সড়ক দুর্ঘটনা :নির্লিপ্তির অবকাশ নাই

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০১৪, ২০:৪৯
সম্প্রতি চালকের সর্বনাশা ঘুম যশোরে ১০ যাত্রীর প্রাণ অকালে কাড়িয়া লইয়াছে। অন্যদিকে, ঐ একইদিনে সরাইলে সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের ৫ সদস্যের প্রাণপ্রদীপ নিভিয়া গিয়াছে। বিগত বহু বছর যাবত্ দেশে যেন সড়ক দুর্ঘটনার ধুম পড়িয়াছে। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও এই দুর্ঘটনাজনিত কারণে অমূল্য প্রাণ ঝরিয়া পড়িতেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এইজন্য যানবাহন চালকদের দায়ী করা হয় বটে, কিন্তু আমাদের দেশের সড়কগুলোর নির্মাণ-ত্রুটি, অপরিকল্পিতভাবে সড়ক নির্মাণ, রাস্তার উপর পাইকারি বা কাঁচা বাজার বসানো, সড়কগুলির বেহাল দশা, অদক্ষ ড্রাইভার-হেলপারদের দৌরাত্ম্য, পুলিশের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা ইত্যাদি নানান বিষয়ও যে এই দুর্ঘটনার সহিত সম্পর্কিত, উহা কিন্তু আমরা বেমালুম ভুলিয়া যাই। সড়ক দুর্ঘটনায় যে পরিবারের সদস্য নিহত হয় কিংবা আজীবন পঙ্গুত্ব বরণ করে সেই পরিবারই কেবল ইহার যন্ত্রণা অনুভব করিতে পারে। অন্যরা ইহাকে যেন গা সওয়া ঘটনা হিসাবেই দেখিতে অভ্যস্থ হইয়া পড়িয়াছে। প্রতি বত্সর দেশে গড়ে কত সোনার প্রসূন অকালে যান দুর্ঘটনায় ঝরিয়া পড়িতেছে, উহার সঠিক কোন তথ্য সংশ্লিষ্ট মহলের নিকট আছে কিনা আমরা জানি না। কিন্তু প্রতিদিনের সংবাদপত্রে বা সংবাদমাধ্যমে ইহার যে ভয়াবহ চিত্রটি ফুটিয়া উঠিতেছে উহাতে প্রমাদ না গণিয়া পারা যায় না নিশ্চয়ই! যান চালকেরা এত বেপরোয়া হইয়া পড়িয়াছে যে, মানুষের জীবনের কোন মূল্যই তাহাদের নিকট এখন আর নাই। যন্ত্রদানবের চাকার নিচে পিষ্ট হইয়া এই পর্যন্ত এই স্বাধীন দেশে অগণিত ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, চিকিত্সক, সাংবাদিক, আমলা, রাজনীতিক, আইনজীবী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সাধারণ এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মৃত্যু ঘটিয়াছে। কিন্তু ইহাতে কাহারও কিছু যায় আসে না। আমরা বুঝিবা মৃত্তিকার ন্যায় সর্বংসহা হইয়া উঠিয়াছি, তাই কোন মৃত্যুই আমাদের মনে সামান্যতম দাগ কাটে না। এই ফরমালিন, বিষাক্ত রাসায়নিক, দুর্নীতি, ছিনতাই, লুট, চৌর্যবৃত্তির দারুণ কদর রহিয়াছে, শুধু মূল্য নাই মানুষের জীবনের। এই কোন ঘোর অমানিশা আজ নামিয়া আসিতেছে আমাদের মাথার উপর? আমাদেরকে এই অবস্থায়, এক্ষুণি তাই গভীরভাবে, এইসব বিষয় লইয়া ভাবিতে হইবে, নির্লিপ্তির আর অবকাশ নাই। সড়ক দুর্ঘটনা কেন এত বৃদ্ধি পাইয়াছে, উহা নির্ণয় করা কি খুব কঠিন কাজ? যোগাযোগ মন্ত্রী বলিয়াছেন যে, দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলি পুরাতন হইয়া গিয়াছে। আমরা বুঝিতে অক্ষম যে, সড়ক আবার বুড়া হয় কী করিয়া? সড়কের উপর দিয়া ক্রমাগত যানবাহন চলাচলের কারণে এক পর্যায়ে উহার কিছু ক্ষতি সাধিত হয়। অর্থাত্, উহার ইট-সুরকি খুলিয়া যায়। গর্ত হইয়া চলার অনুপযোগীও হইয়া পড়ে। কিন্তু এই জন্য তো সড়ক বৃদ্ধ হইয়া যায় না। যখনই সড়কে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় তখনই তো উহা মেরামতের প্রয়োজন। অর্থাত্ সড়কের নিয়মই হইতেছে একদিকে ভাঙচুর হইতে থাকা আবার অন্যদিকে অব্যাহতভাবে মেরামত কার্য চালানো। সড়কগুলি নির্মাণকালে উহা যে পরিমাণ পুরু কংক্রীটে আচ্ছাদিত হইবার কথা প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও অন্যান্যরা অনেক ক্ষেত্রে উহা করেন না বলিয়া সড়কের আস্তরণ সহজেই খুলিয়া-খসিয়া পড়ে। ফলে সড়ক চলাচলের অনুপযুক্ত হইয়া যায়। আবার একটি রাস্তার সহিত আরেকটি রাস্তার সংযোগ স্থাপনকালে কারিগরি ও প্রকৌশলগত যেইসব নীতি মানিয়া চলা দরকার অনেক সময় তাহা উপেক্ষা করা হয়। প্রশাসনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ইচ্ছা-অভিপ্রায় অনুযায়ী ঐ সড়কের দিক পরিবর্তন করিয়া এমন অবস্থার সৃষ্টি করা হয় যে, দুর্ঘটনা ঘটাই যেন উহাতে স্বাভাবিক ব্যাপার হইয়া দাঁড়ায়। আরেকটি বিষয় আমলে নেওয়া দরকার যে, একটি রাস্তা যতখানি চাপ সহ্য করিতে পারে উহার চাইতে কয়েকগুণ বেশি চাপ উহাকে প্রতিনিয়ত সহ্য করিতে হয় যানবাহনের অত্যাধিক্যের কারণে। উহাও এক সংকটই বটে! মোদ্দাকথা, সড়কের রক্ষণাবেক্ষণের উপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের মেরামত কার্য চালাইয়া যাওয়াই হইতেছে দুর্ঘটনা প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান একটি উপায়। দুর্ঘটনা অন্য যেইসব কারণে ঘটিয়া থাকে, উহা অত্যন্ত যত্নসহকারে নির্ণয় করা এবং প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণকল্পে সংশ্লিষ্ট সকল মহলের আন্তরিক প্রয়াস-প্রচেষ্টা গ্রহণের কোনই বিকল্প নাই। সড়ক দুর্ঘটনা একেবারেই শূন্যের কোটায় হয়তো নামাইয়া আনা সম্ভব নহে, কিন্তু যে মাত্রায় বর্তমানে দেশে দুর্ঘটনা ঘটিতেছে উহা বহুলাংশে হ্রাস করা যে সম্ভব এই ব্যাপারে নিশ্চয়ই কেহ দ্বিমত পোষণ করিবেন না। আমরা আশা করিব, শুধু কথায় চিড়া না ভিজাইয়া কার্যকর ব্যবস্থাদি গ্রহণের জন্য আপনারা সকলে আন্তরিক হউন, মানুষের প্রতি একটু দয়া করুন!

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন