মানুষের প্রয়োজনের শেষ নাই। তাহার মানসিক আকাঙ্ক্ষার কারণে। আমরা যত বেশি পাই, তত বেশি চাই, এবং তত বেশি অপচয়ও করি। প্রয়োজনের সমান্তরালে আমাদের প্রাপ্তি যেমনই হোক, দৃষ্টিভঙ্গিগত কারণে সেই প্রাপ্তির বিপরীতে আমরা সুখী অথবা অসুখী হই। সেই কারণে গাছতলায় দিনাতিপাত করা কোনো ব্যক্তি সুখী হইতে পারে তাহার মানসিক চাহিদা অতি সামান্য হইবার কারণে। কিংবা অল্পতে সুখী হইবার ক্ষমতা অর্জনের কারণে। আবার এই ক্ষেত্রে অসন্তুষ্টিই তাঁহাকে তাড়িত করে আরও অধিক সম্পদ আহরণের পথ খুঁজিতে। ইহার ভালো-মন্দ আমাদের বিবেচ্য নহে। আমরা মেলাইতে চাই সেই প্রবাদের সহিত—অপচয় করিও না, অভাব হইবে না।
অপচয় কোনো ক্ষেত্রেই করা উচিত নহে, তাহা আমরা বুঝি। কিন্তু সেই অপচয় যদি হয় বায়বীয় কিছুর, তবে তাহা লইয়া প্রাথমিকভাবে আমরা খুব বেশি হয়তো ভাবি না। যেই ব্যক্তি অকারণে জ্বালাইয়া রাখেন বাথরুমের বাতি, কিংবা অন্তরালে জ্বলিতে থাকে ভাঁড়ারের বাল্ব—মাস শেষে তাহাকে হয়তো কিছুটা অধিক বিদ্যুত্ বিল পরিশোধ করিতে হয়, এবং তাহার সামর্থ্য ওই ব্যক্তির অধিক পরিমাণে থাকিলেও এই অপচয় করিবার অধিকার তাহার নাই। কেননা, বিদ্যুত্ বা পানি—যাহার অপচয় তিনি করিতেছেন, তাহা টাকার বিনিময়ে ক্রয় করা সম্ভব হইলেও, একজনের অপচয়ই আরেকজনের অভাবের কারণ হয়। যেহেতু প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের বিদ্যুত্ উত্পাদন কম এবং পানি একটি প্রাকৃতিক সম্পদ, সেহেতু এই বিদ্যুত্ ও পানির অপচয়ের মাধ্যমে অন্য অনেক গ্রাহক অল্পবিস্তর বঞ্চনার শিকার হইয়া থাকে। কয়েকদিন পূর্বে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দশম জাতীয় সংসদে একটি সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুত্ অপচয় রোধ করিতে যেই বক্তব্য দিয়াছেন, তাহা প্রণিধানযোগ্য। বিদ্যুত্ উত্পাদন যেমন বাড়িয়াছে, তেমনি বাড়িয়াছে তাহার ব্যবহারও। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজের বাসার সুইচ নিজে অফ করিলে কাহারও সম্মান যায় না। তিনি নিজেও তাহা করেন। তাঁহার ছেলেমেয়ে, নাতি-পুতিকেও এই সাশ্রয়ের ব্যাপারে এইভাবে শিক্ষাপ্রদান করেন যাহাতে তাহারাও গৃহ হইতে বাহির হইবার সময় বিদ্যুতের সুইচ অফ করিতে ভুল না করে। তাঁহার দেওয়া তথ্যানুযায়ী দেশের ৬২ শতাংশ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় রহিয়াছে। পূর্বের তুলনায় বিদ্যুত্ উত্পাদনও বাড়িয়াছে। কিন্তু তাহার পরও লোডশেডিং পুরাপুরি দূর হয় নাই। দেশের ৩৮ শতাংশ মানুষ রহিয়াছে বিদ্যুত্হীন অন্ধকারে। সুতরাং অপচয় রোধ করিতে পারিলে তাহা অনেকখানি চাপ কমায় লোডশেডিং-এর ওপর, সামান্য হইলেও একটু অধিক আলোকিত হইতে পারে প্রান্তিক জনপদ।
অপচয়ের আরও একটি বিশ্বজনীন ভয়ঙ্কর দিক রহিয়াছে। বিদ্যুত্ উত্পাদন প্রক্রিয়ায় নির্গত হয় বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য দায়ী বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস। সুতরাং বিদ্যুত্-ভোক্তারা অনেক বেশি বিদ্যুত্ ক্রয় করিবার সামর্থ্য থকিলে এবং তুচ্ছজ্ঞানে তাহার অপচয় করিলে শুধু অর্থমূল্যেই তাহার দাম শেষ হইয়া যায় না। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, অর্থ অধিক থাকিলেই বিদ্যুত্ অপচয় করিবার অধিকার জন্মায় না। জীববৈচিত্র্য হ্রাসে এবং বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনে গ্রিনহাউস গ্যাসের অনুঘটক ভূমিকার কথা কাহারো অজানা নহে। পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখিতে আগামী প্রজন্মের কাছে বিশ্বের সকল মানুষের দায়ভার রহিয়াছে। বিদ্যুত্সমেত যেকোনো কিছুর অপচয় রোধ করিয়াও সেই দায়ভার কিছুটা হইলেও পালন করা যায়।
