দ্বন্দ্ব ও ঐক্যসাধনা

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০১৪, ২১:১৯
বলা হইয়া থাকে যে, প্রেম এবং ধোঁয়াকে ঢাকিয়া রাখা যায় না। দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। দ্বন্দ্ব আড়াল করা যায় না। সাময়িকভাবে চাপা দিয়া রাখা যায় মাত্র। ইহার চরিত্র অনেকটা ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির মতো। বাহির হইতে কিছুই বোঝা যায় না। কিন্তু ভিতরে ভিতরে ঠিকই টগবগ করিয়া ফুটিতে থাকে। কুম্ভকর্ণের মতো যে-কোনো সময় তাহার নিদ্রাভঙ্গ হইতে পারে। আর আগ্নেয়গিরি যখন জাগ্রত হয় তখন তাহা যে কতোখানি নারকীয় রূপ পরিগ্রহ করিতে পারে—সামপ্রতিককালে ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট টেলিভিশনের কল্যাণে অনেকেরই তাহা প্রত্যক্ষ করিবার সুযোগ ঘটিয়াছে। তবে ইহার মাত্রাভেদও রহিয়াছে। কোনো কোনো সময় উদ্গীরণ এতোটাই আগ্রাসী হয় যে, বিশাল একটি জনপদই লাভার নীচে তলাইয়া যায়। আবার ক্ষেত্রবিশেষে সামান্য ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ থাকে তাহার ধ্বংসলীলা। দ্বন্দ্বের স্বভাবও অনেকটা তাহাই। দ্বন্দ্ব থাকিলে তাহার প্রকাশ ঘটিবেই। সেই প্রকাশের রূপ কেমন হইবে—তাহা নির্ভর করে দ্বন্দ্বের প্রকৃতির উপর। জাতিগত, ধর্মীয় ও আদর্শিক—এই রকম কত রূপেই না আমরা তাহার বহিঃপ্রকাশ দেখিয়াছি সভ্যতার চক্রাকার যাত্রাপথে। এখনও দেখিতেছি। এমনকি, সভ্যতার এই পরম উত্কর্ষের যুগেও, জাতিগত দ্বন্দ্ব আফ্রিকায় লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ মানুষের মৃত্যুর কারণ হইতেছে। ইউরোপ কিংবা এশিয়ার চিত্রও খুব একটা আত্মশ্লাঘায় ভুগিবার মতো নহে। ধর্মীয় ও আদর্শিক দ্বন্দ্বের কারণে যুগে যুগে, দেশে দেশে, যেই রক্তস্রোত বহিয়া গিয়াছে—তাহাকেও হালকা করিয়া দেখিবার উপায় নাই। দ্বন্দ্ব পরিহার করিতে পারিলে ভালো। আরও ভালো হয় যদি শান্তিপূর্ণ পন্থায় দ্বন্দ্বের নিরসন করা যায়। কিন্তু এই ধরনের নীতিকথা বা সুবচন সবসময়ে কাজে আসে না। এমন অনেক উদাহরণ আছে যেইখানে শত শত বত্সরেও দ্বন্দ্বের মীমাংসা হয় নাই। পরস্পরবিরোধী বা পরস্পরের প্রতি চরম বৈরি ভাবাপন্ন দুইটি আদর্শের মধ্যে বিদ্যমান দ্বন্দ্বের নিরসন প্রায় অসম্ভবই বলা চলে। তবে জাতি, ধর্ম ও বর্ণগত ব্যাপক ভিন্নতা সত্ত্বেও মানুষ যে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করিতে পারে—তাহার উদাহরণ ভূরি ভূরি। এইজন্যই আধুনিককালে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য সাধনের কথাটি শুধু যে ব্যাপকভাবে উচ্চারিত হইতে শোনা যায় তাহাই নহে—যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতসহ বহু দেশ আজ এই আদর্শের সফল মডেল হইয়া দাঁড়াইয়াছে। তবে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের কথা বলা যতো সহজ কাজটি ততো সহজ নহে। প্রকৃত অর্থে ইহা একটি সাধনাই বটে। এই সাধনাকে সফল করিতে হইলে ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠিতে হয়। স্বাক্ষর রাখিতে হয় রাষ্ট্রনায়কোচিত দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞার। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের প্রতিষ্ঠাতা পিতৃগণ তাহা পারিয়াছিলেন বলিয়াই দেশ দুইটি আজ ধনে-মানে ও শক্তিমত্তায় সারা বিশ্বের সমীহ আদায় করিতে সক্ষম হইয়াছে। ঐক্যের শক্তি যে অপরিসীম, তাহা কোনো নূতন কথা নহে। এমনকি তাহা দেখিতেও সুন্দর। সর্বোপরি, বৃহত্ ও মহত কোনো লক্ষ্য অর্জনে ইহার কোনো বিকল্পও খুঁজিয়া পাওয়া কঠিন। কিন্তু ঐক্যের সেই শক্তি ও সৌন্দর্যকে করায়ত্ত করিয়া জাতীয় বা সমষ্টিগত উন্নয়নে কাজে লাগাইতে হইলে শুধু যে নিজের বড়ত্বের অহমিকা পরিহার করিতে হইবে তাহাই নহে, একইসাথে ক্ষুদ্রতম শরিকটির প্রতিও শ্রদ্ধাপূর্ণ মনোভাব দেখাইতে হইবে। বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনে তাহারও যে প্রয়োজন বা অপরিহার্যতা রহিয়াছে তাহা স্বীকার করিয়া লইতে হইবে অকুণ্ঠচিত্তে। অন্যথায় ঐক্যসাধনাই যে কেবল বিফলে যাইবে তাহাই নহে, একইসাথে সুপ্ত ক্ষদ্রাতিক্ষুদ্র দ্বন্দ্বও আগ্নেয় লাভার রূপ পরিগ্রহ করিয়া সকল অর্জনই ধূলিসাত্ করিয়া দিতে পারে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন