বস্তিবাসীর ব্যাপারে চাই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০১৪, ২১:১৯
এখন বস্তিবাসীরাও পাইবে গৃহঋণ। খবরটি শুনিতে ভালই লাগে। দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ‘প্রো পুউর স্ল্যাম ইন্টিগ্রেশন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প গ্রহণ করিয়াছে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিকভাবে কুমিল্লা, দিনাজপুর, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল ও সিরাজগঞ্জ জেলায় এই প্রকল্প চালু করা হইবে। প্রথম পর্যায়ে প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করা হইবে ১০০ কোটি টাকা। এই অর্থের একটি অংশ দ্বারা অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করা হইবে। অর্থাত্ বস্তিতে থাকা লোকজনের জন্য জমি অধিগ্রহণ, রাস্তাঘাট নির্মাণ, পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ সবধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হইবে। বাকি অর্থ দ্বারা তাহাদের জন্য ঘর নির্মাণ করা হইবে এবং তাহা উপকারভোগীদের দেওয়া হইবে ঋণ হিসাবে। ১০ হইতে ১৫ জনকে দলগতভাবে দীর্ঘ মেয়াদের জন্য সর্বোচ্চ এক লক্ষ ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত এই ঋণ দেওয়া হইবে। ঋণের সুদহার হইবে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ। তবে আগামী সেপ্টেম্বরে বিশ্বব্যাংকের বোর্ড সভায় প্রকল্পটির অর্থায়নের বিষয়টি অনুমোদন পাইলেই এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হইবে বলিয়া জানা যায়। প্রথম কথা হইল, এই ধরনের প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হইতেছে রাজধানী ঢাকার বাহিরে। ইহাতে এখানকার বস্তির চাপ কতটা কমিবে তাহা বলা মুশকিল। তবে নূতন চাপ সামলাইতে ইহা কার্যকর হইতে পারে। সাধারণত বন্যা ও নদীভাঙনে সর্বস্বান্ত হইয়া বা আর্থ-সামাজিক নানা কারণে হতদরিদ্র মানুষ উপায়ন্তর না দেখিয়া বাঁচিবার আশায় শহরমুখী হয়। অবশেষে তাহাদের ঠিকানা হইয়া দাঁড়ায় বস্তি। তাহারা শহরের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ফরমায়েশ খাটিয়া এবং এসব লোকের আরাম-আয়েশ ও আভিজাত্য নিশ্চিত করিয়া জীবিকা উপার্জন করে। এজন্য বড় বড় অভিজাত এলাকার পাশেই গড়িয়া ওঠে বস্তি। একই কারণে একবার বস্তি উচ্ছেদ করা হইলেও সেই জায়গায় বা অনতিদূরে আরেকটি বস্তি গড়িয়া উঠিতে সময় লাগে না। এজন্য আমরা মনে করি, বস্তি উচ্ছেদ কোন সমাধান নহে, পুনর্বাসন ও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে এই সমস্যার সমাধান হইতে পারে। বস্তিবাসী বা ছিন্নমূল নাগরিকদের পুনর্বাসনে আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপনের নজির রহিয়াছে। অন্যদিকে রাজধানী ঢাকা হইতে বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনে আছে ঘরে ফেরা কর্মসূচি। এসব কর্মসূচির সফলতা এখন পর্যন্ত সেভাবে দৃশ্যমান হইতেছে না। আবার সরকার বস্তিবাসীর জন্য বেসরকারি উদ্যোগে কলোনী নির্মাণে সহায়তা করিতে প্রস্তুত। যাহারা এ ব্যাপারে আগাইয়া আসিবে, তাহাদের ৫ শতাংশ হারে ব্যাংক ঋণ দেওয়ার একটি নীতিও গ্রহণ করা হইয়াছে। কিন্তু এই উদ্যোগেও তেমন কোন সাড়া পড়িতেছে না। এমতাবস্থায় বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ যথাসম্ভব অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেরও চেষ্টা করিতে হইবে। এই সমস্যার ইহাই প্রধান দাওয়াই। বস্তি যাহাতে গড়িয়া উঠিতে না পারে সেই চেষ্টাই করিতে হইবে সর্বাগ্রে ও সম্মিলিতভাবে। লক্ষণীয় যে, আমরা বস্তি সৃষ্টি করিলেও বস্তিবাসীর ন্যায্য অধিকার মানিয়া নিতে অনিচ্ছুক। তাহাদের জীবন মানোন্নয়নে একেবারেই উদাসীন। তাহারা সেবাদানের মাধ্যমে যে পারিশ্রমিক পায় তাহাতে তাহাদের এই শহরে স্বাভাবিক জীবন ধারণ করা কঠিন বিধায় তাহারা সরকারি জমিতে বসতি গড়িয়া তুলিতে বাধ্য হয়। উন্নত বিশ্বে সচরাচর এমনটি ঘটে না। কেননা সেখানে তথাকথিত আভিজাত্য প্রকাশের সুযোগ নাই। সেখানে সামন্ততান্ত্রিক যুগের অবসানের পর গণতন্ত্র পুরামাত্রায় বিরাজমান। ফলে যিনি ড্রেন পরিষ্কার করেন বা বাসাবাড়ির টুকিটাকি কাজ করেন, তিনিও গাড়িতে করিয়া আসেন প্রায়শ। সেখানে উপযুক্ত পারিশ্রমিক প্রদান ছাড়াও কোন শ্রমকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয় না। কিন্তু এখানে তাহার বিপরীত। তাই বলা যায়, আমাদের অবিরাম ও ক্রমাগত শোষণের ফসল এই বস্তি। আইনি সুরক্ষা, সচেতনতা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে তাহাদের জীবন মানোন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখিতে হইবে। তবেই বস্তি আর গড়িয়া উঠিতে দেখা যাইবে না।