[ উ চ্চ শি ক্ষা ]

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি হারিয়ে যাচ্ছে !

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০১৪, ২১:১৬
ব্যক্তি মালিকানাধীন বিশ্ববিদ্যালয় বা ‘প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে’ আমার কখনোই বিশ্ববিদ্যালয় পদবাচ্য বলে মনে হয়নি। কেননা, একটি এ্যাপার্টমেন্ট অথবা সুউচ্চ ভবন ভাড়া নিয়ে সেখানে চাকরির বাজারে চাহিদা সম্পন্ন বিবিএ, আইন, ইংরেজীসহ কিছু বিভাগ নিয়ে ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করলেই তা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যেমন অবকাঠামো, বিস্তৃত মাঠ, স্বচ্ছ পানির পুষ্করিণী, খোলা আকাশ দরকার, তেমনি প্রয়োজন আধুনিক মানের শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, কম্পিউটার ল্যাবসহ শিক্ষা ও গবেষণার যথাযথ পরিবেশ। ভৌত অবকাঠামো ও প্রাকৃতিক পরিবেশ বিবেচনায় ‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি’কে কি বিশ্ববিদ্যালয় বলা যায়? উপরন্তু, ব্যক্তি মালিকানাধীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দর্শন, গণিত, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, ভাষাতত্ত্বসহ অনেক মৌলিক বিষয় পড়ানো হয় না। আর গবেষণা, যেটি ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা চিন্তাই করা যায় না, সেই ব্যাপারে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির কোন চিন্তা, তত্পরতা বা বরাদ্দ আছে বলে আমার জানা নেই, শুধুমাত্র কিছু প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে ছ’ মাসে বা এক বছরে কিছু জার্নাল প্রকাশিত হয়। ফলে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলোকে আমি বিশ্ববিদ্যালয় বলতে পারছি না (দুঃখিত প্রিয় পাঠক, কেউ আমার কথায় কষ্ট পেলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী!) যে কথাগুলো আমি ওপরে বলতে চেয়েছি বা আমার মূল প্রপঞ্চ দিন দুই আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে টিআইবি কর্তৃক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর পরিচালিত জরিপের ফলাফল থেকে। আরও খোলাসা করে বললে, ব্যক্তি মালিকানাধীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছে টিআইবি। তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় বলতে আমাদের হাতে যা অবশিষ্ট থাকল, সেটি হচ্ছে ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়’। সেশন জট, শিক্ষার্থীদের হানাহানি, শিক্ষক রাজনীতির জটিল প্রবাহ ও বাঁক পরিবর্তন সত্ত্বেও ওই ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই’ আমাদের একমাত্র ভরসা! কিন্তু অপার সম্ভাবনা সত্ত্বেও ওই ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়’গুলোও কি আজ হারিয়ে যেতে বসেছে? ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে কয়েক দশকের মধ্যেই এ বিশ্ববিদ্যালয় তার আবাসিক চরিত্র ও মানসম্পন্ন শিক্ষা ও গবেষণার জন্য ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। সেই সময় কোন্ মানের শিক্ষকরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা প্রদান করতেন এবং গবেষণার মান কতটা সে বিষয়ে কিছু উদাহরণ প্রদান প্রাসঙ্গিক হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল থেকে সত্যেন্দ্রনাথ বসু, যিনি সত্যেন বোস নামে পরিচিত, একটি প্রবন্ধ পাঠান। তার ওই প্রবন্ধ পড়ে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘আমার মতে বসু কর্তৃক প্ল্যাংক-সূত্র নির্ধারণের এই পদ্ধতিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।’ বিশ্বখ্যাত আরেক বিজ্ঞানী আব্দুস সালাম ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সম্মেলন উদ্বোধন করতে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন। ঢাকায় এক সময়ে গড়ে উঠেছিল এক শক্তিশালী গবেষক দল যারা মৌলিক পদার্থের প্রকৃতি সম্বন্ধে তাত্পর্যপূর্ণ কিছু প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। এসব গবেষণায় অংশগ্রহণ করেছিলেন কে. এস. কৃষ্ণাণ, এস. আর, খাস্তগির, কাজী মোতাহার হোসেন এবং আরো অনেকে। বিখ্যাত রোনাল্ড ফিশার ঢাকার বিমানবন্দরে নেমেই কাজী মোতাহার হোসেনের খোঁজ করতেন। এটাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তাঁর শিক্ষকদের প্রকৃত পরিচয়, সত্যিকারের ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যের জন্যই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জগন্নাথ হলে বসে লিখতে পেরেছিলেন: ‘এই কথাটি মনে রেখো, তোমাদের এই হাসি খেলায়....’ (অধ্যাপক এ এম হারুন—অর-রশীদ, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবের প্রায় শতবর্ষের ঐতিহ্য,” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাব কর্তৃক প্রকাশিত স্যুভেনির, ২০১২।) আলবার্ট আইনস্টাইন থেকে শুরু করে বিশ্বখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যারল্ড লাক্সী পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণার প্রশংসা করেছেন। কোন্ মানের শিক্ষকরা বিভিন্ন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন, কয়েকটি নাম উল্লেখ করলে সে বিষয়ে একটি ধারণা পাওয়া যাবে। যে সকল খ্যাতনামা পণ্ডিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন এবং এখনও শিক্ষকতা করছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন — হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রমেশচন্দ্র মজুমদার, জি এইচ ল্যাংলি, হরিদাস ভট্টচার্য, সত্যেন বসু, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত, কাজী মোতাহার হোসেন, গোবিন্দ চন্দ্র দেব, মুনীর চৌধুরী, আব্দুর রাজ্জাক, আহমদ শরীফ, সরদার ফজলুল করিম, আনিসুজ্জামান, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, হুমায়ুন আজাদ, হুমায়ূন আহমেদ প্রমুখ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৩ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে, বড় দাগে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অর্জন রয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের। এক. এ অঞ্চলের শিক্ষিত একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে অনন্য ভূমিকা। দুই. এতদঅঞ্চলের সকল প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীবৃন্দ গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন, অনেক যুগান্তকারী আন্দোলনে তারা পুরো জাতিকে নেতৃত্বও প্রদান করেছেন। তিন. বাংলাদেশ নামক ভূ-খণ্ডে উচ্চশিক্ষার বিকাশে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে অনন্য ভূমিকা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যে বিশ্ববিদ্যালয়টি তার মানসম্পন্ন শিক্ষা ও গবেষণার জন্য ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ বলে খ্যাতি অর্জন করেছিল, সেই বিশ্ববিদ্যালয়টি আজ বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় কততম অবস্থানে? স্পেনের সিএসইসি একাডেমিক কার্যক্রমের ভিত্তিতে সারাবিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে তালিকা প্রস্তুত করেছে, সেই তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ১৪২৬ নম্বরে। এশিয়ায় শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের যে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে, সেই তালিকার প্রথম ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নেই। দক্ষিণ এশিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৭৬তম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যদি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে না থাকে, যদি এশিয়ার শ্রেষ্ঠ ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে খুঁজে পাওয়া না যায়, তাহলে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গাল ভরা নাম হয়ে যাচ্ছে না? পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি বড় ঘাটতির জায়গা হচ্ছে, মানসম্পন্ন শিক্ষা ও গবেষণার জন্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে আর্থিক বরাদ্দ প্রয়োজন, তা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পায় না। উদাহরণ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলতে পারি। গত কয়েক বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গড়পরতা বার্ষিক বাজেট ২০০ কোটি টাকার মত। এর সিংহভাগই ব্যয় হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা মেটাতে। বাকি অর্থ দিয়ে মানসম্পন্ন শিক্ষা ও গবেষণা পরিচালনা করা এবং শিক্ষকদের পেশাগত উত্কর্য সাধনে প্রশিক্ষণসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ সম্ভব নয় বললেই চলে। দ্বিতীয় যে বিষয়টি শিক্ষা ও গবেষণাকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করছে, তা হচ্ছে ছাত্র রাজনীতি ও শিক্ষক রাজনীতি। আদর্শিক কারণে কেউ ছাত্র রাজনীতি বা শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হলে ব্যক্তিগতভাবে আমার কোন আপত্তি নেই। আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে গড়ে ওঠেনি, যেখানে আমরা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা রাজনীতি সচেতন ও রাজনীতি সংশ্লিষ্ট না হলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অনেক বড় কায়েমী স্বার্থবাদীরা জেঁকে বসতে পারে। তবে ১৯৯১ সাল থেকে গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা আরম্ভ হওয়ার পর থেকে ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল। আদর্শভিত্তিক ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি নিয়ে আমার কোন আপত্তি নেই, ওই ধরনের রাজনীতি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। কিন্তু লেজুড়বৃত্তির যে ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি চলছে, তা একদিকে শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশকে নষ্ট করছে, অন্যদিকে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য তা কোন কল্যাণ বয়ে আনছে না। কয়েক দশক আগেও শিক্ষক রাজনীতির নেতৃত্ব দিয়েছেন ড. আহমদ শরীফ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও মশিহুজ্জামানের মত পণ্ডিত শিক্ষক। কিন্তু আজ যারা শিক্ষক রাজনীতির নেতৃত্বে রয়েছেন , তাদের পাণ্ডিত্য যেমন প্রশ্নবিদ্ধ, তেমনি তাদের মধ্যে আদর্শিত সততারও ঘাটতি দেখা যায়। এমন একটি দুর্ভাগ্যজনক অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ কিভাবে মোকাবেলা করবে সেটি খুবই উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠার। [লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন