সভ্যতা যতই অগ্রসর হউক, প্রকৃতি ও পরিবেশের সহিত প্রাণীকুলের যে গভীর সম্পর্ক তাহা কোনভাবেই অস্বীকার করা যায় না। প্রাণীকুলের সহিত প্রকৃতির রহিয়াছে নিবিড় ও অকৃত্রিম সম্পর্ক যাহাতে কোনোরূপ বিচ্যুতি ঘটিলে প্রাণী বৈচিত্র্যে নামিয়া আসে বিপর্যয়। সৃষ্টিকুলের প্রতিটি প্রাণী একে অপরের উপর কোন না কোনোভাবে নির্ভরশীল। খাদ্যশৃঙ্খল, জীবনধারণ, প্রজননসহ প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় প্রাণীকুলও পরস্পর ঘনিষ্ঠ। কোন কারণে প্রকৃতির ক্ষতিসাধিত হইলে প্রতিবেশ সংযুক্তপ্রাণীর যেই প্রজাতিই হউক তাহা বিলুপ্তির পথে আগাইয়া যায়। একদিকে মানুষ যেমন প্রকৃতির প্রধানতম উপাদান তেমনি মানুষের দ্বারাই প্রকৃতির ক্ষতিসাধিত হইতেছে সবচাইতে বেশি। ইহাতে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর উপর পড়িতেছে নেতিবাচক প্রভাব যাহা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মানুষের জীবনকেই ক্রমশ বিপন্ন করিয়া তুলিতেছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশের প্রাণী বৈচিত্র্যও নানামাত্রিক হুমকির মুখে পতিত, তাহাতে সন্দেহ নাই। ফলে এককালে যেইসকল প্রাণীর বিচরণ সচরাচর পরিলক্ষিত হইত তাহার বেশিরভাগই এখন বিরলদৃষ্ট। ক্রমবর্ধমান ও অতিরিক্ত জনসংখ্যা, বন-জঙ্গল নিধন করিয়া আবাসস্থল নির্মাণ, প্রকৃতির নানা উপাদানকে অপরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাইয়া চাহিদা মিটাইবার কারণে কালের আবর্তে প্রাণীর বিচিত্র প্রজাতি ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়াছে এবং হইতেছে।
কিছুকাল পূর্বেও এইদেশ ছিল ঈর্ষণীয় প্রাণী বৈচিত্র্যের অধিকারী, কিন্তু মাত্র কয়েক দশককাল পরে ইহা যেন কেবলই ইতিহাস। জলাশয়ে যেইসব দেশি মাছের প্রাচুর্য আমাদের আনন্দিত করিত সেইগুলির অনেক প্রজাতিই আজ দুর্লভ। বন জঙ্গলে বা সাধারণ ঝোঁপঝাড়ে অতীতদৃষ্ট পরিচিত পশুপাখি এখন আর নাই বলিলেই চলে। উপকূলীয় অঞ্চলগুলিতে গৃহায়ন, চিংড়িচাষের জন্য কৃষিজমির ব্যবহার, ঝড় জলোচ্ছ্বাসে ভূমিক্ষয়সহ বিভিন্ন কারণে জলজ পরিবেশের ওপরে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়িয়াছে তাহাতে জীবকুলের জীবনধারণ সেইখানেও একরকম অসম্ভব। আবাসস্থলের ক্ষতিসাধন, পরিবর্তিত আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব, প্রয়োজনীয় খাদ্যের অভাব ও চোরা শিকারের কারণেই মূলত প্রাণীর এহেন পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে। প্রকৃতি ও পরিবেশের যেই ক্ষয়িষ্ণু চিত্র আজ পরিদৃষ্ট তাহাতে সহজেই অনুমেয়, শতাব্দীকাল পরে পৃথিবী তাহার আবাসযোগ্যতা হারাইবে। সর্বশেষ ২০১২ সালে প্রণীত বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন তফসিলে বাংলাদেশে ৩২ প্রজাতির উভচর, ১৩১ প্রজাতির সরীসৃপ, ৬২২ প্রকারের পাখি, ৮৩ ধরনের কীট-পতঙ্গ, ১৩৭ ধরনের স্তন্যপায়ী প্রাণীসহ বিভিন্ন ধরনের ১২৩১ প্রজাতির উল্লেখ রহিয়াছে। নেকড়ে, মালয়ান সুরভালুক, বারসিঙ্গা হরিণ, বামন শূকর, ময়ূর, ডোরাকাটা হায়েনাসহ অসংখ্য প্রজাতির প্রাণী এদেশ থেকে চিরতরে হারাইয়া গিয়াছে। ইহাছাড়া শকুন, দেওহাঁস, নাফতা হাঁস, ঘড়িয়াল, মিঠাপানির কুমির, বনছাগল, ঘুরাল, বিভিন্ন প্রজাতির হরিণসহ বেশকিছু প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্তির দোরগোড়ায়।
বিলুপ্ত বিভিন্ন প্রজাতি আর হয়ত ফিরাইয়া আনা সম্ভব নহে, কিন্তু যেই সকল প্রাণী এখনও আমাদের দেশে সংখ্যায় নগণ্য হইলেও অলুপ্ত সেইগুলির জীবনধারণ যাহাতে কোনভাবেই সঙ্কটাপূর্ণ না হয় সে বিষয়ে জরুরি উদ্যোগ লইতে হইবে। জলবায়ু পরিবর্তন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত যেইসকল কারণে প্রাণীর অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে পড়িয়াছে, তাহা কমাইয়া আনিতে রহিয়াছে বিস্তর ও প্রায়োগিক গবেষণা। প্রাণী বৈচিত্র্যের জন্য হুমকিস্বরূপ এইরূপ অসচেতনতা এবং দুর্বৃত্তায়নমূলক কর্মকাণ্ডের সহিত যাহারা জড়িত তাহাদের এই বিষয়ে সচেতন ও বিদ্যমান আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করিতে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি হাতে লইতে হইবে। প্রাণীবৈচিত্র্য সংরক্ষণে সকলের দায়িত্বশীলতা একান্ত জরুরি।
