ইরাকে অনৈক্য না কি ষড়যন্ত্র?

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০১৪, ২১:১৬
ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে মধ্যপ্রাচ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল অঞ্চল। এ অঞ্চলে রয়েছে বিশ্বের প্রধান তিন ধর্ম অর্থাত্ মুসলিম,খ্রিষ্টান ও ইহুদীদের পবিত্র স্থান। এছাড়া এ অঞ্চলটি তিন মহাদেশের মিলনস্থল এবং সর্বোপরি তেল সম্পদে সমৃদ্ধ। ফলে প্রধানত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণেই এ অঞ্চলের প্রতি বিশেষ মোহ রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী শক্তিগুলোর। এই মোহ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো আরব বিশ্বকে ছোট ছোট দুর্বল রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর কাছে মধ্যপ্রাচ্য আরেকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের কর্তৃত্ব নির্বিঘ্ন রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরলস প্রয়াস গোপন কিছু নয়। মার্কিন সরকার ইসরাইলের কর্তৃত্ব ও নিরাপত্তার বিষয়টিকে সব সময় অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে, এই বিষয়ে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ যেভাবে ঘোষণা দিতেন একই কায়দায় বর্তমান প্রেসিডেন্ট ওবামাও ঘোষণা করেছেন। এ ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান বলে কোন পার্থক্য নেই। ফলে ইসরাইলের নিরাপত্তা ও প্রতাপ নিশ্ছিদ্র রাখতে পাশ্চাত্যের জায়নিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের মস্তিষ্ক থেকে বেরিয়ে আসে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে আমূল পরিবর্তনের নীলনকশা। এ কথাটি প্রথম উচ্চারণ করেন সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিত্সা রাইস। ২০০৬ সালে হিজবুল্লাহ নিধনের নামে লেবাননের আবাসিক এলাকাগুলোতে ইসরাইলের ব্যাপক বোমা হামলার সময় রাইস বলেছিলেন, এ হচ্ছে নতুন মধ্যপ্রাচ্যের প্রসব ব্যথা। এ বিষয়টি আরো খোলাসা করে দিলেন মার্কিন বিশ্লেষক রবিন রাইট তার এক প্রতিবেদনে। ২০১৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত ঐ প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের পাঁচটি দেশকে ভেঙ্গে ১৪টি দেশে বিভক্ত করার নীলনকশার কথা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। ইরাকের পর ইরান আক্রমণ করা বুশ প্রশাসনের পক্ষে সম্ভব না হওয়ায় ঐ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে মনে করা হয়। নতুন মধ্যপ্রাচ্য গঠনের পরিকল্পনা ভেস্তে গেলেও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহত্ ও শক্তিশালী দেশ ইরাককে ত্রিখণ্ডিত করার পরিকল্পনা থেমে থাকেনি। এই পরিকল্পনার সাথে কয়েকটি আরব দেশ সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে তা নতুন মাত্রা পায়। ইরানের পাশে শক্তিশালী ইরাক রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে ইসরাইল যেমন নিজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে তেমনি রাজতান্ত্রিক আরব দেশগুলো বিশেষ করে সৌদী আরব শক্তিশালী ও গণতান্ত্রিক ইরাককে রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার জন্য বড় বিপদ মনে করে। অতএব, ইরাকের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য শিয়া-সুন্নির দ্বন্দ্ব্ব বা ইরান ও সৌদী আরবের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের লড়াইকে প্রধান কারণ বলে চিহ্নিত করার প্রয়াসকে মেনে নেয়া কঠিন। মিশরের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী নিয়ে একটু চিন্তা করলেই ইরাক নিয়ে প্রচারণার ধূম্রজাল অনেকটাই স্পষ্ট হবে বলে মনে করি। মিশরে শিয়া-সুন্নি কিংবা ইরানের প্রভাব বিস্তারের কোন বিষয় ছিল না। দেশটিতে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের মাধ্যমে মুসলিম ব্রাদার হুড সরকার গঠন করেছিল। সৌদী আরব প্রথম থেকেই মিশরের মত একটি প্রভাবশালী আরব দেশে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রাকে ভালো চোখে দেখেনি। প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহ্যের কারণে আরব জনগোষ্ঠীর কাছে মিশরীয়দের বিশেষ ভাবমূর্তি রয়েছে। কাজেই মিশরে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে তাতে রাজতন্ত্রকবলিত আরব দেশগুলোর জনগণ প্রভাবিত হয়ে পড়বে, এমন আতংক কাজ করছিল অগণতান্ত্রিক শাসকদের মনে। এই আতঙ্কের খেসারত এখন দিতে হচ্ছে মিশরের জনগণকে। ইরাকের সাবেক শাসক সাদ্দাম হোসেনের পতনের অব্যবহিত পর পশ্চিমা গণমাধ্যম হঠাত্ করেই দেশটির জনগণকে শিয়া,সুন্নি ও কুর্দি এই তিন ভাগে উপস্থাপন করতে শুরু করে। আরব গণমাধ্যমের বড় একটি অংশ পাশ্চাত্যের এই রীতি নিখুঁতভাবে অনুসরণ করতে থাকে। এটা কারো অজানা নয় যে,কুর্দিরা স্বতন্ত্র রাস্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যুগ যুগ ধরে চেষ্টা করছে, তাদের এই প্রচেষ্টার পেছনে মূল প্রেরণা হলো কুর্দি জাতীয়তাবাদ। তারা তুর্কি বা আরবদের কর্তৃত্ব থেকে বের হয়ে আলাদা কুর্দি রাষ্ট্র গঠন করতে চায়। এর সাথে শিয়া-সুন্নির কোন সম্পর্ক নেই।বরং কুর্দিদের মধ্যে শিয়া,সুন্নি, ইহুদী-খ্রীষ্টানসহ আরো কয়েকটি ধর্মের অনুসারী রয়েছে। কাজেই অনারব কুর্দিদের স্বাধীনতার দাবির সাথে এক করে আরব শিয়া-সুন্নিদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠনের চিন্তাকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখতে চান বিশ্লেষকদের অনেকে । যে সব কারণে ইরাকে শিয়া ও সুন্নিদের জন্য পৃথক আবাসভূমির কথা তোলা হচ্ছে সেই একই যুক্তি বাহরাইন ও সৌদী আরবের ক্ষেত্রেও উত্থাপিত হতে পারে। বাহরাইনে শিয়ারা সংখ্যাগরিষ্ঠ,কিন্তু শাসন ক্ষমতা সুন্নিদের হাতে কুক্ষিগত। সৌদী আরবের একটি বিশাল অঞ্চল শিয়া অধ্যুষিত। এই দুই দেশেই শাসক শ্রেণীর প্রতি শিয়া জনগণের তীব্র অসন্তোষ রয়েছে। কাজেই এসব অসন্তোষ দূর করে সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে রবিন রাইটের ফাঁস করা পরিকল্পনার ফাঁদেই পা দিবে আরব দেশগুলো। ইরাকের জনসংখ্যার ৬০ থেকে ৬৫ ভাগ শিয়া। ৩২ ভাগের কিছু বেশি সুন্নি এবং বাকীরা খ্রীষ্টান ও অন্যান্য ধর্মের অনুসারী। গত নির্বাচনে স্বাভাবিকভাবেই শিয়া জোটগুলো বেশিসংখ্যক আসন পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মালেকির ‘স্টেট অব ল এ্যালায়েন্স’ পেয়েছে ৯২ টি আসন। তবে সরকার গঠনের জন্য এ আসন সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়। এজন্য তাদেরকে অন্য কোন দল বা জোটের সমর্থন নিতে হবে। এখানেই দেখা দিয়েছে সমস্যা। নির্বাচনের পর কয়েক মাস পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত ইরাকী রাজনীতিকরা সরকার গঠনের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছুতে পারেনি। মালেকীর জোট ‘স্টেট অব ল এ্যালায়েন্স’ সব চেয়ে বেশি আসন পেলেও সরকার গঠনের জন্য শিয়া বা সুন্নি কোন দলের সমর্থন আদায় করতে ব্যর্থ হয়েছে। এতেই অনুমান করা যায় যে, আসলে ইরাকের মূল সমস্যা শিয়া-সুন্নির দ্বন্দ্ব নয়। ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থ এবং গোত্রকলহ হচ্ছে ইরাকে একটি বড় সমস্যা,আর এটাকেই পুঁজি করে প্রণীত হয়েছে ত্রিখণ্ডিত করার নীলনকশা। ইরাকের বর্তমান প্রেসিডেন্ট জালাল তালাবানি জাতিতে কুর্দি এবং ধর্ম বিশ্বাসে সুন্নি মুসলমান। দেশটির বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুশিয়ার জিবারী এবং স্পিকার উসামা আন নাজিফি সুন্নি সম্প্রদায়ের। এছাড়া পার্লামেন্ট ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদেই রয়েছেন সুন্নি মুসলমানরা । সাধারণ মানুষের মধ্যে শিয়া-সুন্নি বৈরিতার তেমন উত্তাপ নেই । তবে সমস্যাটা তৈরী করছে সালাফি মতবাদে বিশ্বাসী উগ্র গোষ্ঠীগুলো, সাদ্দাম আমলের সুবিধাভোগী রাজনীতিক এবং পাশ্চাত্যপন্থী বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবীদরা। পশ্চিমা ও আরব গণমাধ্যমের একটি অংশ এই তিন শ্রেণিকে সুন্নি বলে উপস্থাপন করছে। অথচ সুন্নি অধ্যুষিত মসুল শহরটি দখলে নেয়ার পর আইসিস জঙ্গিরা সেখানে গণহত্যা চালাচ্ছে এবং তাদের হাতে দুই শতাধিক সুন্নি আলেম খুন হওয়ার খবর মিডিয়াতেই প্রকাশিত হয়েছে। গত ক’দিন আগে ইরাকী পার্লামেন্টের কয়েকজন সুন্নি সদস্য দেশটির স্বাধীনতা ও অখণ্ডতার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রের বিষয়ে জনগণকে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এটাকে একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে ইরাকের নেতারা দেশের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য ধর্ম-গোত্র নির্বিশেষে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন এমন আভাস পাওয়া যাচ্ছে। লেখক : রেডিও তেহরানের সাবেক পরিচালক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন