অধ্যাপক সালেহ’র সঙ্গে পরিচয় বহু বছর আগে, সম্ভবত নব্বই দশকের শুরুতে। পরিচয়ের পর থেকেই তার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। একজন ইতিবাচক মানুষ হিসাবে তিনি সবসময়ই বিভিন্ন মানবিক, সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি ছিলেন মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক। মনোবিজ্ঞানী ও শিক্ষক।
পেশাগত বিভিন্ন কাজে বিভিন্ন সময়ে আমি রাজশাহী ও রাজশাহী বিশ্বদ্যািলয়ে গিয়েছি। প্রতিবারই শান্ত প্রকৃতির মানুষ, অধ্যাপক সালেহ’র সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। তাঁর মুখে সর্বদা হাসি লেগে থাকত। এরকম মানুষ আমি খুব কমই দেখেছি। অনেক অপ্রাপ্তি, অসন্তুষ্টির কথাও বলতেন। সমাজের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরতেন। কিন্তু ব্যক্তিগত পর্যায়ে কখনও কারো বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করেননি। হতাশায় তিনি ভেঙ্গে পড়তেন না। নতুন উদ্যমে মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। অধ্যাপক সালেহ ছিলেন সত্যিকার মনোচিকিত্সক। তিনি সমাজের চিকিত্সকও ছিলেন বটে! চিকিত্সক যেমন রোগীকে দোষারোপ না করে রোগের নির্মূলে কাজ করতেন, তিনিও তেমনি সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি তুলে ধরে কাউকে অভিযুক্ত না করে বরং সে অসঙ্গতি নির্মূলে কাজ করে গেছেন। তাঁর সঙ্গে দেখা হলে বা কথা বললে এটুকু সহজেই বোঝা যেতো যে, নতুন প্রজন্মকে সুশিক্ষিত ও ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে গড়ে তোলা তাঁর জীবনের অভীষ্ট লক্ষ্য ছিল। এ উদ্দেশ্যে তিনি নিজে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর পিতা ‘মাদার বখশ’ সাহেব ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী, রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক। তাঁর পিতা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজসহ রাজশাহীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর পিতার নামে একটি আবাসিক হল ‘মাদার বখশ’ হল রয়েছে।
পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে অধ্যাপক সালেহ বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। এর মধ্যে অন্যতম ‘মাদার বখশ গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ’ ও ‘মাদার বখশ আইডিয়াল স্কুল’ অন্যতম। দরিদ্র শিশুদের কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করতে ইউসেফ স্কুলকে স্বীয় অর্থে ক্রয়কৃত জমি দান করেছেন, যেখানে তাঁর মায়ের নামে ‘মোমেনা বখশ ইউসেফ স্কুল’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ছাড়াও তিনি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনসিসির সঙ্গে যুক্ত থেকে তরুণ প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীদের ইতিবাচক মানসিকতা সৃষ্টিতে নিরন্তর কাজ করে গেছেন। তরুণ প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশা করতে অধিক পছন্দ করতেন।
একবার তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘মাদার বখশ গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ’-এর একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সেখানে ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের পর সেটি ছিল বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি ও উত্তরবঙ্গে একমাত্র গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ। কলেজটি নিয়ে তাঁর অনেক স্বপ্নের কথা শুনেছিলাম। বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষিত করে তোলা, স্বাবলম্বী করে তোলা ছিল তাঁর স্বপ্ন। সে সময় আমি তাঁর রাজশাহীর বাসায়ও গিয়েছিলাম। তাঁদের আন্তরিক আতিথ্য আমাকে মুগ্ধ করেছিল ।
প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নেও তাঁকে ব্যস্ত থাকতে দেখেছি। তিনি রাজশাহীতে প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে স্কুল প্রতিষ্ঠা, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। নারী শিক্ষা বিশেষ করে কন্যাশিশুদের উন্নয়নে তিনি সামাজিক আন্দোলন (জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম)-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। যুব সমাজের নৈতিক অবক্ষয় রোধ বিশেষত মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনে রাজশাহীতে তিনি ছিলেন অগ্রণী। এ সময়ে আমাদের অনেকেই ব্যক্তিস্বার্থের দ্বারা পরিচালিত। কিন্তু অধ্যাপক সালেহ কখনও নিজের স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হননি। কন্যাশিশুর স্বার্থই তাঁর স্বার্থ, নারীর স্বার্থই তাঁর স্বার্থ, শারীরিকভাবে সক্ষম নয় যারা (প্রতিবন্ধী)—তাদের স্বার্থই তাঁর স্বার্থ। অর্থাত্ দেশের সার্বিক উন্নয়নই ছিল তাঁর স্বার্থ।
মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বেও তিনি এসেছিলেন। মৃত্যু অনিবার্য। আজ থেকে ঠিক ৩ বছর আগে, ৪ জুলাই ২০১১ তিনি হঠাত্ করেই মৃত্যুবরণ করেন। সালেহ যেসব কাজে যুক্ত ছিলেন, সেগুলোই আমাদের শক্তি যোগাবে বলে আমার বিশ্বাস। অধ্যাপক সালেহ কীর্তিমান মানুষ। এরকম কীর্তিমানেরা যুগ যুগ ধরে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন।
লেখক:উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
