে যেতে বসেছে। এক সময় আষাঢ়ের পুরো সময়টা কদমগাছ ফুলে ফুলে ভরে থাকত। সৌন্দর্যপিপাসু মানুষ তা দেখে তৃপ্ত হতেন। বাড়ির আঙিনায়, রাস্তার দু’পাশে কদমগাছ ছিল চোখে পড়ার মতো। গ্রামের শিশু-কিশোররা কদমতলায় কদমফুল নিয়ে খেলা করত। মানুষ প্রিয়জনকে কদমফুল উপহার দিত।
