দিবস

সমবায়ী মনোভাব ও প্রত্যাশিত উন্নয়ন

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০১৪, ২০:৪৯
আজ ৫ জুলাই আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস। বরাবরের মতো এবারও এ দিবসটি পালিত ও উদযাপিত হচ্ছে সমবায় আন্দোলনের মহত্ উদ্দেশ্য ও আদর্শকে শক্তিশালী ও জোরদার করার জন্য। স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস পালিত হয়ে থাকে। সমবায় একটি সামাজিক উদ্যোগ, একটি গণমানুষের নিজস্ব চেতনার আন্দোলন, একটি অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন এবং পুঁজি সৃষ্টি সহায়ক উন্নয়ন পদ্ধতি। ‘দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’ ‘দশের লাঠি একের বোঝা’- এই মূলমন্ত্রে দীক্ষিত সমবায় খাত। সমবায়ের মাধ্যমে পরিচালিত কর্মকাণ্ডে যেমন রয়েছে সামাজিক কল্যাণ, ব্যবসায়িক উদ্যোগ, আর্থিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, তেমন রয়েছে গণতন্ত্রের চর্চা, নেতৃত্ব ও নৈতিকতার বিকাশের সমান সুযোগ। দেশের বৃহত্ জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার, বেকারত্ব নিরসন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সমবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম সমবায়কে ‘ওরে নিপীড়িত, ওরে ভয়ে ভীত শিখে যা আয়রে আয় দুঃখ জয়ের নবীন মন্ত্র সমবায় সমবায়’ হিসাবে কবিতায় উদ্ধৃত করেছেন। বাংলাদেশের সংবিধানে সমবায়কে মালিকানার ভিত্তিতে দ্বিতীয় খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ আন্দোলনের মূলকথা ব্যক্তি স্বার্থের চেয়ে সমষ্টির স্বার্থকে বড় করে দেখতে হবে। ফ্রান্সের প্রতি ১০ জন কৃষকের ৯ জনই সমবায়ী। মোট আমানতের ৬০ ভাগ সমবায় ব্যাংকে সংরক্ষিত এবং খুচরা ব্যবসায়ীদের ২৫% সমবায়। কোরিয়ার ৯০% কৃষক সমবায়ী এবং সমবায়ী কৃষকের সংখ্যা ২ মিলিয়নেরও বেশি। তাদের উত্পাদিত পণ্যের বাজার মূল্য ১১ মিলিয়ন ইউএস ডলার। তাছাড়া মোট মত্স্য উত্পাদনের ৭১ ভাগ সমবায়ী মত্স্যজীবীরা উত্পাদন করে থাকে। কুয়েতের খুচরা বাজারের ৮০% সমবায়ের মাধ্যমে সম্পাদিত হচ্ছে। নিউজিল্যান্ডের জিডিপি-এর ২২% আসে সমবায় খাত থেকে। ৯৫% ডেইরি সামগ্রী সমবায়ের মাধ্যমে উত্পাদিত হয় এবং ডেইরি পণ্য রপ্তানির ৯৫% আসে সমবায় খাত থেকে। নরওয়ের ৯৯% ডেইরি পণ্য সমবায়ের মাধ্যমে উত্পাদিত হয়ে থাকে। ভোগ্যপণ্য বাজারের ২৫% সমবায়ের দখলে এবং প্রতি ৩ জন নরওয়েবাসীর মধ্যে ১ জন সমবায়ী। সিঙ্গাপুরের ভোগ্যপণ্য সমবায়গুলো মোট বাজারের ৫৫% নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, যাদের বাত্সরিক টার্নওভার ৭০০ মিলিয়ন ইউএস ডলার। ভিয়েতনামের মোট জিডিপি’র ৮.৬% আসে সমবায় খাত থেকে। এশিয়ার সর্বাপেক্ষা উন্নত দেশ জাপানে শুধু ভোক্তা সমবায় সমিতির সদস্য প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে শুরু হওয়া সমবায় ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে বিশ্বব্যাপী ভিন্ন ভিন্ন রূপ, কাঠামো ও কার্যক্রমের মাধ্যমে উজ্জ্বল উপস্থিতি বজায় রেখেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও আমেরিকার বৃহত্তর আঞ্চলিক পরিসরে সমবায় অর্থনীতির তৃতীয় খাত এবং সামাজিক অর্থনীতির প্রধানতম অবলম্বন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের সমবায় সমিতিগুলো পরিচালনা করা হচ্ছে গোঁজামিল দিয়ে। সমবায়ের নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও সমিতিগুলোর বিভিন্ন সমস্যার কারণে দেশের প্রায় ৪৭ শতাংশ সমবায় সমিতি অকার্যকর রয়েছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। তাই ‘সমবায় সমিতি (সংশোধন) আইন ২০১৩’ এর আলোকে সমবায় সমিতি বিধিমালা সংশোধন ও একটি যুগোপযোগী ‘সমবায় নীতিমালা’ প্রণয়ন করা দরকার। বিজ্ঞানের চরম উত্কর্ষতর যুগে মানুষের আর্থিক নিশ্চয়তা ও স্বনির্ভরতা অর্জনে সমবায়কে কাজে লাগাতে হবে পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে। সমবায় আন্দোলনের সংস্কার এখন খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। দেশের মোট জনসংখ্যর একটি বিরাট অংশ যেহেতু যুব সমাজ সেহেতু সমবায়ের মাধ্যমে তাদের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত করতে পারলে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। যুব সমাজই দেশের প্রাণশক্তি, উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রধান ধারক ও বাহক। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিয়ে তাদেরকে যথাযথভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার প্রযুক্তি নির্ভর কর্মসূচি থাকতে হবে। তবেই সুগম হবে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথ। লেখকদ্বয় :যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন