আজ হইতে রাজধানীতে দুইদিনব্যাপী জেলা প্রশাসক সম্মেলন শুরু হইয়াছে। বর্তমান সরকারের এই তৃতীয় মেয়াদে জেলা প্রশাসকদের সম্মেলন ইহাই প্রথম। ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই বিষয়ক প্রতিবেদন হইতে জানা যায় যে, সম্মেলনে জেলা প্রশাসকগণের পক্ষ হইতে উত্থাপনের জন্য ৩০৭টি প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হইয়াছে। এইক্ষেত্রে বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের ব্যাপারে একটি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের বিষয়টিকে গুরুত্ব প্রদানের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে। কেন্দ্রীয়ভাবে এই উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠনের এই সুপারিশ করার কারণ হিসাবে যাহা জানা যায় উহা এই যে, বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা স্থানীয়ভাবে পরিচালনা পরিষদের হাতে থাকায় এই ব্যাপারে অনেক ধরনের অভিযোগ উত্থাপিত হইয়া থাকে। এমনকি এই ক্ষেত্রে অর্থের লেনদেনের অভিযোগও প্রায়শই শোনা যায়। এমতাবস্থায়, এই অনিয়ম ও অব্যবস্থা দূর করার লক্ষ্যে জেলা প্রশাসকগণ এই ব্যাপারে এই সুপারিশটি পেশ করিতে চলিয়াছেন। শুধু শিক্ষক কেন, সব ধরনের নিয়োগের ক্ষেত্রেই যোগ্যতাই হওয়া উচিত একমাত্র মাপকাঠি বা বিচার্য বিষয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হইলেও সত্য যে, আমাদের দেশে এখন কি সরকারি কি বেসরকারি সবধরনের নিয়োগের ব্যাপারে যাচ্ছেতাই রকমের অনিয়ম-অব্যবস্থা ও দুর্নীতি চলিতেছে। ইহার প্রতিকারের ভার যাহাদের উপর ন্যস্ত তাহারাই দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে রক্ষক হইয়াও ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন ফলে যোগ্য ব্যক্তিরা নিয়োগ হইতে বঞ্চিত হয় এবং অযোগ্যদের হয় পোয়াবারো। এক্ষণে জেলা প্রশাসকেরা যে উপায়টি বাতলাইতেছেন উহাইবা কতখানি কার্যকর বলিয়া প্রতিপন্ন হইবে তাহা বলা দুষ্করই বটে। তবে এই প্রস্তাবনার মধ্যদিয়া একটি বিষয় অতীব স্পষ্ট হইয়া ওঠে, আর উহা হইল, রাজনীতিবিদ বা জনপ্রতিনিধিদের উপর সরকারি কর্মকর্তাদের এক প্রকার অনাস্থার ভাব। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে সেবকের পরিবর্তে প্রভু বনিবার এক ধরনের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য বা প্রচ্ছন্ন-অপ্রচ্ছন্ন প্রয়াস কাহারও দৃষ্টি এড়ায় না নিশ্চয়ই। জনপ্রতিনিধি রাজনীতিক বা নির্বাচিত ব্যক্তিদের উপর অনাস্থা স্বাভাবিকভাবেই উভয়পক্ষের মধ্যে মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি করে।
এইক্ষেত্রে পরস্পরের প্রতি আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি না করিতে পারিলে যে যত পন্থা বাতলান না কেন, প্রকৃত প্রস্তাবে উহা অকার্যকর প্রতিপন্ন হইতে বাধ্য। সুষ্ঠু ও ন্যায়ানুগ কোন কার্যক্রম গ্রহণ এবং উহা বাস্তবায়নে যে ধরনের আন্তরিকতা, সহমর্মিততাবোধ ও কর্তব্যপরায়ণতার বোধ থাকা দরকার উহা সরকার বা রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে কতখানি আছে উহাও ভাবিয়া দেখিবার বিষয়। সন্দেহ নাই যে, জেলা প্রশাসকগণ এই প্রস্তাবনার মাধ্যমে অন্তত মৌখিকভাবে হইলেও যোগ্য ব্যক্তিরা যাহাতে বেসরকারি শিক্ষক পদে নিয়োগ লাভ করিতে পারে সেদিকটিই তুলিয়া ধরিতে চাহিয়াছেন। অবশ্যই শিক্ষক নিয়োগের ব্যাপারে যোগ্য ব্যক্তিদেরকেই খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে। শিক্ষকতা পেশাকে ব্রত হিসাবে গ্রহণ করিতে ইচ্ছুক ও এইজন্য প্রস্তুত এমন প্রার্থীরাই কেবল এই ক্ষেত্রে নিয়োগ লাভের দাবিদার। কিন্তু খুঁটির জোরে বা উেকাচের বিনিময়ে অযোগ্য অপদার্থ ব্যক্তিরা যদি মানুষ গড়ার কারিগর বনিতেই থাকে তাহা হইলে আমাদের সন্তান-সন্ততির ভবিষ্যত্ বিষয়ে উদ্বিগ্ন না হইয়া পারা যাইবে না।
অতএব, যোগ্যব্যক্তিদের নিয়োগের একটি সঠিক ও পালনযোগ্য পদ্ধতি উদ্ভাবনেও কেহই বিরোধিতা করিবে না যদি কিনা সেই পদ্ধতি বাস্তবায়ন কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ সত্, সাহসী ও ন্যায়নিষ্ঠ হন। জনপ্রতিনিধিদের উপর আস্থাহীনতা অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি কর্মচারীরা নিজেদের সুপ্ত অভিলাষ বা দুরভিসন্ধি চরিতার্থ করার নিমিত্তই কৃত্রিমরূপে সৃষ্টি করিয়া থাকেন। তবে এই ক্ষেত্রে আমরা মনে করি তাহাদেরকেও এই সত্যটি উপলব্ধি করিতে হইবে যে, সততা, ন্যায়-নীতি নিষ্ঠা কেবল রাজনীতিবিদরা প্রদর্শন করিবেন আর সরকারি কর্মকর্তারা প্রভু সাজিয়া আমজনতার উপর সুকৌশলে অদৃশ্য ছড়ি ঘুরাইবেন, উহা কখনই চলিতে পারে না। চলিবেও না। কিছুকাল হয়তো চালানো যাইবে কিন্তু আখেরে উহা এমনই এক পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে যাহা কাহারও জন্যই শুভ হইবে না।
