একটি সরকারের সাফল্য কোথায়? নিঃসন্দেহে বলতে হবে, এর জবাব জনগণই দিতে পারে। তারা সুখী হলে, সন্তুষ্ট হলে, নিরাপদ থাকলে, সংশ্লিষ্ট সরকারকে সম্মান দেয়ার খায়েশ বোধ করলে, বলতে হবেই, সে সরকার সফল। তাকেই বার বার জনগণ ক্ষমতায় আনতে চাইবে। ক্ষমতায় আসার জন্য তাকে কূটকৌশল, মিথ্যাচার, নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হবে না। প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটাই দেখা যায়। গণতন্ত্রের মাহাত্ম্যই সেটা। এমন অবস্থাই দেশ বা রাষ্ট্রের প্রতিটি না হলেও অধিকাংশ নাগরিককে সম্মানিত, সুখী বোধ করতে অনুপ্রেরণা যোগায়। আসলে এর কি কোনো মূল্য আছে আমাদের দেশে? মানুষ কি তা সত্যিই উপলব্ধি করে? এরও সহজ উত্তর এই যে, বাংলাদেশের সকল মানুষই আজ তা উপলব্ধি করে। জিজ্ঞাসিত হলে তারা উত্তরও দিবে। অধিকাংশ মানুষ তা প্রকাশ করে না, ঐ বিষয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হয় না বলে এবং স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে মতামত দেয়ার সময়ই তাদের হয় না। জীবনধারণের কায়ক্লেশ নিয়েই তারা ব্যতিব্যস্ত থাকে।
বিগত ৫ জানুয়ারি ২০১৪ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জনগণের রায় পেয়েছে বলে দাবি করে থাকে। প্রথম প্রথম মহাজোটের তেমন কেউ সেটা না করলেও সরকার গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবার পর সে দাবিতে তাদের অনেকেই সোচ্চার। একবার ক্ষমতা হাতে পেলে যেকোনো দেশের মানুষ, বিশেষ করে যারা জনগণের সেবার ওপরে নিজ স্বার্থকে, পদকে এবং ক্ষমতার জোরে লব্ধ সম্মানকেই স্থান দেয়, তারা তা আঁকড়ে ধরে থাকতে চায়। এতে অবাক হবার কিছু নেই। তারা ক্ষমতা অধিগ্রহণ এবং ক্ষমতার চর্চাকে বৈধ প্রমাণ করতেই চাবে। এটা গণতান্ত্রিক বোধ থেকে আসে না, আসে অপশৌর্য বীর্য লালন ও প্রয়োগের ব্যগ্রতা থেকে। এই প্রবণতা অবশ্যই গণতন্ত্র ও মানুষের সম্মান প্রতিষ্ঠার পরিপন্থি। এক্ষেত্রে চুপ থাকার অর্থ শান্তিতে থাকা নয়। মানুষ মহা অশান্তিতে থাকলেই এটা হয়, যেমন রাজতন্ত্রের অধীনে মানুষের সুখ-শান্তি। তবে রাজা এবং তার পাইক-পেয়াদাগণ মহানুভব হলেই সেটা সম্ভব। চরম ন্যায়বিচারক এবং চরম অত্যাচারী রাজারাজড়ার কথাও তো আমরা জানি। চরম বিলাসী এবং জঘন্যতম পক্ষপাতদুষ্ট রাজাগজাদের কথাও তো জানি। যাহোক ভালো হলে ভালো। প্রজা সাধারণ এবং আমজনতা নাগরিকরা সেটাই কামনা করে। তখন শুধুই সাফল্য গাঁথা। সে ক্ষেত্রেও কিন্তু নাগরিকগণ বেশিদিন তুষ্ট থাকে না। কোনোও না কোনো কারণে দানা বেঁধে ওঠে বিদ্রোহ। যেসব শাসক ডান্ডাবাজ, তারা মনে করেন, এতো স্বাভাবিক। যতোদিন চালানো যায় সেটাই মন্দ কি। সমালোচনা এবং গালিগালাজ তাদের নিকট নস্যি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষিত এভাবেই বিবেচনা করা চলে। ক্ষমতা লাভ, ক্ষমতা গ্রহণ, নির্বাচন করলে জেতাটাই মুখ্য, আন্দোলন করলে অপরপক্ষের ক্ষতিসাধনই মুখ্য, জানমালের ক্ষতির তুলনায় অভীষ্ট অর্জনের সম্ভাবনাকে অধিক মূল্য দেয়া—বাংলাদেশে মানুষের শান্তি-এর মধ্যে আটকে আছে। এসব কার্যকলাপ, কলাকৌশল ও অপনীতির আবর্তে যেসব সামাজিক অনাচার ও অপকাণ্ডগুলো ঘটতে থাকে, যে কোনো স্তরের নিরীহ মানুষ তাতে অসহনীয় দুর্ভোগের শিকার হয়। ক্ষমতা ভোগকারী দলের সাধারণ মানুষও এসব দুর্ভোগের শিকার হয়। সত্যি বলতে কি, এমনই এক হতচ্ছাড়া পরিবেশ এখন বাংলাদেশের আকাশ-বাতাসকে বিষাক্ত করে তুলেছে। শুধু দলভুক্ত নয়, ভাবতে হবে ১৬ কোটি মানুষের কথা। এদের মধ্যে ৪০% মানুষ হচ্ছে শিশু-কিশোর। যারা সবার কাছেই পরম যত্নের। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, কলহ, বিচার-বিবেচনা শূন্য হিংসাদ্বেষের ঘটনা এমনই মাত্রায় চলছে যে, আমাদের সাধারণ মানুষ সুস্থ মস্তিষ্কের কোনো রাজনৈতিক প্রতিনিধিকে ক্ষমতালাভকারী বা ক্ষমতা প্রত্যাশী দলগুলো খুঁজে পাবে না। এই দুরাবস্থা, এই কালহাতের জন্ম কোথায় তাও খুঁজে পাবে না তারা। এটা কি আমাদের ঐতিহ্যেরই অংশ? ভারতের সাথে তুলনা করলে আমরা যে এখনও গণতন্ত্রের অর্থই বুঝি না, তা দেখা যাবে। তবে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইরান, আমিরাত, দুবাই, এসব দেশ গণতন্ত্রের পরিচয় জানে না বলে তাদেরকে সাক্ষী রেখেও কোনো লাভ হবে না। তাদের পরপরই যাদেরকে আমরা ‘টাইগার’ হিসেবে আখ্যায়িত করি, তাদের কেউ কেউ এখনও নিজ নিজ দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এদের নেতৃবৃন্দকে সার্থক রাষ্ট্র পরিচালক আখ্যাও দেয়া যায় না। এই মতামতের মধ্যেই ভারতসহ এশিয়ার অন্যান্য দেশে এখনকার গণতান্ত্রিক রূপ বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠবে।
তবে বাংলাদেশ এপথে যথাযথ প্রক্রিয়ায় বেশ এগিয়েছিল। আমাদের রাজনীতিবিদদের মনে শুভবোধ জন্মেছিল যে, তারা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশ পরিচালনা করবেন। কিন্তু ২০০৭ সালের শেষ পর্যায়ে কেনো যে তাদের মতিভ্রম হলো, ক্ষমতা দখল করার জন্য আরও কোনো কলাকৌশল দরকার যেন কেবল জনপ্রিয়তা এবং জনসমর্থনই শেষ নয়। ঐ একটি লক্ষ্য— রাজনীতিতে সফল হতে হলে ক্ষমতা চাই। এই মূর্খতা তাদের প্রজ্ঞাকে পরাভূত করলো। এখন দুঃখ করেই বলছি, ‘ভারতের সাথে তুলনা করলে আমরা গণতন্ত্রের অর্থই বুঝি না।’ এবারকার (২০১৪) নির্বাচনে আমরা বাংলাদেশও দেখলাম এবং ভারতও দেখলাম। ভারতে বেশ কিছু লক্ষণ দেখা গেল যে, তারা পরিবারতন্ত্রের ওপর গণতন্ত্রের অবস্থান প্রতিষ্ঠার পথে কিছুটা হলেও এগিয়েছে, যদিও দিল্লীতে আম-আদমির নেতা ‘পদলেহন’ বিষয়টি নিয়ে হতাশাব্যঞ্জকভাবে একটি ধাক্কা খেলেন।
এতে ওখানে পরিবারতন্ত্র একটু বেশি সুযোগ পেয়ে গেল। মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও চাওয়া-পাওয়াকে তারা মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হলেন। তবে এই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠাও যে অসম্ভব নয়, ভারতের লোকসভা নির্বাচন তা প্রমাণ করলো। এ থেকে বাংলাদেশকে শিখতে হবে। সে লক্ষ্যে চিন্তা চেতনায় জড়তামুক্ত রাজনৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন একটি প্রগতিশীল শক্তিকে খুব তাড়াতাড়িই মাঠে নামতে হবে। বাংলাদেশে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে এ শক্তিতে কাজ করতে হবে। সাফল্য তাদের আসবেই।
আমি খুবই আশাবাদী যে, শিক্ষা-দীক্ষায় অগ্রসর অথচ অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে অনেক কষ্ট সহ্যকারী এ দেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধ হবেন, তারা দেশের জন্য কল্যাণার্থী পদক্ষেপসমূহ বেছে নিবেন। কিন্তু দল গঠনের সংজ্ঞা দিয়ে দেশের জন্য কল্যাণধর্মী রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলা সম্ভব নয়। যা দেখেছি এবং রাজনৈতিক দলসমূহের সৃষ্টি, উত্থান-পতন যতটুকু দেখেছি, বুঝেছি, তাতে মনে হয়, জাতির জন্য বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি কল্যাণমুখী রাজনৈতিক শক্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। একটি শক্তির আবির্ভাব ঘটলে বিকল্প শক্তিরও উদ্ভব হয়।
সম্পূর্ণরূপে গণতান্ত্রিক এবং জনগণের শক্তির ওপর নির্ভরশীল রাজনৈতিক শক্তির অভাব দেশবাসীকে বুঝতে হবে। বিকল্প শক্তির উদ্ভব আবার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সম্বিত ফিরে পেতে এবং ভুল-ভ্রান্তি পরিহার ও শুদ্ধতায় ফিরে আসতে প্রেরণা দান করে। আমাদের দেশের দুটি বৃহত্ রাজনৈতিক দলে সে ঘটনাও ঘটতে পারে। সেটা রোগমুক্তির প্রক্রিয়ায় আশীর্বাদমূলক ঘটনার মতো। শুধু রোগমুক্তি কেনো, গণতান্ত্রিক আচার, অনুশীলন, সে মতে সার্বজনীন নির্বাচন এবং সত্য ও ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসনের মাধ্যমে তারা সফল ও জননন্দিত হতেও পারেন।
লেখক: বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
