ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার প্রতিনিধির কাছে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার দেয়া সাক্ষাত্কারের প্রধান বিতর্কিত অংশগুলো নিয়ে আমি ঢাকার একটি দৈনিকে (ইত্তেফাকে নয়) আলোচনা করেছি। কিন্তু তার সাক্ষাত্কারটি এতো দীর্ঘ যে, আরো দু-একটি বিতর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা সম্ভব হয়নি। ঢাকা থেকে কয়েকজন সহূদয় পাঠক জানতে চেয়েছেন আমি এই বিষয়গুলো ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে গেছি কি না? না, আমি ইচ্ছাকৃতভাবে এড়ায়নি। সময়াভাব ও কলামের স্বল্প পরিসরতাহেতু একই নিবন্ধে সকল বিষয় আলোচনা করতে চাইনি। আজ ইত্তেফাকে দশ দিগন্ত কলামে তাই বেগম জিয়ার সাক্ষাত্কারের বাকি দু-তিনটি মূল বয়ান নিয়েও আলোচনা করছি।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর চার্চিল যখন ব্রিটেনে বিরোধীদলের নেতা, তখন একবার আমেরিকা সফরে গিয়েছিলেন। তখন লেবার দলীয় এটলি গভরমেন্ট ব্রিটেনে ক্ষমতায়। এক মার্কিন সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘যুদ্ধকালীন সময়ে মার্কিন সরকারের সঙ্গে আপনার সরকার যে দৃঢ় মৈত্রীর সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছিল, বর্তমান এটলি সরকার কি সেই জোরালো সম্পর্ক রক্ষা করে চলতে চায় অথবা রক্ষা করে চলেছে?
চার্চিল জবাব দিয়েছিলেন, এটলি সরকারও আমেরিকার সঙ্গে জোরালো বন্ধুত্ব অক্ষুণ্ন রাখতে চায়। কিন্তু আমেরিকার ‘বর্তমান ট্রুমান সরকারই এ ব্যাপারে দোদুল্যমানতা দেখাচ্ছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে পরমাণু বোমা তৈরির কৌশলটি জানতে চেয়েছিলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ব্রিটেনকে সেই কৌশল বা পদ্ধতি জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।’
টোরি দলের নেতা চার্চিল তখনকার ক্ষমতাসীন লেবার দলীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী ক্লেমেন্ট এটলির ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি এটলিকে খাটো করা এবং আমেরিকাকে খুশি করার জন্য বিনাদ্বিধায় বলতে পারতেন, আমেরিকার কাছ থেকে পরমাণু বোমা বানানোর কৌশল জানতে না পারা এটলি সরকারের একটি চরম ব্যর্থতা। কিন্তু চার্চিল সে কথা বলেননি। তিনি বিদেশের মাটিতে বসেও দলীয় রাজনীতির স্বার্থে নয়, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সঠিক কথা বলে শত্রু-মিত্র সকলের কাছে প্রশংসিত হয়েছেন। শ্রদ্ধাভাজন হয়েছেন।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর আমেরিকাই সর্বপ্রথম পরমাণু বোমা বানানোর প্রযুক্তি আয়ত্ত করে এবং বোমাটি বানায়। ঘনিষ্ঠ মিত্র রাষ্ট্র হিসেবে ব্রিটেন এই বোমা বানানোর প্রযুক্তি আমেরিকার কাছে জানতে চেয়েছিল। কিন্তু আমেরিকা তা দেয়নি। তাতে অবশ্য পরবর্তীকালে বিশ্বে এটোমিক প্লোরিফিকেশন বন্ধ থাকেনি। যা হোক সে অন্য কথা। আমেরিকার ভূমিকায় সেদিন ব্রিটেনের জাতীয় মর্যাদা আহত হয়েছিল এবং দেশের বিরোধী দলের নেতা হিসেবে চার্চিলও তাতে ব্যথা পেয়েছেন এবং আমেরিকার বিরুদ্ধেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। জাতীয় রাজনীতিতে তার প্রতিপক্ষ লেবার দলের সরকারের উপর দোষ চাপিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা অর্জনের চেষ্টা করেননি। এটাকেই বলে দেশ প্রেম এবং রাজনৈতিক বিচক্ষণতা।
দুর্ভাগ্যের বিষয়, বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের একটি বিদেশি পত্রিকার প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলার সময় এই দেশ প্রেম ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় দেখাতে পারেননি । বরং যা বলেছেন তা সঠিক নয় এবং রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচায়কও নয়। তিনি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে অমীমাংসিত সমস্যাগুলো দীর্ঘদিন যাবত ঝুলে আছে, তা ঝুলে থাকার জন্য আওয়ামী লীগের “ব্যর্থতা ও অনিচ্ছার” উপর দোষ চাপিয়েছেন। এমনকি মনমোহন সরকারের আমলে মমতা ব্যানার্জির জেদের জন্য তিস্তা পানি চুক্তি সম্পাদিত হতে পারেনি, এটা ভারতের মিডিয়া ও সরকার কর্তৃক স্বীকৃত সত্য হওয়া সত্ত্বেও বলেছেন, “বাংলাদেশের মানুষ জানে না, আসলে কি হয়েছে? মমতার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। আমি জানি না কে এই চুক্তি সম্পাদনে বাধা দিয়েছে।” অর্থাত্ খালেদা জিয়া বলতে চান, তিস্তা চুক্তি না হওয়ার দরুন মমতা না আওয়ামী লীগ দায়ী তা তিনি জানেন না। প্রকারান্তরে তিনি আওয়ামী লীগ সরকার তথা হাসিনাকেই দায়ী করতে চান।
এই ধরনের কথা দেশ প্রেম নয়, রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচায়কও নয়। সারা বিশ্ব যেখানে জানে তিস্তা চুক্তি না হওয়ার পেছনে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির দুর্বুদ্ধি কাজ করেছে এবং ভারতের অধিকাংশ মিডিয়াও সেজন্যে তার কঠোর সমালোচনা করেছে, সেখানে বিএনপি নেত্রী কিছু না জানার ভান করলে তাতো তার রাজনৈতিক সততার পরিচয় বহন করে না। তিনি একমুখে বলছেন, ১৯৭৪ সালেই (প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে) দুই দেশের মধ্যে স্থল সীমান্ত চুক্তি হয়েছে। বাংলাদেশ সেই চুক্তি সঙ্গে সঙ্গে স্বাক্ষর করেছে এবং অনুমোদন দিয়েছে। ভারতই সে চুক্তির বাস্তবায়ন এখন পর্যন্ত ঝুলিয়ে রেখেছে।”
একথা বলার পর ওই এক মুখেই খালেদা জিয়া কি করে বলেন, দু’দেশের মধ্যে অনেক সমস্যা অমীমাংসিত থাকার জন্য ভারত নয়, আওয়ামী লীগ সরকারের “ব্যর্থতা ও অনিচ্ছা দায়ী?” তাই যদি হবে, তিনি যখন তিন দফায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন একটা বিরোধেরও মীমাংসা করতে পারেননি কেন? ফারাক্কা চুক্তি করে এক ফোঁটা গঙ্গার পানি আদায় করতে কেন পারেননি? তার প্রয়াত স্বামী জিয়াউর রহমানকে কেন মওলানা ভাসানীকে উস্কে দিয়ে একটি ভারত বিরোধী ব্যর্থ লঙ মার্চ করাতে হয়েছিল?
বেগম জিয়ার কপাল ভালো, ভারতীয় সাংবাদিক এসব প্রশ্ন তাকে জিজ্ঞাসা করেননি। যাহোক, এ সম্পর্কে ঢাকার অন্য একটি দৈনিকে একটি কলামে আমি বিশদ আলোচনা করেছি। এখানে নতুন করে সে আলোচনায় যাব না। বিএনপি নেত্রীর সাক্ষাত্কারের যে বয়ানগুলো নিয়ে আগে আলোচনা করিনি, তা নিয়ে এখানে আলোচনা করতে চাই। বেগম খালেদা জিয়া তার সাক্ষাত্কারে দেখাতে চেয়েছেন তার দল কখনো ভারত-বিদ্বেষ প্রচারকে তাদের রাজনৈতিক মূলধন করেনি। তিনি তার দলের যে ধোয়া তুলসি পাতার চেহারাটি দেখাতে চেয়েছেন তা কি সত্যি তাদের সঠিক চেহারা?
জন্মলগ্ন থেকে বিএনপি’র ভারত-বিরোধিতা সুবিদিত। ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের যে ঘোর শত্রুতার নীতি তাকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনুপ্রবিষ্ট করান বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা নেতা জেনারেল জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষের তখনই শুরু। দু’দেশের মধ্যে সম্পর্কের সবচাইতে অবনতি ঘটেছিল তখনই। আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় এসে ভারতের সঙ্গে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করেছে এবং কোনো কোনোটিতে সফল হয়েছে, তখনই বিএনপি’র নেতা-নেত্রীরা চিত্কার শুরু করেছেন, ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। হাসিনা সরকার পার্বত্য শান্তি চুক্তি করার সময় খালেদা জিয়া নিজে প্রচার করেছেন, “ভারতের কাছে বাংলাদেশের এক-দশমাংশ বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। এখন বাংলাদেশের কোনো কোনো অংশে যেতে ভারতের কাছ থেকে ভিসা নেয়া লাগবে।”
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু ভারত-বিদ্বেষ নয়, আগেকার মুসলিম লীগ রাজনীতির চরম সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত পরিবেশও সৃষ্টি করে বিএনপি। তাদের এক সময়ের নেতা ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী ঘোষণা করেছিলেন, “নির্বাচনে বিএনপিকে ভোট দিলে দেশের কোরানের শাসন এবং আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে গীতার শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।” এগুলোতো খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। তাছাড়া এই সেদিন ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশ সফরে এলে তার সঙ্গে সাক্ষাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বিএনপি নেত্রী ভারতের রাষ্ট্রপতি এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদারই অবমাননা করেছিলেন।
এখন ভারতে সরকার পরিবর্তন হওয়ায় বেগম খালেদার হঠাত্ ভারত প্রেম উথলে উঠেছে এবং নতুন মোদি সরকার বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের বদলে বিএনপি’র প্রতি মদদ দেখাবে এবং তাকে ক্ষমতায় বসতে সাহায্য করবে এই আশায় তিনি হঠাত্ মুক্তকণ্ঠ হয়ে প্রকারান্তরে দিল্লির বন্দনা শুরু করে দিয়েছেন। কিন্তু তার এই প্রত্যাশা যদি পূর্ণ না হয় অর্থাত্ মোদি সরকার যদি বিএনপিকে তাদের সুয়োরানি করতে না চায় তাহলে বিড়ালের কোমল থাবার ভেতর থেকে তীক্ষ্ন ও ধারালো নখরটি যে আবার বেরিয়ে আসবে তাতে সন্দেহ আছে কি?
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের ব্যাপারে খালেদা জিয়া যদি আন্তরিক হতেন তাহলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাত্কারে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলতেন, এটা সত্য এবং সকলের জানা বিএনপি’র রাজনীতি ছিলো এতোকাল ভারত-বিরোধিতার রাজনীতি। কিন্তু জাতীয় ও আন্তর্জাতীয় পরিস্থিতির পরিবর্তনে বিএনপি’র এই নীতি পরিবর্তিত হয়েছে। বিএনপি এখন ভারতের সঙ্গে সকল ব্যাপারে আন্তরিক মৈত্রী ও সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করতে চায়। এই সহজ সরল বক্তব্যটি দ্বারা বেগম খালেদা জিয়া দু’দেশের শান্তিকামী মানুষের কাছ থেকেই যে ক্রেডিবিলিটি অর্জন করতে পারতেন, ভারতীয় সাংবাদিকের কাছে দেয়া একটি বিতর্কিত বক্তব্য দ্বারা তা কি অর্জন করতে পেরেছেন? তিনি সত্য কথা বলার সাহস দেখাতে পারলেন না কেন?
সার্ক প্রতিষ্ঠার কথায় আসি, নরেন্দ্রনাথ মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠানে সার্ক অন্তর্ভুক্ত সরকার প্রধানদের আমন্ত্রণ করায় বেগম জিয়া খুশি হয়েছেন এবং বলেছেন, এতে মোদি সরকারের দূরদর্শিতা এবং সার্কের প্রতি অনুমোদনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। খালেদা জিয়া দাবি করেছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে সার্ক গঠনের রূপকার ছিলেন তার প্রয়াত স্বামী জেনারেল জিয়াউর রহমান। নরেন্দ্রনাথ মোদি সেই সার্ককে অনুমোদন দেয়ায় বেগম জিয়া হয়তো ভাবছেন, ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রী তার প্রয়াত স্বামীর প্রদর্শিত পথেই চলবেন।
সার্ক সম্পর্কে বিএনপি নেত্রীর এই বক্তব্যও কি সর্বাংশে সঠিক? সার্ক গঠনের উদ্যোগটি নেয়া হয়েছিল জিয়াউর রহমানের আমলে। কিন্তু তার আগেই ঠিক ইন্দিরা ভুট্টো সিমলা সম্মেলনের পরেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে একটি দক্ষিণ এশীয় কমনওয়েলথ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তার এই প্রস্তাবের খবর তখন ভারত ও বাংলাদেশ দু’দেশের পত্রপত্রিকাতেই ফলাও করে প্রচার করা হয়েছিল। হয়তো এই কমনওয়েলথ সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে একদিন গঠিত হতো। কিন্তু তার আগে শেখ মুজিব ও ইন্দিরা গান্ধী দু’জনেই উপমহাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে অপসারিত হন।
জিয়াউর রহমানের আমলে যে সার্ক প্রতিষ্ঠিত হয়, যদিও তার ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি মৈত্রী ও সহযোগিতামূলক সংস্থা গড়ে তোলা। কিন্তু এর অঘোষিত উদ্দেশ্যটি ছিল ভিন্ন। জিয়াউর রহমানকে সামনে খাড়া করে নেপথ্যে বসে পাকিস্তান এই সংস্থা গঠনের পরিকল্পনা করেছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে। কারণটি ছিল সবচাইতে বড় এবং শক্তিশালী প্রতিবেশীকে সংস্থায় গ্রহণ করা হলেও তার ‘আধিপাত্যবাদী নীতি’ সম্পর্কে ছোট সদস্যগুলোর মনে ভীতি সৃষ্টি করে সার্কের ভেতরেই একটি ভারত বিরোধী জোট গঠন করা এবং ভারতকে কোণঠাসা করে রাখা।
এটা আমার কথা নয়, সার্ক গঠিত হওয়ার পর পাকিস্তানের ‘জং’ পত্রিকায় এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘সার্ক যেন ভারতের হাতের মুঠোয় চলে না যায়। বরং সার্কভুক্ত ছোট দেশগুলোর কাজ হবে ভারতের আধিপত্যের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হওয়া এবং তাকে কোণঠাসা করে রাখা। সার্কের ভেতরে ভারতের অবস্থান ডাইনোসোরাসের মতো।’ আমার নিজেরও ধারণা সার্ক সম্পর্কে জিয়াউর রহমানের আগ্রহের কারণ ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলা নয় পাকিস্তানের নির্দেশে আঞ্চলিক ছোট দেশগুলোকে এক করা এবং ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার ঠেকিয়ে রাখা।
এই লক্ষ্যে সার্ককে পরিচালিত করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সংস্থাটি আর শক্তিশালী ও কার্যকর সংগঠন হয়ে ওঠেনি। এখন এটি একটি চ্যাটারিং ক্লাব। তবে ভারতের নয়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রনাথ মোদি যদি আগ্রহী হন এবং সার্ককে আবার শক্তিশালী ও কার্যকর করে তুলতে চান, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত প্রসারিত হবে। এই সার্কের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের কল্পিত সার্কের থাকবে আকাশ-পাতাল পার্থক্য।
বাংলাদেশের জামায়াত সম্পর্কে ভারতীয় সাংবাদিকের কাছে সম্পূর্ণ অসত্য কথা বলেছেন খালেদা জিয়া। ১৯৮৬ বা ১৯৯০ সালের কোনো নির্বাচনেই আওয়ামী লীগ জামায়াতের সঙ্গে “হ্যান্ড ইন হ্যান্ড” হওয়া দূরের কথা, কোনো প্রকার নির্বাচনী আঁতাত করেনি। ’৯০ সালে আওয়ামী লীগের এরশাদ হটাও আন্দোলনের কর্মসূচি জামায়াত অনুসরণ করেছে, তার সঙ্গে জোট গঠন করেনি; ১৯৯৬ সালের চিত্রও একই।
অন্যদিকে বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা নেতা জিয়াউর রহমানই স্বাধীন বাংলাদেশে বেআইনী ঘোষিত জামায়াতকে আবার রাজনীতি করার সরকারি অনুমতি দেন। পলাতক যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা গোলাম আজমকে দেশে পাকিস্তানের পাসপোর্টসহ ফিরে এসে জামায়াতের নেতৃত্ব গ্রহণের সুযোগ দেন। জেনারেল জিয়ার পত্নী খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে জামায়াতের সঙ্গে শুধু নির্বাচনী জোট গঠন নয়, তাদের ক্ষমতার শরিকও করেন।
এখন খালেদা জিয়া বলেছেন, জামায়াতের সঙ্গে তাদের কোনো আদর্শগত মিল বা ঐক্য নেই। তাহলে তার পুত্র তারেক রহমান কি করে বলেন, জামায়াত ও বিএনপি একই পরিবারের সদস্য? বেগম জিয়া কি করে জামায়াতের আদর্শের চাইতেও ভয়াবহ হেফাজতিদের তেরো দফা মধ্যযুগীয় দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন? গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে দেশে জামায়াত যে কয়েক মাসব্যাপী ধ্বংসাত্মক তত্পরতা চালিয়েছে, তার সঙ্গে বিএনপি কি সম্পূর্ণভাবে একাত্ম ছিল না? ’৭১ এর জামায়াতি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডদান বানচাল করার জন্য বিএনপি’র তত্পরতা কি প্রকাশ্য নয়?
খালেদা জিয়া আর কতো সত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন? আর কতোদিন অসত্যকে সত্য বলে চালাবার এই ব্যর্থ প্রয়াস করবেন? তিনি এখন আবিষ্কার করেছেন, জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে শেখ হাসিনার সংশ্লিষ্টতা ছিল। যে এরশাদ সাহেবকে তার স্বামীর হত্যাকারী বলে অভিযুক্ত করে তার সঙ্গেই এক সময় এক রাজনৈতিক মঞ্চে গলাগলি করে বসেছেন, এখন সেই এরশাদ সাহেবকে রেখে শেখ হাসিনার দিকে সন্দেহের তীর নিক্ষেপ করছেন। বিএনপি-নেত্রীকে সবিনয়ে জিজ্ঞাসা, তিনি তো তিন দফা দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার মুখেতো শেখ হাসিনা সম্পর্কে এই অভিযোগটি কখনো শোনা যায়নি। আর ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি তার স্বামী হত্যার কোনো তদন্ত এবং দোষীদের খুঁজে বের করার কিছুমাত্র আগ্রহ দেখাননি কেন? জিয়াউর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তার নামকে ক্ষমতার রাজনীতির মূলধন করা ছাড়া তার প্রতি আর কোনো দায়িত্ব পালন করেছেন কি বেগম খালেদা জিয়া?
লন্ডন ৫ জুন, শনিবার, ২০১৪
